পি এস সি নয়, নিয়োগ পরীক্ষায়
যোগ্যতা বেঁধে দেবে নবান্নই

পি এস সি নয়, নিয়োগ পরীক্ষায়<br> যোগ্যতা বেঁধে দেবে নবান্নই
+

গণশক্তির প্রতিবেদন: কলকাতা, ১১ই জানুয়ারি— সংস্থার নিরপেক্ষ থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে মমতা সরকার। এবার চাকরির পরীক্ষায় নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে পি এস সি-র অন্দরে।
পরীক্ষা কেন্দ্র বাছাই থেকে ফল প্রকাশ সবকিছুই নিজেদের জিম্মায় রেখে এতদিন কাজ চালাতো পি এস সি। এখন থেকে অর্থদপ্তরের অধীনে চলে যাওয়ার পর সেই অধিকার যে থাকছে না তা সরকারি সিদ্ধান্তেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। 
সংবিধানের ৩২০ধারাতে উল্লেখ করা আছে রাজ্য পি এস সি-র ভূমিকা। প্রথমেই কোনো নিয়োগের পরীক্ষার জন্য পরীক্ষার্থীদের যোগ্যতা মান কী হবে তা ঠিক করার অধিকার পি এস সি-র। যেমন, ক্লার্কশিপ পরীক্ষায় যোগ্যতা মান ছিলো মাধ্যমিক পাশ। আবার স্নাতক উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েরাই বসতে পারে ডব্লিউ বি সি এস পরীক্ষায়। যাবতীয় পরীক্ষার যোগ্যতা মান ঠিক করার ক্ষমতা কেবলমাত্র পি এস সি-র। সাংবিধানিক এই অধিকার কি এবার লঙ্ঘিত হতে বসেছে! এতদিন নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পর মমতা ব্যানার্জি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাবলিক সার্ভিস কমিশন এখন রাজ্য সরকারের অর্থদপ্তর অধীন একটি সংস্থা। আর আশঙ্কা সেখানেই। ‘‘পি এস সি নয়। এবার থেকে অর্থদপ্তরের ঠিক করে দেওয়া যোগ্যতা মানে হয়তো নিতে হবে পরীক্ষা। রাজ্যের যা পরিস্থিতি তাতে যোগ্যতা মান পর্ব থেকেই নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হলো বলে।’’ আশঙ্কা নিয়ে বলছিলেন পি এস সি-র এক কর্তা।
মমতা ব্যানার্জির সরকার সংশোধনী এনে পি এস সি-কে রাজ্য সরকারের অর্থদপ্তর অধীন এক সংস্থায় নিয়ে এসেছে। এতদিন পি এস সি সরকারের অধীনে থাকলেই তা কোনো দপ্তর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো না। রাজ্যের পি এস সি-র মতো কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগ সংস্থা ইউ পি এস সি-ও কোনো মন্ত্রক দ্বারা পরিচালিত হয় না। সংবিধান স্বীকৃত স্বশাসিত সংস্থা হিসাবে পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে এতদিন এরাজ্যেও পি এস সি কাজ করে এসেছে। 
পরীক্ষার যোগত্যামানের সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্র বাছাই এমনকি ফল প্রকাশেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা এখন চলে যাচ্ছে অর্থদপ্তরের হাতে। তাতে সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত হতে চলছে নিয়োগের স্বচ্ছতা। 
এতদিন সরকারি চাকরিতে নিয়োগের কাজে পি এস সি-র স্বচ্ছতা নিয়ে কোথাও কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সংশয়াতীতভাবে সততা রক্ষিত হয়েছে সংবিধান স্বীকৃত এই সংস্থায়। পরীক্ষাকেন্দ্র বাছাই থেকে প্রশ্নপত্র তৈরি, প্রশ্নপত্রের ছাপাই থেকে পরীক্ষার কাট অব মার্কস সবকিছুই এতদিন পি এস সি-তে শৃঙ্খলা মেনে। শুধুমাত্র নিয়োগের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে পি  এস সি-র পরীক্ষা নেওয়ার দক্ষতাও ছিলো প্রশ্নাতীত। বামফ্রন্ট সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো রাজ্যের সরকারি চাকরির সব নিয়োগ হবে পি এস সি থেকেই। রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম পি এস সি গ্রুপ ডি পদে নিয়োগের পরীক্ষা নেয়। ২০০৯সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি দপ্তর ও হাসপাতালে ৪হাজার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির পরীক্ষায় বসার আবেদন করেন প্রায় ১৪লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী। ২০১০সালের ২৩থেকে ২৫শে এপ্রিল প্রতিদিন চারটি শিফটে নেওয়া হয়েছিলো নিয়োগের পরীক্ষা। ২০১১সালের ২০শে মে মাসে সফল ৩৭৫জনের প্রথম নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করে পি এস সি। সেই তালিকায় নাম থাকা অধিকাংশই নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে যান। এরপর ২০১১সালের ১৫ই জুন ২হাজার ৮১৭জন সফল পরীক্ষার্থীর দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশ করে পি এস সি তাদের রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরে নিয়োগের সুপারিশ করে পাঠিয়ে দেয়। ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জি স্বাস্থ্যদপ্তরে পি এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের চাকরি দিতে অস্বীকার করে। সফল পরীক্ষার্থীরা আদালতে মামলা করে প্রায় দেড় বছর বাদে চাকরি ছিনিয়ে নেয়। 
কিন্তু ফল প্রকাশই যদি সরকার করতে না চায়! পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করার দায়িত্ব থাকে পি এস সি-র। কিন্তু এখন অর্থদপ্তরের হাতে চলে যাওয়ায় সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় এখন ফল প্রকাশ করবো না, তাতে কোনোও কিছু করার থাকবে না। ঠিক যেমন টেট পরীক্ষার পর মামলার অজুহাত দেখিয়ে দীর্ঘদিন ফল প্রকাশ আটকে রেখেছিলো রাজ্য সরকার। ফলে এখন সরকারি সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে পরীক্ষার্থীদের। 
আবার ফল প্রকাশের পর কোনো দপ্তর যদি তার নির্ধারিত সংখ্যার সফল পরীক্ষার্থীদের নিয়োগ না করে তাহলেও সেই দপ্তরকে কেন এখনই নিয়োগ করা গেল না তা বিধানসভাকে জানাতে হবে। বিধানসভার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের জানিয়ে তা পি এস সি-কেও জানাতে হবে। পি এস সি-র বার্ষিক প্রতিবেদনে পরীক্ষা থেকে নিয়োগ নিয়ে যা ঘটেছে তার পুঙ্খানুপঙ্খ ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে হবে। সাংবিধানিক এই দায়িত্ব এখন থাকবে না। প্রশাসনিক একটা নির্দেশেই সব ঘটনা শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। 
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দখল নেওয়ার পর তার কর্মীদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে রেগুলেশনে সংশোধনী এনেছে সরকার। এতদিন পি এস সি-র কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতো খোদ কমিশনই। পছন্দ না হলে কর্মচারীকে এক ফ্লোর থেকে সর্বোচ্চ অন্য ফ্লোরে বদলি করতে পারতো কমিশন। এখন কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করবে নবান্ন। ফলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে কাট অব মার্কস নবান্নের পছন্দমতো করার জন্য প্রথমে বাধ্য করা হবে কর্মীদের। রাজি হলে ভালো। না হলে দুর্গম এলাকায় বদলির হুমকি। গত পাঁচ বছরে হয়রানি ও প্রতিহিংসার এই বদলির মুখে পড়তে হয়েছে অনেক কর্মী থেকে আধিকারিককেই। এবার পি এস সি দেখবে সরকারের সেই প্রতিহিংসার রাজনীতি।