আড়াই লক্ষ বাঙালি
স্বর্ণকারের জীবিকা বিপন্ন দিল্লিতে

দূষণের অভিযোগ যথার্থ কিনা, উঠছে প্রশ্ন

আড়াই লক্ষ বাঙালি <br> স্বর্ণকারের জীবিকা বিপন্ন দিল্লিতে
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : নয়াদিল্লি, ১০ই ডিসেম্বর- দিল্লি ঝাঁ চকচকে করোলবাগ বাজার পেরিয়ে কিছুটা এগলেই চলে আসবে বাঙালি পাড়া। বাঙালি স্বর্ণকারদের পাড়া। এখানে স্বর্ণশিল্পের কারিগররা বাঙালি, আবার ছোট ছোট কারখানার মালিকরাও বাঙালি। দীর্ঘদিনের পেশাদার হাজার হাজার স্বর্ণকারের জীবনজীবিকা আজ বিপন্ন। স্বর্ণালঙ্কার কারবারের ওপরে কোপ পড়েছে দিল্লি দূষণ পর্ষদের। তাদের নির্দেশে দিল্লি কর্পোরেশন সাবেকি স্বর্ণালঙ্কার বানানোর কারখানাগুলি বন্ধের নোটিস জারি করেছে। ৫/১০জন কারিগর নিয়ে ছোট ছোট কারখানা  একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 
করোলবাগের এই বাঙালি মহল্লায় এখন কাজ  হারানোর হাহাকার। মালিক, কারিগর সকলেরই রুটিরুজিতে টান পড়েছে। কারখানায় তালা পড়ায় বহু বাঙালি কারিগর পশ্চিমবঙ্গে বাড়িতে ফিরে গেছেন। কেউ বা অন্য জীবিকার সন্ধানে  ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। ইতিমধ্যে দিল্লি স্বর্ণকার সঙ্ঘের নেতৃবৃন্দ তাঁদের সমস্যা নিয়ে সি পি আই (এম) নেতা সীতারাম ইয়েচুরির সঙ্গে কথা বলেছেন। ইয়েচুরি এব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। 
পশ্চিমবঙ্গের অনেকের কাছেই পরিচিত দিল্লির করোলবাগ বাজার। সেই বিশাল বাজারের এক প্রান্তে স্বর্ণকারদের মহল্লা। বেশিরভাগই বাঙালি। ছোট ছোট ঘর নিয়ে সোনার অলংকার বানানোর আস্তানা। কারখানাতেই কাজ, কারখানাতেই  ঘুম। এভাবেই চলে দিনের পর দিন।  প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। নানা সমস্যা এসেছে, তবে কোনদিনই শিল্প বন্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়নি। নতুন কর কাঠামো পণ্য পরিষেবা কর বা নোট বাতিলের পদক্ষেপ বিধ্বস্ত করেছে ব্যবসাকে। তবুও উঠে দাঁড়িয়ে কারবার চালানোর চেষ্টায় কোন খামতি ছিল না স্বর্ণকারদের। 
দিল্লি স্বর্ণকার সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক বিভাসচন্দ্র মাইতি জানালেন, দূষণের নামে নোটিস দিয়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ করছে দিল্লি কর্পোরেশন। গত ১৬ই মে ১৬টি কারখানা ‘সিল’ করে দিয়েছে কর্পোরেশন। গত শুক্রবার ফের ১০৩টি কারখানায় তালা ঝুলিয়ে ‘সিল’ করে দিয়েছে কর্পোরেশন। তিনি জানান,  বহু বছর আগে থেকেই জীবিকার সন্ধানে এসে এই অঞ্চলে থিতু হয়েছেন বাঙালি স্বর্ণকাররা। দিল্লিতে বাঙালি স্বর্ণকারের সুনামও রয়েছে। কোন  কারিগর একসময়ে হয়ত ছিলেন ছোট কারখানার শ্রমিক। তিনিই এখন মালিক হয়ে ৪/৫জন কারিগর নিয়ে অলংকার বানানোর কারখানা চালান। মাইতি জানান, ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার মালিক-কারিগররা সকলেই এখন রাস্তায়। যাঁদের কারখানা খোলা রয়েছে তাঁরাও অনিশ্চয়তায়, কখন তাঁদের ওপর কর্পোরেশনের দূষণ নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। বাঙালি মহল্লা জুড়ে এখন প্রতিদিনের আলোচনা কবে কার কারখানায় কর্পোরেশনের নোটিস ঝুলেছে।
এদিকে দূষণের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা অমূলক বলেই মনে করেন স্বর্ণকার বিভাসচন্দ্র মাইতি। সোনার অলংকার নির্মাণের বিভিন্ন যেসব ধাপ রয়েছে তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এতে দূষণের আশঙ্কা আগে যত ছিল তা আর এখন নেই। কারণ আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করায় দূষণের সুযোগ কমে গেছে। প্রথমে কারখানায় সোনা গলিয়ে নানা ধাপে গয়না নির্মাণ করে তা  সম্পূর্ণ হলে পালিশের জন্য তা ফের পাঠানো হয় পালিশ কারখানায়। সেই পালিশে ব্যবহার হয় সালফিউরিক অ্যাসিড। নতুন যন্ত্র ব্যবহারের ফলে এই সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহারের দূষণ ৯০শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে, কারখানায় পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এল পি জি) ব্যবহারও বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানায় এখন প্রাকৃতিক গ্যাস (সি এন জি) ব্যবহার করা হয়। সোনার গয়না বানানোর কাজ বিভিন্ন ধাপে হয়। সেখানে বেশি কর্মী যুক্ত থাকেন। সেখানে দূষণ  প্রায় শূন্য। পালিশের কাজে অল্প দূষণ হয়। আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের ফলে তা আরও কমে গেছে। এছাড়া দেখা যায়, ১হাজার কর্মী যত অলংকার তৈরি করেন তার পালিশ একটি ইউনিটে একজন কারিগরই করেন। এছাড়া আরেকটি বড় কাজ যা মূলত সোনার অলংকারের দোকানে হয়, এই ছোট কারখানায় হয় না। তা হলো, সোনা গলিয়ে পুরানো গয়না থেকে আসল সোনা বের করা। আধুনিক ইলেকট্রনিক মেশিনে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এই পুরানো গয়নার খাদ গলিয়ে আসল সোনা বার করা হয়। এতে কারিগর কম লাগে। তবে এই কাজে বেশিরভাগই হলেন মারাঠি কারিগর। বড় বড় সোনার দোকানে কিন্তু কর্পোরেশন হানা দেয়নি। তাদের কারখানাও কোথাও বন্ধ হয়নি। দূষণের কিছু আশঙ্কা থাকলে তা সেখানেই হয়। যেখানে এই দূষণের আশঙ্কা একেবারেই নেই, হাতের কারুকাজ হয় যেসব কারখানায়, সেখানেই দূষণের অজুহাতে কারখানা দরজা একে একে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে!
করোলবাগের বাজারে ঘুরলেই টের পাবেন বাঙালি কারিগরের গয়নার কারুকাজের সুনাম কতটা। সকলেই একবাক্যে তা স্বীকার করেন। ফলে অভিজাত পরিবারের নানা অলংকারের বরাত সরাসরি চলে আসে এই ঘুপচি বাঙালি মহল্লাতেই। পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুট ঘরেই কারিগরদের জীবন কেটে যায়। তাঁদের কেউ এসেছেন বর্ধমান থেকে, কেউ মেদিনীপুর, কেউ হুগলী, কেউ বা দক্ষিণ অথবা উত্তর ২৪ পরগনা থেকে। 
এই মহল্লায় অবশ্য আরও অনেক সমস্যা রয়েছে সোনার কারিগরদের। রয়েছে সোনা আদান-প্রদানে নিরাপত্তার সমস্যা। স্বর্ণকারদের সঙ্গে কথা বলেই জানা যায় এই অঞ্চলে মরশুমের বাজারে কেজি কেজি সোনার কাজ হয়। যাঁরা কাজ করেন তাঁদের পরিবারে সারা জীবনেও হয়তো শখের গয়না বানানোর সামর্থ্য থাকে না। তাঁরাই বানিয়ে চলেছেন দেশের সেলিব্রিটি ও মডেলদের নানা অলংকার। প্রতিদিনের বিজ্ঞাপনেই তাঁরা খুঁজে নেন কার হাতের কাজ কোনটা। স্বর্ণকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুধুমাত্র করোলবাগেই এরকম ছোট কারখানা রয়েছে  ৫০হাজার। এতে গড়ে ৫জন কর্মী হলে মোট কর্মীর সংখ্যা হবে প্রায় আড়াই লাখ।   কারিগরদের পরিবার মিলে প্রায় ১০লক্ষ বাঙালি মানুষের জীবন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। একটি হিসেবে দেখা গেছে, মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জি ডি পি) ৬.৩%এই স্বর্ণশিল্প থেকেই আসে। তবুও দিল্লিতে এই শিল্পের উন্নয়নে কোন সরকারি পরিকল্পনা নেই, যাদের নিয়ে বলারও কেউ নেই।

 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement