বুলন্দশহরে হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে
তদন্ত দাবি সিপিআই(এম) র

বুলন্দশহরে হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে <br> তদন্ত দাবি সিপিআই(এম) র
+

 গণশক্তির প্রতিবেদন: নয়াদিল্লি, ১১ জানুয়ারি- উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরে পুলিশ ইন্সপেক্টর হত্যার ঘটনার হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে কর্মরত বিচারপতিকে দিয়ে তদন্তের দাবি জানালো সিপিআই(এম)। নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে এই ঘটনার। উল্লেখ্য, ৩ ডিসেম্বর বুলন্দশহরের স্যানায় পুলিশ অফিসার সুবোধকুমার সিংকে নৃশংস হত্যা করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় এক স্থানীয় যুবকেরও। গোটা ঘটনায় উঠে আসে বজরঙ দল, বিজেপি র যুব সংগঠনের নেতাদের নাম। প্রথম থেকেই এদের বিরুদ্ধেই সমস্ত তথ্য প্রমাণ সামনে আসলেও আচমকাই এই পরিস্থিতি বদলে সমগ্র বিষয়টি গোহত্যার পরিণতিতে বলেই প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজ্যের বিজেপি সরকারের তৈরি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্টির পলিট ব্যুরোর দুই সদস্য বৃন্দা কারাত, সুভাষিণী আলি, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুরিন্দর সিং, জেলা কমিটির সদস্য জগবীর ভাট্টি ৫ জানুয়ারি বুলন্দশহরে যান। সিপিআই(এম) র এই প্রতিনিধি দল স্যানা ব্লকের নয়া বাস, চিন্দ্রাওতি এবং মাহবা গ্রামে যান। সেখানে বিভিন্ন অংশের মানুষের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেন। যাঁদের গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগে আটক করা হয়েছে সেই সব পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। মাহবা গ্রামে যেখানে গোরুর দেহাংশ উদ্ধার হয় সেখানের প্রাক্তন গ্রামপ্রধানের সঙ্গেও কথা বলেছেন প্রতিনিধিরা। চিন্দ্রাওতি গ্রামের প্রধানের সঙ্গে দেখা করেন। নিহত সুমিতের পরিবারের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন তাঁরা। মহকুমা শাসক রাজকুমার ভাস্করের মতামত নেওয়ারও চেষ্টা করেন।

সমস্ত অংশের সঙ্গে কথা বলার পরে সিপিআই (এম) প্রতিনিধিরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- ১) ডিসেম্বরের ৩ তারিখ যে ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে তাকে  গোহত্যা র অভিমুখে নেওয়ার জন্যেই রাজ্য সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সুচিন্তিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট ও গঠন করা হয়েছে সেই দিকেই নিয়ে যাওয়ার জন্য। ২) রাজ্য সরকারের চাপের মুখে কাজ করা সিট কোনও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রথম দফায় পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছিল তারা সকলেই প্রধান ষড়যন্ত্রকারী বলে যোগেশ রাজকেই চিহ্নিত করেছিল, তাদের নির্দোষ বলে দুই সপ্তাহের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয় দফায় গোহত্যাকারী বলে গ্রেপ্তার করতে শুরু করেছে অন্যদের। এইভাবে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন ব্রাহ্মণ সমাজের সভাপতি ক্ষেমচাঁদ শর্মার ছেলে অরবিন্দ শর্মা। অরবিন্দের একটাই অপরাধ তাঁর বন্ধু একজন মুসলিম- মেহবুব। এলাকার একজন পরিচিত সমাজকর্মী। সিপিআই (এম) প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, এলাকার যাঁদের সঙ্গেই কথা বলা হয়েছে তাঁরাই এই গ্রেপ্তারি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনার পরে বলাই যায় উত্তর প্রদেশের যোগী সরকারের সময়ে শুধু দুই ধর্মের মধ্যে বিয়েকে  লাভ জিহাদ  এর নামে অপরাধ বলে গণ্য করা হচ্ছে তা নয়, দুই ধর্মের মধ্যে বন্ধুত্ব হলেও এখন অপরাধ। তারই পরিণতি এখন ভুগতে হচ্ছে অরবিন্দ এবং মেহবুবকে। ৩) সিট এখন নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে বলছে, গোরুগুলিকে প্রথমে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তারপর কাটা হয়েছে। এই অজুহাত খাড়া করে মেহবুবের মতো মুসলিম যাদের লাইসেন্স বন্দুক আছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাইফেল শ্যুটিংয়ের জাতীয় পর্যায়ের দলের খেলোয়াড় নাদিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার পুরানো জিপসি ভ্যান যা ব্যবহার করা হয় না কয়েক মাস, সেটাকে গোরুর মাংস সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সিট দাবি করছে। ৪) এই তথাকথিত গোহত্যার বিষয়টিই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। সম্ভবত ২ ডিসেম্বর রাতেই জমিতে গোরুর মাংস নিয়ে আসা হয়েছিল। যাতে সকলে সকলের নজরে আসে তেমনভাবেই সেগুলি ফেলে রেখেছিল যারা দাঙ্গা বাধাতে চাইছিল। সিপিআই (এম) প্রতিনিধি দল প্রশ্ন তুলেছে যে গোরুগুলিকে হত্যা করা হয়েছিল সেগুলি কাদের? গ্রামের গোরু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন কোনও অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয়েছিল কি? ৫) এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, মুসলিমদের গ্রামের জমিতে ঢুকে গোরু হত্যা করার ঘটনা কার্যত অসম্ভব। কারণ, মাহবা গ্রামের যে জমিতে গোমাংস পাওয়া যায় বলে অভিযোগ সেখানে সব পরিবারই হিন্দু। দাবিদারহীন চরে বেড়ানো গোরুর সমস্যা উত্তর প্রদেশের কৃষকদের এত গভীর সমস্যা তৈরি করেছে যে তাঁরা রাতজেগে জমি পাহারা দিচ্ছেন। এই অবস্থায় বাইরে থেকে লোক এসে জমিতে ঢুকে গোরু হত্যা করছে তাদের মাংস কেটে নিয়ে যাচ্ছে এটা কার্যত অসম্ভব। মাহবা গ্রামের প্রধান প্রেমজিৎ সিপিআই (এম) প্রতিনিধি দলকে ডেকে নিয়ে যান সেই জমিতে। যেখানে ভাড়া করে আনা খেতমজুররা কাজ করছেন। তারা সেই দিনও কাজ করছিলেন। এরাই প্রথম গোরুর অবশেষ দেখেছিলেন। যদি সেখানে গোরুকে গুলি করা হতো তাহলে এই খেতমজুররা শব্দ শুনতেন বা মাংস কাটা হলেও দেখতেন। ৬) বুলন্দশহরে মুসলিমদের ইজতেমা উৎসবকে ঘিরে যে বিপুল সংখ্যালঘু মানুষের ভিড় হয়েছিল তাকে ঘিরেই দাঙ্গা বাধানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে স্যানা এবং নয়া বাস এলাকায় ঘুরে কথা বলে ধারণা হয়েছে প্রতিনিধি দলের। ৭) মহকুমা শাসক রাজকুমার ভাস্করও প্রথমে (৪ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত) এই ষড়যন্ত্রের কথাই বলেছিলেন। এখন প্রতিনিধি দল এই বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি জানান, শুধু এসআইটি র সামনেই যা বলার বলবেন। ৮) এই সমস্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিনিধি দল মনে করেছে সময়ভিত্তিক ও নিরপেক্ষ করতে হলে একমাত্র হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে কর্মরত বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত করানো জরুরি। ৯) সঙ্ঘ পরিবারের এই ষড়যন্ত্রের জেরে কৃষকরা গভীর সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। ওই এলাকার সমর্থ পুরুষরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন গ্রেপ্তারি এবং পুলিশি হেনস্তার ভয়ে। ভাড়া করে আনা খেতমজুরদের ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে। ডেয়ারি ব্যবসাও ভয়ঙ্কর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এলাকার প্রবীণ মানুষ শরিফ খান জানিয়েছেন, তাঁর ভাইপোকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও পড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন, মুসলিমরা দুধের ব্যবসা করতে আতঙ্কিত। তিনি নিজে ৩৪হাজার টাকা দিয়ে একটি গোরু কিনেছিলেন। এখন গোরুর নামে আক্রমণের আশঙ্কায় একজন ব্রাহ্মণ বিধবাকে সেটি দিয়ে দিয়েছেন। ১০) নিহত যুবক সুমিতের পরিবার জানিয়েছে, সে নয়ডার কলেজে পড়ত। শরীর খারাপ হওয়ার বাড়িতে এসেছিল। যখন উন্মত্তবাহিনী এই হামলা চালাতে যায়, সেও তার মধ্যে ভিড়ে যায়। পরে সঙ্ঘ বাহিনীর দুষ্কৃতীদের গুলিতেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে কিভাবে সঙ্ঘ পরিবার তরুণদের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ১১) ঘটনার মূল অভিযুক্ত বজরঙ দল নেতা যোগেশ রাজকে ধরতে পুলিশের কয়েক সপ্তাহ লেগে গেছে। অন্যদিকে যারা সরাসরি এই হিংসার ঘটনায় অভিযুক্ত তাদের ধরা হচ্ছে না। যেমন, উপেন্দ্র যাদব বা গুরুজিকে এখনও ধরতে পারেনি পুলিশ। উলটোদিকে ৮০বছরের বৃদ্ধ চন্দ্রপাল সিং এবং কৃষক রাজ সিংদের মতো নিরীহ লোকদের গ্রেপ্তার করছে। এই সব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে মূল অভিযুক্ত যারা সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত তাদের আড়াল করতে, রক্ষা করতেই সিট ব্যস্ত।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি দল বলেছে, সঙ্কীর্ণ মতলব থেকেই উত্তর প্রদেশ সরকার তদন্তকে প্রভাবিত করতে চাইছে। যে দুষ্কৃতীরা পুলিশ অফিসারের ঘটনায় যুক্ত তাদের রক্ষা করে সাধারণ মানুষকে গোহত্যার নামে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াতেই পরিকল্পিতভাবে যে এই ঘটনা ঘটানো হয় তার তদন্ত করার কোনও ইচ্ছাই নেই সরকারের।

এদিকে সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এদিন বিজেপি র যুবনেতা শিখর আগরওয়াল ওরফে শেখর (২৫)-কে হাপুর জেলার বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বুলন্দশহরে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ আছে। যদিও বিজেপি র যুবনেতাকে ধরতে চল্লিশ দিন লেগে গেল পুলিশের। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে তোলার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আদালত ধৃত বিজেপি যুবনেতাকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেপাজতে পাঠিয়েছে। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement