ভার্মাকে ফের
সরিয়ে দিলেন মোদী

সিবিআই অধিকর্তা পদে পুনর্বহালের ৪৮ঘণ্টা পরেই অপসারণ

ভার্মাকে ফের <br> সরিয়ে দিলেন মোদী
+

 গণশক্তির প্রতিবেদন: নয়াদিল্লি, ১০ জানুয়ারি- পদে ফিরে আসার ৪৮ঘণ্টা পরেই ফের অপসারিত হলেন সিবি‌আই অধিকর্তা অলোক ভার্মা। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের কমিটির দীর্ঘ বৈঠক থেকে তাঁকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতে। আপত্তি জানিয়েছেন বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খারগে। কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশন ভার্মার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে বলে জানানো হলেও বৈঠকে সেই অভিযোগের বিশদ পেশ করা হয়নি বলেই খবর। তার বদলে একটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে  কয়েকটি অভিযোগের সত্যতা মিলেছে  বলে মন্তব্য করা হয়েছে। ভার্মাকে এদিনই দমকল, সিভিল ডিফেন্স, হোমগার্ডের ডিরেক্টর জেনারেল পদে নিয়োগ করা হয়েছে। অতিরিক্ত অধিকর্তা এম নাগেশ্বর রাওকেই সিবিআই প্রধান করা হয়েছে। অক্টোবরে মধ্যরাতের রদবদলে তাঁকেই এই পদে  অস্থায়ীভাবে  বসানো হয়েছিল। অলোক ভার্মার মেয়াদ ছিল ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

অলোক ভার্মাকে সিবি‌আই প্রধানের পদ থেকে সরানো হয়েছিল ২৩শে অক্টোবর। মাঝরাতে সেই রদবদলে আইন বাঁচাতে কেন্দ্র অপসারণের বদলে  বাধ্যতামূলক ছুটি  বলে দেখিয়েছিল। তাঁর বদলে নাগেশ্বর রাওকে অধিকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অলোক ভার্মা সুপ্রিম কোর্টে এই আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করেছিলেন। সেই মামলায় ৪৮ঘণ্টা আগেই শীর্ষ আদালত রায় দেয়, ভার্মাকে যে পদ্ধতিতে সরানো হয়েছে তা আইনসঙ্গত নয়। তাঁকে ওই পদে পুনর্বহাল করে আদালত। তবে শীর্ষ আদালত কোনও বড় কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে ভার্মাকে বারণ করে। সিবিআই প্রধান স্থির করে প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে তৈরি কমিটি। ভার্মাকে অপসারণের সময়ে এই কমিটি বৈঠকই করেনি। সুপ্রিম কোর্ট এক সপ্তাহের মধ্যে এই কমিটিকে বৈঠক করতে বলে। সেই কমিটিরই বৈঠক হয় বুধবার, কিন্তু তা অসমাপ্ত ছিল। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ফের সওয়া দু ঘণ্টার বৈঠক হয়। প্রধান বিচারপতি নিজে যেহেতু ভার্মাকে পুনর্বহালের রায় দিয়েছিলেন তিনি নিজে এই বৈঠকে থাকেননি। তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে ছিলেন বিচারপতি এ কে সিকরি।

বৈঠকের সরকারি ভাষ্য পাওয়া না গেলেও জানা গেছে ভার্মার বিরুদ্ধে সিভিসি-র অভিযোগের কথা উত্থাপিত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে  দুর্নীতি  ও  কর্তব্যে অবহেলার  অভিযোগ পেশ করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন অফিসারকে পদে রেখে দেওয়া, মাংস ব্যবসায়ী মঈন কুরেশির বিরুদ্ধে মামলায় তদন্তে গাফিলতি, আইআরসিটিসি মামলায় শিথিলতা। এইসব প্রশ্ন নিয়েই সিবিআই র অভ্যন্তরে বিবাদ চলছিল। কিন্তু বৈঠকে এইসব অভিযোগের কোনও বিশদ ব্যাখ্যা ও তথ্য হাজির করা হয়নি বলে জানা গেছে। খারগে জানতে চান, অভিযোগের বিশদ কোথায়। তিনি ভার্মাকে ডেকে তাঁর উত্তর শোনার দাবিও করেন। বস্তুত, খারগে ভার্মার মেয়াদ ৭৭দিন বাড়িয়ে দেবার দাবি জানান— যে সময়পর্বে তিনি অপসারিত হয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতি সিকরির সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ভার্মাকে সরিয়ে দেবারই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। তাঁর বদলে নাগেশ্বর রাওকেই অধিকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সিবিআই-র ইতিহাসে নজিরবিহীন হলেও এমন সিদ্ধান্ত যে হতে পারে তা আন্দাজ করাই হচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকেই সমালোচনা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ১৯৯৭-এ বিনীত নারায়ণ মামলার সূত্রে শীর্ষ আদালতই এই তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আদালত বলেছিল, সেই মর্মবস্তুকে লঘু করা যায় না। ভার্মাকে  বদলির  যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, আদালত তা গ্রহণ করেনি। বরং এই  বদলি  সিবিআই অধিকর্তার কাজের ক্ষমতাই কেড়ে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে। রাজনৈতিক চাপ থেকে সিবিআই কে মুক্ত করার জন্যই শীর্ষ আদালত পূর্বে অবস্থান নিয়েছে, এ কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বেঞ্চ ইঙ্গিত দিয়েছিল ভার্মার ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এই অবস্থায় ভার্মার পুনর্বহাল প্রধানমন্ত্রী নীরবে মেনে নেবেন না বলে গুঞ্জন ছিলই।

ভার্মার অপসারণের পিছনে প্রধানমন্ত্রীকেই অভিযুক্ত করে কংগ্রেস বলেছে, প্রধানমন্ত্রী ভয় পাচ্ছেন রাফালে কেলেঙ্কারির তদন্তে। ভার্মাকে কোনও সুযোগ দেবেন না বলেই এত দ্রুত অপসারণ করেছেন তিনি। এমনকি তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

সিবিআই র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভার্মার বিরুদ্ধে আগস্ট মাসে সিভিসি র কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন বিশেষ অধিকর্তা রাকেশ আস্থানা। সিভিসি তদন্ত করছে। সেই তদন্তে নজরদারির জন্য শীর্ষ আদালত প্রাক্তন বিচারপতিকে দায়িত্বও দিয়েছিল। এখনও সেই মামলা চলছে। শীর্ষ আদালত সোমবার জানিয়েছিল, সেই মামলার চূড়ান্ত ফলের ওপরে ভবিষ্যতের পদক্ষেপ স্থির হবে। অবশ্য তার আগেই ভার্মার দ্বিতীয় অপসারণ হয়ে গেল।

সিভিসি-র কাছে রাকেশ আস্থানা অভিযোগ করেছিলেন, মাংস ব্যবসায়ী মঈন কুরেশির বিরুদ্ধে তদন্তে ব্যবসায়ী সতীশ সানার কাছ থেকে উৎকোচ নিয়েছেন ভার্মা। তাছাড়াও লালুপ্রসাদ যাদবের বিরুদ্ধে একটি কেলেঙ্কারির তদন্ত শ্লথ করছেন ভার্মা। অন্যদিকে, সি বি আই-র অধিকর্তা হিসাবে কর্মরত অবস্থায় ভার্মা আস্থানার বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ এনেছিলেন। সতীশ সানার অভিযোগের ভিত্তিতেই আস্থানার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। তাঁর অভিযোগ, আস্থানা এবং আরেক আধিকারিক দেবেন্দর কুমার ৫কোটি টাকা ঘুষের জন্য তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন। ২কোটি টাকা এরমধ্যে দিয়ে তদন্ত থেকে রেহাই পেয়েছেন। সানার এই অভিযোগকে হাতিয়ার করে বিশেষ অধিকর্তা আস্থানার বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করেন সি বি আই প্রধান অলোক ভার্মা। তারপরেই হস্তক্ষেপ হয় কেন্দ্রের তরফে। ভার্মা এবং আস্থানা উভয়কেই ছুটিতে পাঠায় কেন্দ্র।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement