প্রভাবশালী পিতা-পুত্রই
এখন সি বি আই-র নজরে

প্রভাবশালী পিতা-পুত্রই<br>এখন সি বি আই-র নজরে
+

গণশক্তির প্রতিবেদন: ভুবনেশ্বর : ১১ই জানুয়ারি— বাবা দলের অন্যতম প্রভাবশালী সাংসদ। ছেলে নিজেও ‘প্রভাবশালী’।
রোজভ্যালি তদন্তের আওতায় এবার তাঁর ছায়াও ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। এরাজ্যের বুকে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পিছনে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’র তদন্তের আওতায় বারেবারেই চলে আসছেন পিতা-পুত্র দুজনেই। সারদা ও রোজভ্যালি— দুটি বড় চিট ফান্ড সংস্থার প্রতারণার তদন্তে অভিন্ন যে নাম ও সূত্র এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি বি আই’র হাতে এসেছে তাতে অন্যতম হয়ে উঠছে এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুজনেই জনপ্রতিনিধি।
ভুবনেশ্বরের আপাতত সি বি আই হেপাজতে রয়েছেন ধৃত তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনও পর্যন্ত টানা নয় দিন তাঁকে জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। বৃহস্পতিবার ফের ভুবনেশ্বরে সি বি আই’র বিশেষ আদালতে তোলা হবে তাঁকে। সি বি আই’র একটি সূত্র বলছে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জেরা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ‘লিড’ দিয়েছে। যা তদন্তের পরবর্তী ধাপে সাহায্য করবে সি বি আই’কে। একই সঙ্গে রোজভ্যালিকাণ্ডে টাকা পাচারের তদন্তে ক্রমেই সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা স্পষ্ট হচ্ছে বলেই দাবি সি বি আই’র তদন্তকারী আধিকারিকদের। 
এমনকি রোজভ্যালিকাণ্ডে গৌতম কুণ্ডুর সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠতার পর্বেও বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই সময় অর্থাৎ দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারে তখন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থমন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে। সেবি, আর বি আই ততদিনে রোজভ্যালির পনজি স্কিম নিয়ে নজরদারি চালাচ্ছে। বাজার থেকে অবৈধভাবে টাকা তুলছে এই ধরনের চিট ফান্ড সংস্থা, রিপোর্ট দিয়েছে সেবি। তারপরে ২০১২ সালেও ফের রোজভ্যালির চেইন মার্কেটিং সিস্টেম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে রিপোর্ট দিয়েছে আই আর ডি এ (ইনসুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি)। সেই রিপোর্ট জমা পড়েছে অর্থমন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটিতেও। তা যায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেও। ভুবনেশ্বরে সি বি আই’র এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, ‘নজরদারির শীর্ষ মহল থেকেও যদি পনজি স্কিমের কারবারে সাহায্য করেন, সেখান থেকে বিপুল টাকা নিয়ে থাকেন তাহলে কীভাবে দাবি করা যায় না জেনেই তিনি এসব করেছে। এই সাংসদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে, সময় মতো তা আদালতে পেশ করবো আমরা’। শুধু তাই নয়, আই আর ডি এ যখন রিপোর্ট পেশ করেছে ২০১২ সালের ৯ই মার্চ। রাজ্য সরকারের কাছেও জমা পড়ে সেই রিপোর্ট। আর তার পরেও দেখা যায় রোজভ্যালি কর্তার সঙ্গে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ মাথা থেকে একাধিক শীর্ষ নেতা, সাংসদ নিয়ম করে যোগাযোগ রেখেছেন, ব্যবসায় সাহায্য করেছেন। বিনিময়ে বিপুল আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এই সময়কালেই সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকি তাঁর বাড়িতেও নিয়ম করে গৌতম কুণ্ডুর সঙ্গে আড্ডার আসরে বসতেন।
রোজভ্যালিকাণ্ডে এই তদন্তের সূত্র ধরেই সামনে চলেছে এসেছে প্রভাবশালী সেই পিতা-পুত্রের প্রসঙ্গ। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রে জানা গেছে, শাসক তৃণমূলের এই দাপুটে নেতার পুত্রের সঙ্গে রোজভ্যালি কর্ণধারের যোগাযোগের সূত্র ছিলেন আরেক দাপুটে তৃণমূল নেতা। তার মারফতই গৌতম কুণ্ডুর সঙ্গে ওই তরুণ বিধায়কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। রোজভ্যালির জন্য উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়ায় বেশ কিছু প্রকল্পের জমি বন্দোবস্ত করতে উদ্যোগও নিয়েছিল সেই তরুণ বিধায়ক। রোজভ্যালির একাধিক প্রকল্পে জমির ব্যবস্থা করতে কার্যত দালালির ভূমিকা পালন করেছিল ওই বিধায়কের ঘনিষ্ঠ একটি সংস্থার। তার বিনিময়ে মিলেছিল বিপুল আর্থিক সুবিধাও। সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ঘুরপথে সেখানে চলে গিয়েছিল বলেও মনে করছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার আধিকারিকরা। রোজভ্যালির পাশাপাশি সারদাকাণ্ডেও এই তরুণ বিধায়কের নাম একাধিকবার তদন্তের স্বাভাবিক গতিতেই সামনে এসেছে। আর তাঁর প্রভাবশালী পিতার নাম ইতোমধ্যে সারদা থেকে রোজভ্যালি সহ আরও একটি চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণভাবেই সামনে এসেছে। যদিও ইতোমধ্যে সারদা’র কবল থেকে নিজেকে একবার রক্ষাও করে ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন একসময় তৃণমূলের অন্যতম ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হয়ে ওঠা এই প্রভাবশালী সাংসদ।
সি বি আই তদন্তে মমতা ব্যানার্জির ‘উদ্বেগ’ ফের স্পষ্ট হয়েছে বুধবার বিকালে,কলকাতার সভা থেকে।
কলকাতা থেকে ৪৪০ কিলোমিটার দূরে ভুবনেশ্বরে সি বি আই দপ্তরে বুধবারও দু’দফায় ধৃত তৃণমূল সাংসদের জেরা থেকে মেলা তথ্য বলছে, তৃণমূল নেত্রীর দুশ্চিন্ত বাড়ার বাস্তবতা রয়েছে। সেই বাস্তবতা আরও প্রকট হয়েছে রোজভ্যালি তদন্তের মাঝেই ফের নতুন করে সারদা তদন্তের খাতা খোলায়। দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে প্রায় শীতঘুমে চলে গিয়েছিল সারদাকাণ্ডে সি বি আই’র তদন্ত। উঠেছিল রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ।
তার মাঝেই মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় বারো ঘণ্টা সি জি ও কমপ্লেক্সে কুণাল ঘোষের জেরা সারদা তদন্তকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দীর্ঘক্ষণ কুণাল ঘোষকে জেরা করে এমন কিছু তথ্য নতুন করে সি বি আই’র হাতে এসেছে যাতে করে সারদা তদন্তকে আরও একটি ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পেরে। কুণাল ঘোষ জেল হেপাজতে থাকাকালীনই সি বি আই’কে ৯২পাতার একটি চিঠি লেখেন। তাতে সারদাকাণ্ডের একাধিক বিবরণ রয়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসক তৃণমূলের একাধিক নেতা, নেত্রীর প্রসঙ্গ, সারদার কারবারকে মদত জোগানোর তথ্য রয়েছে সেই ৯২পাতার চিঠির ছত্রে ছত্রে। যদিও সি বি আই’র একটি সূত্রে জানা গেছে, ওই ৯২পাতার চিঠির বাইরেও নতুন করে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে আরও বেশ কিছু তথ্য জুগিয়েছেন কুণাল ঘোষ।
ফলে মঙ্গলবার দীর্ঘ বারো ঘণ্টা ধরে কুণাল ঘোষের জিজ্ঞাসাবাদ নিঃসন্দেহে নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন সারদাকাণ্ডের তদন্তকে। একই সঙ্গে আরেক কেন্দ্রীয় তদন্তাকারী সংস্থা ই ডি’ও দীর্ঘ শিথিলতা ঝেড়ে রোজভ্যালি তদন্তে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রোজভ্যালিকাণ্ডে প্রথম চার্জশিট জমা দেয় ই ডি। রোজভ্যালি কর্তা প্রতারক গৌতম কুণ্ডুকেও গ্রেপ্তার করে ই ডি। যদিও পরবর্তী সময়ে রোজভ্যালির মানি লন্ডারিং তদন্তে আশ্চর্যজনকভাবে থমকে যায় ই ডি। এবার সি বি আই সক্রিয় হতেই রোজভ্যালিকাণ্ডে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল কর্তৃপক্ষকেও ডেকে পাঠিয়েছে ই ডি। বিদেশে একটি অনুষ্ঠানও তাঁদের নজরে। সেখান থেকেই টাকা পাচারের নির্দিষ্ট সূত্র পেয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডাইরক্টরেট।
এদিকে রোজভ্যালিকাণ্ডে ফের সামনে চলে এসেছে রোজভ্যালি গ্রুপেরই একটি স্বর্ণ বিপণি সংস্থা। এই সংস্থাই রোজভ্যালিকাণ্ডে মানি লন্ডারিংয়ের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বলে মনে করছে সি বি আই’র তদন্তকারী আধিকারিকরা। সুকৌশলে জেল হেপাজতে থাকাকালীনই গৌতম কুণ্ডু তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা রুজু করেন। কেন? তা জানতেই গিয়েই সি বি আই দেখে ওই স্বর্ণ বিপণি সংস্থার মালিক এখন গৌতম কুণ্ডুর স্ত্রী। ফলে ওই সংস্থার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই তা প্রমাণ করতেই এই চেষ্টা। একই সঙ্গে আয়কর দপ্তরের থেকে সি বি আই জানতে পেরেছে গত ৮ই নভেম্বর রাতে নোট বাতিলের ঘোষণার পরে রোজভ্যালি ওই স্বর্ণ বিপণি সংস্থা থেকেও বিপুল পরিমাণ সোনা বিক্রি হয়। এবং তা একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নগদে বাতিল সেই হাজার ও ৫০০ টাকায় তা কেনেন। কারা কিনেছিল তাও এবার খতিয়ে দেখতে চাইছে সি বি আই।