হোয়াটসঅ্যাপও এখন করসেবক,
বিপদ তাই আরও বেশি

হোয়াটসঅ্যাপও এখন করসেবক, <br> বিপদ তাই আরও বেশি
+

 নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ৫ডিসেম্বর— বিকাশ ৬০বার। রামমন্দির একবারই।

তখন যে ভোট। বহুজাতিক ‘পি আর’ কোম্পানি মসনদে বসার রোডম্যাপ তৈরি করেছিল। ভোট মুদ্দায় ‘বিকাশ’ ছিল ৬০বার। এমনভাবেই লেখা হয়েছিল ইশতেহার। ৪২পাতার নির্বাচনী ইশতেহার ছাপিয়েছিল বিজেপি। ২০১৪সালে সেই ইশতেহারেই রামমন্দিরের কথা ছিল একবারই। তাও ঠাঁই পেয়েছিল ৪১পাতায়। ‘বিকাশ’ শব্দ এসেছে ৬০বার।
চার বছর পর সেই ‘বিকাশ’ হারিয়ে গেছে কুম্ভমেলায়! রামমন্দির গেড়ে বসেছে সরকারে। দলে। সাধুসন্তদের কাছে। সবার ওপরে সঙ্ঘ পরিবারে।
সেপ্টেম্বরেই জিডিপি-র দ্বিতীয় রিপোর্ট প্রকাশ করছে সরকার। সেই সরকারি রিপোর্ট জানিয়েছে, শুধু কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৬শতাংশ। সামান্য উৎপাদন বাড়ার পরও কৃষকের ফসলের দাম কমেছে। তাই কৃষক আজ রাজধানীর রাস্তায়। লাভজনক দর চেয়ে মিছিলে। 
২কোটি বেকারের চাকরি। কালো টাকা উদ্ধার। ১৫লক্ষ টাকা প্রত্যেক ভারতবাসীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাওয়া সাড়ে চার বছরে ‘জুমলা’! তাই সামনে এখন রামমন্দির। বিভাজন।
বছর পার করলেই লোকসভার ভোট। বছর শেষে ৬ ডিসেম্বর এবার তাই আরও তাৎপর্যপূর্ণ। 
বিপদ এখন শিয়রে। দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, লোকসভার অধ্যক্ষ সংবিধানের রক্ষাকর্তাদের নিয়োগকর্তা আর এস এস। বিপদ এইজন্য নয় যে, দেশের ২২টা রাজ্যে আর এস এস-এর রাজনৈতিক শক্তি বিজেপি শাসন ক্ষমতায়।
‘মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে’র হুঙ্কারের শক্তি এখন তাই পরোয়া করছে না সংবিধানকেও। দেশের শীর্ষ আদালতকেও পর্যন্ত ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছে সঙ্ঘীরা। মন্ত্রীরা হুমকি দিচ্ছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বদলাও আনা হবে। মনুস্মৃতি কানুন লাগু হবে দেশে।’ 
২৬বছর আগে ধ্বংস হয়েছিল দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য। তারপরও শাসন ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। দু’দফায় ছ’বছর দেশ শাসনও করেছে। কিন্তু এখনকার মতো বিপদ এর আগে কখনও গ্রাস করেনি উপমহাদেশে। 
কেন?
‘বিজেপি মনে করলে এক ঘন্টার মধ্যে গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এখন ওটা ওদের কাছে কোনো ব্যাপারই নয়।’ বলেছেন বিজেপি-র আই টি সেলের এক কর্মী। 
২০১৩থেকে ২০১৫সাল পর্যন্ত বিজেপি-র আই টি সেলে কাজ করেছেন ওই যুবক। 
তাঁর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আউটলুক পত্রিকায় কীভাবে সঙ্ঘ পরিবার ‘ভুয়ো খবরের কারখানা’ তৈরি করেছে তা জানলে চমকে উঠতে হবে।
প্রথম ধাপে কাজ শুরু করে বিভিন্ন ফেক নিউজ ওয়েবসাইট। Insistpost.com, n ewstrends.news, viralinindia.in একের পর ভুয়ো খবরের ওয়েবসাইট তৈরি করে ছড়ানো হচ্ছে ঘৃণা, মিথ্যাচার। এই ভুয়ো সাইটের নেটওয়ার্ক এমনই শক্তপোক্ত যে সাড়ে তিন কোটি পর্যন্ত মানুষ পেজগুলি দেখেন। এদেশে প্রথম ১০টি ওয়েবসাইট দেখা দর্শকের মধ্যে newstrends.news আছে। এই ওয়েব পেজগুলির মিথ্যা খবর তৈরির পর তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল সাইটে।
শেয়ার করা শুরু হয়ে যায় ফেসবুকে। বলাবাহুল্য সেইসব ফেসবুকও পেজগুলিও সব ভুয়ো।
ভাবলে আঁতকে উঠতে হবে শুধু ভারতীয় সেনাবাহিনীর নাম যুক্ত করে ৪০০থেকে ৫০০এর ওপর ভুয়ো ফেসবুক পেজ আছে। ‘আই অ্যাম উইথ ইন্ডিয়ান আর্মি’, ‘ইন্ডিয়ান আর্মি ফ্যান ক্লাব’, ‘ইন্ডিয়া সাপোর্ট ইন্ডিয়ান আর্মি’ একের পর এক ফেসবুকে ভুয়ো পেজ বানিয়ে চলছে মিথ্যাচার। উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতীয় সেনার অফিসিয়াল পেজে যে সংখ্যায় ‘ভিজিটার’ থাকে আই টি সেলের ভুয়ো পেজ তা ছাপিয়ে যায় কয়েক গুণ। ছয় লাখ সাড়ে ছয় লাখ পর্যন্ত মানুষের চোখ আটকে থাকে এই পেজে।
ভুয়ো ফেসবুক পেজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফেক প্রোফাইল। ফেসবুক পেজে প্রোফাইল ফোটো আর কভার ফোটো ছাড়া ওয়ালে আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব না থাকার মানেই এখন ধরে নেওয়া হচ্ছে বিজেপি’র আই টি সেলের ভুয়ো আই ডি। মুসলিম ভুয়ো নাম দিয়ে, মক্কা, মদিনার ছবি দিয়ে বানানো হয়েছে নকল ফেসবুক আই ডি। এইভাবে দিনরাত কাজ চালাচ্ছে ভুয়ো প্রোফাইল। 
প্রথমে মিথ্যা সংবাদ তৈরি করা। দ্বিতীয় ধাপে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করে তীব্র ঘৃণা ছড়ানো। ‘ যে কোনও ঘটনাকে হিন্দু মুসলমানে ঘুরিয়ে দেওয়াই আমাদের প্রথম কাজ। কোনও ঝগড়া হলেও তা কীভাবে দলিত, হিন্দু, মুসলমানে টার্ন করাতে হবে আমাদের শুধু এটাই বলে দেওয়া থাকে। ফেসবুকে তা পোস্ট করার পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় মোবাইল হোটাসঅ্যাপকেও। তুরন্ত ভাইরাল।’ বলছেন আই টি সেল ছেড়ে আসা বিজেপি কর্মী।
২৬ বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় সামাজিক গণমাধ্যম আজকের এই চেহারায় ছিল না। করসেবক জড়ো করে অযোধ্যায় নিয়ে গিয়ে বাবরি ভাঙার থেকেও আরও বিপজ্জনক এখন এই শক্তি। তাই আজকের বিপদের মাত্রা ঢের বেশি। তাই সতর্কতা আরও জরুরি।
জরুরি এরাজ্যেও।
বাবরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার দু’দিনের মাথায় নয়াদিল্লির পান্ডারা পার্কের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। গ্রেপ্তারির পর বাবরি ভাঙার নৈতিক দায় নিয়েছিলেন আর এস এস নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এখনও বিচারাধীন। যে ব্যক্তি বাবরি ভাঙার দায় নিলেন তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি! 
সবার মনে থাকার কথাও নয়। কিন্তু এটাই ছিল আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’। ২০১৭সালে কলকাতারই টাউন হলে প্রশাসনিক রিভিউ মিটিং করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ৬ই জানুয়ারি ওই বৈঠকের পরই তাঁর মুখে ছিল দেশে জাতীয় সরকার গড়ার ডাক। কে নেতৃত্ব দেবে এই সরকার। শোনা যাক মমতা ব্যানার্জির মুখের কথা। 
‘ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট আসুক। তাতে যদি আদবানিজী দায়িত্ব নেন আমার কোনও আপত্তি নেই। তাতে যদি রাজনাথ সিং আসেন, আমার আপত্তি নেই। অরুণ জেটলি দায়িত্ব নেন তাতে অসুবিধা নেই। ওদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। চালাক দু’বছর। আমার আপত্তির কী আছে?’ বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
বাবরি ধ্বংসের জন্য যার বিরুদ্ধে মামলা সেই তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। এমন নীতিহীন রাজনীতি তিনি চিরকালই করে এসেছেন। এরাজ্যে এখন তাঁকেই তুলে ধরা হচ্ছে বিজেপি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনের মুখ হিসাবে। সতর্কতা এখানেও।
ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে গ্রামের পথে মিছিল করলে সশস্ত্র হামলা চালায় শাসকদল। কিন্তু অস্ত্র নিয়ে বজরঙ দলের প্রশিক্ষণ শিবির চলে নিশ্চিন্তে। এরাজ্যে এখন এটাই দস্তুর। 
আর এস এস-এর শাখা বাড়াতেই থেমে নেই উদ্বেগ। সেনা কায়দায় প্রশিক্ষণ হচ্ছে বাংলার মাটিতে। গত ডিসেম্বর মাসের ১৭থেকে ২৩শে দক্ষিণ ২৪পরগনা জেলার কুলতলি ব্লকে ১৭০জন যুবককে নিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের যুব সংগঠন বজরং দল। যাদের তাণ্ডবে দু’দিন আগেই বুলন্দশহরে খুন হয়ে গেছেন পুলিশ অফিসার। সেই সংগঠন এরাজ্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে .২২ ক্যালিবারের রাইফেল নিয়ে। 
চুপ করে দেখেছে মমতা ব্যানার্জির দল ও প্রশাসন। 
তখনও অক্ষত বাবরি মসজিদ। কিন্তু সাম্পদায়িক শক্তির বিপদ পুরোমাত্রায়। গোটা দেশ থেকে ইট নিয়ে পুজো করে অযোধ্যায় পাঠানোর কর্মসূচি ছিল সঙ্ঘের। ১৯৯০সালে সেই কর্মসূচির প্রভাব কী ছিল বাংলায়।
‘আমি শুনেছি, অনেক জায়গায় শিলাপুজো প্রত্যাখান হয়েছে। শিলাপুজো যা হয়েছে তা খুব বেশি জায়গায় নয়। দু-একটা জায়গায় হয়েছে। এটা পশ্চিমবাংলার চেতনার পরিচায়ক। এটা এখানকার সবার চেতনার পরিচায়ক। সেজন্য আমরা একটু গর্ব করবো না।’ ২৮ জানুয়ারি, রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ বিতর্কে অংশ নিয়ে বলেছিলেন জ্যোতি বসু।
দুর্গাপুজো কমিটিকে কোনোদিন টাকা দেয়নি বামফ্রন্ট সরকার। সব পুজো কমিটি একযোগে প্রত্যাখান করেছিল শিলাপুজোকে।
এটাই বাংলার চেতনা। বাংলার ঐতিহ্যকে সামনে রেখে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রক্ষায় এই চেতনা নিয়েই পথ হাঁটবে ৬ ডিসেম্বরের মহামিছিল।