সাজানো মামলায় জেল
হেপাজতে ৫ বামপন্থী কর্মী

সাজানো মামলায় জেল <br> হেপাজতে ৫ বামপন্থী কর্মী
+

 গণশক্তির প্রতিবেদন: কলকাতা, ১০ জানুয়ারি-  ধর্মঘটে ভাঙচুর র সাজানো মামলায় বুধবার গ্রেপ্তার হওয়া ৫ বামপন্থী নেতা কর্মীকে বৃহস্পতিবার একদিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দিল ব্যাঙ্কশাল কোর্ট।

প্রতিবাদে এদিন সন্ধ্যাতেই ফের আন্দোলনে এস এফ আই। কলেজ স্ট্রিট মোড়ে চলে অবরোধ, পুড়ল মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুতুল।

ধর্মঘটের প্রথম দিন মঙ্গলবার থেকেই ধর্মঘট ভাঙতে কলকাতা জেলা জুড়ে বেনজির ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ। মঙ্গলবার ও বুধবার কলকাতায় জারি করা হয় অঘোষিত ১৪৪ ধারা। লালঝান্ডার কোনও মিছিলই করা যাবে না, মিছিল করলেই গ্রেপ্তারি, এমনটাই নির্দেশ ছিল পুলিশের উপর।

ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন বৈঠকখানা রোডের মুখে ধর্মঘটীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে, ২২জন ধর্মঘটীকে আটক করে আমহার্স্ট থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। রাতভর থানায় আটক রেখে রাত আড়াইটা পর্যন্ত দফায় দফায় অ্যারেস্ট মেমোয় সই করানো হয়। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রায় কাকভোরে শারীরিক পরীক্ষার পর শারীরিকভাবে অসুস্থ পাঁচ জনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বুধবার দুপুরে আদালতে তোলা হয় গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ বামপন্থী নেতা কর্মীদের। ১২জন বামপন্থী কর্মীকে আদালত জামিনে মুক্তি দিলেও একদিনের জেল হেপাজত দেওয়া হয়েছে সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য  সংগ্রাম চ্যাটার্জি, এসএফআই নেতা দীপক সিংহ, সুশ্রীল মিশ্র, ডিওয়াইএফআই নেতা তাপস সাহা, ধীরেন্দ্রকুমার সিনহাকে। শুক্রবার ফের আদালতে তোলা হবে পাঁচ জনকে।

সকাল ১১টা থেকেই মিডিয়ায় দেখানো হতে থাকে পাটোয়ার বাগান অঞ্চলে নাকি মিছিল থেকে স্কুলপড়ুয়াদের পুলকারে ভাঙচুর চালায় ধর্মঘটীরা। সেই অভিযোগেই গ্রেপ্তার করা হয় ধর্মঘটীদের।

ঠিক কী হয়েছিল বুধবার?

ধর্মঘটের প্রথম দিনেও বউবাজার ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া-র মোড় থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সিআইটিইউ, ছাত্র যুব কর্মীদের। পুলিশের হুমকি, চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেও ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন বুধবার সকাল থেকেই মিছিল সংগঠিত করতে অনড় থাকেন ধর্মঘটীরা। কলেজ স্ট্রিট বাটার মোড় থেকে সকাল সাড়ে ন টায় মিছিল শুরুর সময়েও বাধা দেয় পুলিশ। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করেই ধর্মঘটের সমর্থনে স্লোগান তুলে মিছিল এগিয়ে যেতে থাকে কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের দিকে। রাজাবাজার মোড়ে মিছিল পৌঁছাতেই মারমুখী হয়ে ওঠে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্যই শিয়ালদহ ফ্লাইওভার দিয়ে মিছিল না করে মিছিল করা হয় ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশের রাস্তা দিয়ে পাটোয়ারবাগান অঞ্চলে। মিছিল বৈঠকখানা রোডে পৌঁছানো মাত্রই বিনা প্ররোচনায় পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। মারতে মারতে ছত্রভঙ্গ করা হয় ধর্মঘটীদের। সিপিআই(এম) নেতা সংগ্রাম চ্যাটার্জি, দেবাংশু নন্দী, ইন্দ্রজিত ঘোষ, সিপিআই(এম) নেত্রী মধুজা সেন রায়, এসএফআই রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, এসএফআই নেতা অর্জুন রায়, দীপক সিংহ সহ ২২জনকে আটক করে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।

থানায় পৌঁছানো মাত্রই শুরু হয়  ভাঙচুর র সাজানো মামলার পালা।

পাটোয়ার বাগান, ভিক্টোরিয়া কলেজের সামনের রাস্তা বা বৈঠক খানা রেডের সামনেও  পুলকার  চোখে না পড়লেও থানায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসার পরই সামনে চলে আসে  ভাঙা পুলকার !

বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় আটক হওয়া বামপন্থী কর্মীদের নিয়ে আসার আধ ঘণ্টা পরেই থানায় দলবল নিয়ে হাজির হয়ে যান ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল নেতা পিয়াল চৌধুরি। মিডিয়ার ক্যামেরার সামনেই শুরু হয়ে যায় তৃণমূল নেতার হাঁকডাক।  বিচার ফিচারের দিন চলে গেছে, বিচার চাইতাম তখন যখন সিপিএম ক্ষমতায় ছিল , তৃণমূল জমানায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘটনার তদন্তের পর বিচার পাওয়া যে যাবে না, কার্যত হুমকিতেই স্পষ্ট করেন তৃণমূল নেতা!

গ্রেপ্তার হওয়া বামপন্থী নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁরা না কি একটি পুল কারে ভাঙচুর চালিয়েছেন উইকেট দিয়ে। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা চত্বরে মিডিয়ার ক্যামেরার সামনেই একটি উইকেট হাতে নিয়ে পিয়াল চৌধুরি বলতে থাকেন  এই উইকেট দিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে , যদিও ২২জনের গ্রেপ্তারের পরেও  ভাঙচুর  চালানোর মোক্ষম অস্ত্র একটি  উইকেট  পুলিশ সিজ করেনি তদন্তের স্বার্থে, সেই  উইকেট  রেখে দেওয়া হয় থানা চত্বরে নিয়ে আসা  ভাঙা পুলকারের  উপরেই! সেই  উইকেট  হাতে নিয়েই মিডিয়ায় বাইট দিয়েছেন তৃণমূল নেতা পিয়াল চৌধুরিউইকেট  হাতে নিয়ে  ভাঙচুর র বর্ণনা দিয়েছেন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক, তখনও  উইকেট  সিজ করেনি পুলিশ!

 পুলকার  কীভাবে এল? কোন স্কুলের  পুল কার ?

আমহার্স্ট স্ট্রিটের  অ্যাংলো অ্যারাবিক স্কুলের  পুলকার, যে স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল নেতা পিয়াল চৌধুরির স্ত্রী তথা ওই ওয়ার্ডের তৃণমূলের কাউন্সিলর সোমা চৌধুরির। মিডিয়ার ক্যামেরায় দেখা গেছে পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী যে আহত স্কুল ছাত্রটিকে, তার বাবা তানজু ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কর্মী এবং পিয়াল চৌধুরির ছায়াসঙ্গী।

কিভাবে সাজানো হয়েছে অভিযোগ?

সকাল এগারোটা নাগাদ ২২জন বামপন্থী নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তারের পরেই দলবল নিয়ে থানায় এসে পিয়াল চৌধুরি দাবি জানাতে থাকেন জামিন অযোগ্য মামলা দিতেই হবে। অভিযোগ, আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার ওসি-র ঘরে গিয়ে পিয়াল চৌধুরি বলে দেন কার কার নামে  কেস  দিতেই হবে, সিপিআই(এম) নেতা সংগ্রাম চ্যাটার্জি, দীপক সিংহ, ইন্দ্রজিত ঘোষ, সুশ্রীল মিশ্রদের নাম রাখতেই হবে। পুলিশ সেই মতো শুরু করে  কেস   সাজানো। গ্রেপ্তার করার প্রায় আড়াই ঘণ্টা বাদে অ্যারেস্ট মেমোয় সই করানো হয় সংগ্রাম চ্যাটার্জি, সৃজন ভট্টাচার্য, ইন্দ্রজিত ঘোষ, তাপস সাহা, ধীরেন্দ্র কুমার সিনহাকে। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত ধৃত বামপন্থী নেতা কর্মীদের খাবার তো দূর, চা বিস্কুট পর্যন্ত দেয়নি পুলিশ!

সকাল সাড়ে দশটা থেকে রাত আড়াইটা অবধি থানায়  ভুলে ভরা  অ্যারেস্ট মেমোয় দফায় দফায় সই করানো চলে। কীরকম ভুল? যেমন এসএফআই নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের বাবার নাম অরিন্দম ভট্টাচার্য হলেও অ্যারেস্ট মেমোয় লেখা হয় প্রথমে গৌতম ভট্টাচার্য। বিস্তর ভুলের পর অবশেষে রাত আড়াইটের সময় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ২২জনকে নিয়ে আসা মেডিক্যাল কলেজে চেক আপের জন্য। সেখানেও  ভুল কাগজ -র জন্য ফের বিলম্ব। শারীরিক অসুস্থতার জন্য রৌনক সিনহা, দেবজ্যোতি মিশ্র, মনোজ জওসওয়াল, রাজেশ জওসওয়াল, ভোম্বল সরকারকে ভোর চারটের সময় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও  বাকি ১৭জনকে নিয়ে আসা হয় লালবাজারে। সেখানেও চলতে থাকে পুলিশের অসভ্যতা, কয়েদির পোশাক পরে লকআপে ঢুকতে হবে, প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটে পুলিশ।

গ্রেপ্তার হওয়া বামপন্থী নেতা কর্মীদের মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুর একটা থেকেই ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে জড়ো হতে থাকেন ছাত্র, যুব, গণআন্দোলনের কর্মীরা। আদালত চত্বর কার্যত মুড়ে রাখা হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়। স্টিলের ব্যারিকেড থেকে কাঁদানে গ্যাস সবকিছুই প্রস্তুত রাখা হয়। আদালত চত্বরে বিক্ষোভ এড়ানোর জন্যই একটার আগে সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ ১৭জন বামপন্থী নেতা কর্মীকে নিয়ে আসে পুলিশ। দুপুরে আদালতে বিচারক বাকিদের জামিনে মুক্তি দিলেও সংগ্রাম চ্যাটার্জি, দীপক মিশ্র, সুশ্রীল মিশ্র, ধীরেন্দ্র কুমার সিনহা, তাপস সাহাকে একদিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেন বিচারক, যদিও পুলিশের আইনজীবী ১৪দিনের জেল হেপাজতের জন্য সওয়াল করেন। পাঁচ জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৭,১৪৯, ৪২৭, ৩২৪, ৩৫৩ ধারায় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরবিরোধী কালা আইনের ৮এবং ৯ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

আদালত চত্বর ফেটে পড়ে স্লোগানে স্লোগানে। ছাত্র যুব মহিলা কর্মীদের স্লোগানে সংহতিতে মিশেই আলিপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয় পাঁচ বামপন্থী নেতা কর্মীদের। মিথ্যা সাজানো মামলা প্রত্যাহার ও পাঁচ জনের মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট মোড় অবররোধ করে বিক্ষোভ দেখায় এসএফআই, পোড়ানো হয় মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুপুতল। কলেজ স্ট্রিট থেকে মিছিলেও শামিল হন ছাত্র-যুব কর্মীরা, বিক্ষোভ সভায় বক্তব্য রাখেন ছাত্র নেতা সৃজন ভট্টাচার্য, অর্জুন রায়, যুব নেতা কলতান দাশগুপ্ত সহ অন্যান্য নেতৃত্ব।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement