এবার তারাপীঠ থেকে রামপুরহাটে
বয়ে গেল লাল স্রোত

ধরাশায়ী করো বিভেদের শক্তিকে

এবার তারাপীঠ থেকে রামপুরহাটে <br> বয়ে গেল লাল স্রোত
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: রামপুরহাট, ১০ডিসেম্বর— কোলে চার বছরের প্রিয়াঙ্কা। খিদেয় চেঁচাতে চেঁচাতে একসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মা রুবি মুর্মু তবুও নাছোড়। মেয়ের মাথা কাঁধের উপর ফেলেই হেঁটেছেন টানা দশ কিলোমিটার পথ। কোনও একটা গাড়িতে উঠে যাওয়ার পরামর্শ দিতে গেলে গলা ঝাঁঝিয়ে বলেছেন, ‘গাড়িতে যেতে হলে তুরা যা। আমি হেঁটেই যাব।’ মেয়ে যে খিদেয় কাঁদছে? ‘খিদের জ্বালাতেই তো হাঁটছি।’ বলেই পাশে মাদল হাতে থাকা চরণ, কুলিকা, সুমিদের নিয়ে ফের হনহন করে হাঁটতে শুরু করেছেন রুবি মুর্মু।
সোমবার তারপীঠের ফুলিডাঙা মসজিদের সামনে থেকে শুরু করেছিলেন হাঁটা। হাজার হাজার মানুষের সাথেই রুবি হাঁটা শেষ করেছেন রামপুরহাটের পাঁচমাথা মোড়ে। সম্প্রীতির আহবানে মহামিছিলের ডাক ছিল বামফ্রন্টের। দাবি ছিল চাই ফসলের নায্য দাম, একশোদিনের কাজের নিশ্চয়তা, বেকারদের চাকরি ইত্যাদি। হার মেনেছে অনুমান। ছাপিয়ে গেছে প্রত্যাশা। লালঝান্ডা হাতে হাজার হাজার মানুষের মিছিল দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তারাপীঠ থেকে রামপুরহাট লাল স্রোত বয়ে গেছে এদিন। চোয়াল চাপা জেদ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে যত মানুষ মিছিল শুরু করেছিলেন ঠিক তত মানুষই শেষ অবধি থেকেছেন মিছিলে। বরং মিছিল আয়তনে বেড়ে গেছে। দিনমজুর পরিবারের গৃহবধূ রুবি মুর্মুর পাশে হেঁটেছেন মহম্মদ বাজারের নির্মাণ শ্রমিক সেখ রাজিত। মাসকয়েক আগেই কাজ করতে গিয়ে ঘটেছিল দুর্ঘটনা। এক পায়ে অনেকটা মাংসপিণ্ড বাদ দিতে হয়েছে অস্ত্রোপচার করে। এখনও থেকে থেকেই পা টনটন করে ওঠে। তবু তিনি এদিন হেঁটেছেন। ‘দিনে তিনশো টাকা মজুরি। তাও আর মাসে সবদিন কাজ মিলছে না। আর গাঁয়ে উন্মাদনা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কখনও রামনবমী তো কখনও নবী দিবস নিয়ে। কি হবে যদি পেটেই ভাত না থাকে।’ একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন এই রাজমিস্ত্রি। যেমন মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে ক্ষোভ উগড়েছেন পাড়ুইয়ের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ওয়াসিমা খাতুন কিংবা নলহাটির প্রথম বর্ষের ছাত্র সোহেল রানা। মিছিলে স্লোগান দিয়েছেন। গলা ফাটিয়ে বলেছেন, ‘বিভেদের মাঝে দাঁড়াবো বুক চিতিয়ে। আমাদের দাবি জাতপাতের হিংসা থামাও। পড়াশুনার খরচ কমাও। দাও কাজ।’
মিছিলে শামিল হয়েছিলেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। এদিনের কর্মসূচি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, সারা দেশে যা অবস্থা তাতে যেকোনও সময় মানুষের ক্ষোভের অগ্নুৎপাত ঘটে যেতে পারে। কারণ এখন যিনি প্রধানমন্ত্রী আছেন এবং তার যে সাঙ্গোপাঙ্গ বা শাখা সংগঠন আছে তারা দেশে এক ভয়ানক অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করছে। এই অশান্তির বাতাবরণ কোথায় গিয়ে শেষ হবে বোঝা মুশকিল। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধানোর চক্রান্ত চলছে, যাঁরা মৃত গোরুর চামড়া বিক্রি করে রোজগার করেন, তাঁদের পর্যন্ত খুন করে দেওয়া হচ্ছে, ফ্রিজে রাখা ছাগলের মাংসকে গোরুর মাংস বলে খুন করে দেওয়া হয়েছে মহম্মদ আখলাখকে। আবার সেই মামলার তদন্তকারী অফিসারও খুন হয়ে গেছেন। তাই মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়ানো প্রয়োজন। ঐক্যবদ্ধভাবে এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা যদি সাম্প্রদায়িক আস্ফালন করে তাহলে মুসলিমদের সংখ্যা কম হলেও তাঁদের মধ্যেও মৌলবাদী প্রবণতা দেখা দেবে। হিন্দু মৌলবাদই তো মুসলিম মৌলবাদকে বাড়িয়ে তুলছে।
বিমান বসু বলেন, দলিত মানুষের ওপর হামলা হচ্ছে। রামপুরহাট থেকে খুব বেশি দূরে নয়, এখানেই আদিবাসী মানুষদের ধর্মান্তরকরণ করিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। এখন সেখানে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে গোশালা সহ একটা নিবাস তৈরি হচ্ছে। সেটা তৈরিতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের পঞ্চায়েতেরও ভূমিকা আছে। অথচ তারা বিজেপি’র বিরুদ্ধে কথা বলে। এটা কি সত্যিকারের বিরোধিতা? নাকি বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিরোধিতা? যারা বিজেপি’র সঙ্গে বোঝাপড়া করে কাজ করে তাদের সাথে কোনও বিজেপি বিরোধী জোট গড়ে ওঠা সম্ভব না। অশুভ শক্তি যারা জাতের নামে বজ্জাতি করে, যারা সংবিধান মানে না, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। তাই জেলায় জেলায় আমাদের সম্প্রীতির মিছিল চলছে।
এদিন মিছিলের গোটা পথজুড়ে যেমন হেঁটেছেন অজস্র মানুষ, তেমনই মিছিলের দু’পাশও ছিল লোকে লোকারণ্য। মিছিল দেখতে, মিছিলের ছবি মোবাইলের লেন্সবন্দি করতে অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা গেছে এদিন। কোথাও মানুষ ছুটে এসেছেন তাঁদের প্রিয় নেতা বিমান বসুকে নিজে হাতে চা খাওয়াতে, রাস্তার ধারে পাতা খাটিয়া ছেড়ে নিজের বাড়ির চেয়ার বাড়িয়ে তাতে বসার আবদার করেছেন। আবেগ, জেদ, উন্মাদনা, উচ্ছ্বাস আর লালঝান্ডায় তারাপীঠ-রামপুরহাট যেন একাকার হয়েছে এদিন।
এদিনের মিছিলে শামিল হয়েছিলেন বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী। অনুব্রত মণ্ডলের ‘পাচনের দাওয়াই’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাজ দিতে পারছে না, পেটের ভাত জোগাতে পারছে না, সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারছে না, তাই আজ পাচন দেখাচ্ছে তৃণমূল। সেই সঙ্গে পাপের টাকায় কিনে খোল-করতালকেই অপবিত্র করছেন অনুব্রত মার্কা নেতারা, সবই মমতা ব্যানার্জির অনুপ্রেরণায়।’ এদিনের মিছিলে এছাড়াও ছিলেন সিপিআই (এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রামচন্দ্র ডোম, ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সম্পাদক নরেন চ্যাটার্জি, আরএসপি নেতা তপন হোড়, সিপিআই নেতা দ্বারিক চক্রবর্তী, আরসিপিআই নেতা মিহির বায়েন প্রমুখ। সকলেই একবাক্যে বলেন, ‘‘দেশ এবং আমাদের রাজ্যজুড়ে চলা সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই একমাত্র পথ। সেই পথেই বিনাশ করতে হবে বিভেদের শক্তিকে।’ 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement