ইস্তফাই দিলেন
উর্জিত প্যাটেল

 ইস্তফাই দিলেন <br> উর্জিত প্যাটেল
+

মুম্বাই, ১০ডিসেম্বর- ধান্দার ধনতন্ত্রে হাত দিতে গিয়ে সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইস্তফাই দিলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল। গত কয়েক মাস ধরেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীন কার্যধারায় একের পর এক হস্তক্ষেপ চলছিল। নজিরবিহীনভাবে আর বি আই আইনের ৭নং ধারা প্রয়োগ করে অর্থ মন্ত্রক থেকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দু’দুটি দীর্ঘ বোর্ড সভায় ‘সমঝোতার’ খবর প্রচারিত হলেও বাস্তব যে তা নয়, তা সোমবার বিস্ফোরণের মতো সামনে চলে এল। শুক্রবার আরেকটি বোর্ড সভা নির্ধারিত রয়েছে। এখন মনোনীতদের দিয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদন করিয়ে নেবার খেলায় লিপ্ত কেন্দ্র। এই অবস্থায় মুম্বাইয়ের মিন্ট রোডে আর বি আই-র সদর দপ্তরের কুড়ি তলার কোণের ঘর ছেড়ে চলেই গেলেন প্যাটেল। রঘুরাম রাজন মেয়াদ ফুরোনোর পরেই চলে গিয়েছিলেন, সরকারের সঙ্গে মতে মিলছিল না বলে। তাঁর উত্তরসূরিকে তুলনায় ‘শিষ্ট’ এবং ‘সম্মত’ বলে প্রাথমিকভাবে মনে হলেও নীতি নির্ধারণে নির্বিচার হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারেননি। ইস্তফার চিঠিতে ‘ব্যক্তিগত কারণে’ পদত্যাগের কথা বলা হলেও ঘটনাক্রম স্পষ্টই প্রমাণ করছে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে বাঁচানোর প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বাধীন ভূমিকা বিসর্জন দিতে তিনি রাজি হননি। 
সোমবার সন্ধ্যায় প্যাটেলের ইস্তফার পরপরই খবর ছড়িয়েছিল ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্যও পদত্যাগ করেছেন। পরে আর বি আই-র তরফে জানানো হয়েছে, এই সংবাদ গুজব। বিরল আচার্যের একটি বক্তৃতা থেকেই সরকার-আর বি আই সংঘাত সামনে এসেছিল। বস্তুত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের চার ডেপুটি গভর্নরই স্বশাসনের প্রশ্নে এক অবস্থানে বলে খবর। 
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে মোদী সরকারের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে কর্পোরেট মহলের অতি মুনাফার কারবার। ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় জমেছে অনাদায়ী ঋণের পাহাড়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ‘দ্রুত সংশোধনী পদক্ষেপ’ ( পি সি এ)—এর  ব্যবস্থায় কোন কোন উপাদান থাকলে ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণ অনাদায়ী ঋণ বলে বিবেচিত হবে তা স্থির করেছে। এর ফলে বড় কয়েকটি কর্পোরেট সংস্থা, বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি বিপদ পড়েছে। বছরের পর বছর ঋণ বকেয়া রেখে ব্যবসা করার ধারা বদলাতে এরা বাধ্য হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইনের ৭নং ধারা ব্যবহার করে কেন্দ্র রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে বেনজির যে চিঠি দিয়েছে তার একটি বিদ্যুৎ সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে অনাদায়ী ঋণ ফেরতের ব্যবস্থা থেকে ছাড় দেবার বিষয়ে। অনাদায়ী ঋণ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের এই উদ্যোগ কর্পোরেট মহল ভালো চেখে দেখেনি, তাদের হয়ে সওয়াল করেছে সরকারও। কর্পোরেটের অনাদায়ী ঋণকে ব্যাঙ্কের আমানতকারীদের ওপরে চাপানো বা রাষ্ট্রের ঘাড়ে নিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। 
বিরোধের আরেকটি ক্ষেত্র বাজারে নগদের জোগান বৃদ্ধি নিয়ে। অনাদায়ী ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাঙ্কগুলির নতুন ঋণ দেবার ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিধিনিষেধ জারি করেছে। ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ঋণ দেওয়া বন্ধই করে দেওয়া হয়েছিল। নন ব্যাঙ্কিং আর্থিক সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও নগদের জোগান বাড়াতে চাপ দিচ্ছে সরকার। যদিও এর টাকা শেষপর্যন্ত কর্পোরেটের হাতেই যাচ্ছে বলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সূত্রের খবর। শেষ দু’টি বোর্ড সভায় আর বি আই এই প্রশ্নে বিধিনিষেধ কিছু শিথিল করেছে। 
একদিকে অনাদায়ী ঋণ হ্রাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে চাপ, অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও কঠোরভাবে নিয়ম প্রয়োগের রাস্তায় হাঁটছিলেন প্যাটেল। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক ও ইয়েস ব্যাঙ্কে মুখ্য অধিকর্তাদের মেয়াদ ফুরোনোর আগেই সরতে হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিচালনার দায়ে। কোটাক মাহিন্দ্রা ও বন্ধন ব্যাঙ্কের প্রোমোটারের অংশীদারিত্ব কমানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বস্তুত কোটাক মাহিন্দ্রা এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সোমবারই আদালতে গেছে। 
সবচেয়ে প্রবলভাবে সামনে এসেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মূলধন থেকে টাকা নিয়ে কোষাগারীয় ঘাটতি মেটানোর জন্য কেন্দ্রের উদ্যোগ। কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রক রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মূলধনের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩.৬লক্ষ কোটি টাকা কেন্দ্রের কোষাগারের জন্য চাইছে। এ নিয়ে আরবিআই’কে চিঠিও দেয় কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এককথায় ওই টাকা হস্তান্তরে রাজি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বক্তব্য, দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ওই সঞ্চয় খুবই জরুরি। শেষ পর্যন্ত ১৯ নভেম্বর বোর্ডের বৈঠকে ঠিক হয় একটি কমিটি ওই সঞ্চয় বন্টন খতিয়ে দেখবে। কিন্তু কমিটির প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। কেন্দ্র প্রকৃতপক্ষে কোষাগারীয় ঘাটতি মেটাতে ওই টাকা চাইছে। কেন্দ্র যুক্তি দেখাচ্ছে এত মূলধনী সঞ্চয় রাখার প্রয়োজন নেই আর বি আই-র। অর্থনীতিবিদ মহলের ধারণা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির যে কাহিনিই শোনানো হয়ে থাক বাস্তবে তা শ্লথ। রাজস্বও কমে গেছে। অথচ লোকসভা ভোটের আগে কেন্দ্র খরচে সংযম করতে পারবে না বলেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কোষাগারে হাত দিচ্ছে। 
স্বাধীনতার পর থেকে আর বি আই আইনের ৭ নং ধারা কোনোদিনও ব্যবহার হয়নি। অথচ মোদী সরকার সেই ধারায় চিঠি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে কার্যত অর্থ মন্ত্রকের অধীন একটি দপ্তরে পরিণত করতে চেয়েছে। এমনকি কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রকের শীর্ষ অফিসাররা টুইটারে কটাক্ষ করছিলেন আর বি আই কর্তাদের। এভাবে ফতোয়া দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে সরকারের অধীন করে ফেলা মানতে চাননি উর্জিত প্যাটেল। তিনি যে পদত্যাগ করতে পারেন, তেমন সম্ভাবনা ছিলই। শুক্রবারের বৈঠকে কোনও চাপের কাছে নতিস্বীকার করার আগেই দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন প্যাটেল। 
অথচ নোট বাতিলের ঘটনায় সরকারের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন প্যাটেল। পরবর্তী সময়ে জানা গেছে আরবিআই এই চমক-মার্কা পদক্ষেপের সঙ্গে একমত ছিল না। তবুও প্রকাশ্যে সংঘাতে যাননি প্যাটেল। শেষ পর্যন্ত ব্যাঙ্কে ফিরে আসে বাতিল নোটের ৯৯.৩শতাংশই। ‘কালো টাকা’ উদ্ধারের কাহিনী ফেঁসে যায়। আরবিআই এই টাকা ফেরতের তথ্য প্রকাশ করাতেও ক্ষুব্ধ ছিলো সরকার। 
লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স, কেমব্রিজ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা প্যাটেল ছিলেন কেনিয়ার নাগরিক। পরে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেন। ২০১৩-র জানুয়ারিতে ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। আরবিআই-কে তখন বর্ণনা করেছিলেন ‘প্যাঁচা’ হিসাবে। নজরদারির অর্থেই। ডেপুটি গভর্নর হিসাবেই আর্থিক কমিটির প্রধান ছিলেন প্যাটেল। মুদ্রাস্ফীতির সূচকের সঙ্গে সুদের হার ও আর্থিক নীতিকে জুড়ে দিয়ে নতুন পথে হেঁটেছিলেন। গভর্নর হিসাবে তাঁর মেয়াদ ছিল ২০১৯-র সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকাকে উপকথার ‘নীলকণ্ঠ’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন নিজেই। কিন্তু বিষ পানেরও যে সীমানা আছে, তা স্মরণ করিয়েই সোমবার সরে গেলেন প্যাটেল। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement