নাম শুনলেই ফুঁসছে
সেই ভাবাদিঘি

মুকুলের কথাতেই দিঘি বোজানো শুরু

নাম শুনলেই ফুঁসছে<br> সেই ভাবাদিঘি
+

অর্ক রাজপণ্ডিত: গোঘাট, ১৯শে মার্চ- ‘মুকুল রায় আমাদের সমস্যার সমাধান করবে? মুকুল রায় নিজেই ফেঁসে আছে নারদ মামলায়, ও আগে নিজে বাঁচুক। মুকুল রায় কেন, তৃণমূলের কোন নেতাকেই আমরা বিশ্বাস করি না। সবাই আমাদের সাথে বেইমানি করেছে’। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে চলেছেন ভাবাদিঘির বাসন্তী পোড়েল। ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন তৃণমূলের নেতাদের ওপর। শুক্র, শনি দু’দিন ধরেই ভাবাদিঘি জুড়ে প্রচার চলেছিল রবিবার মুকুল রায় এসে নাকি গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলবেন। অবশ্য মুকুল রায় এলেও তাঁর সঙ্গে কোন কথাই বলতেন না গ্রামের মানুষ।
হঠাৎ তৃণমূলের ডাকসাইটে নেতা, মুখ্যমন্ত্রীর বিশ্বস্ত সেনাপতির ওপর এমন রাগ কেন ভাবাদিঘির মা বোনেদের?
কারণ মুকুল রায়ের নির্দেশেই দিঘি বুজিয়ে রেললাইন পাতার কাজে আগ্রাসীভাবে এগিয়েছিল তৃণমূল। দিঘি রক্ষার জন্য কয়েক বছর ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছে ভাবাদিঘি। তাঁদের অভিযোগ, তাঁদেরই গ্রামের বাসিন্দা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান শ্রীকান্ত ধাড়া, গ্রাম তৃণমূলের সভাপতি হারাধন ধাড়া, তৃণমূল নেতা শ্যামল মালিক রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বুজিয়ে দিতে চেয়েছে দিঘি। ২০১১ সাল থেকেই তাঁরা বারবার প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে এসেছেন দিঘির পরিবর্তে, উত্তরের জমিতে পাতা হোক রেল। তাঁরা বার বার প্রশাসনকে আবেদন জানিয়ে এসেছেন আলোচনার জন্য। অথচ তাঁদের কথায় কর্ণপাত করা হয়নি।
২০১৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর চুঁচুড়ায় প্রশাসনিক ভবনে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন মুকুল রায়। বৈঠকের পর মুকল রায় বলেন ‘গ্রামবাসীরা রেললাইনের পক্ষে, দিঘির মাঝখান দিয়েই পাতা হবে রেল লাইন’। সেদিনের বৈঠকে ছিলেন সাংসদ অপরূপা পোদ্দার, বিধায়ক মানস মজুমদার, গোঘাট ১নং ব্লকের তৃণমূল সভাপতি মনোরঞ্জন পাল, জেলাশাসক সঞ্জয় বনসল, পুলিশসুপার সুকেশ জৈন প্রমুখ। মুকুল রায়ের সঙ্গে সেদিনের বৈঠকে ভাবাদিঘির ‘গ্রামবাসী’ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের তিন নেতা শ্রীকান্ত ধাড়া, হারাধন ধাড়া, শ্যামল মালিক। যাদের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, যাদের জন্য ভাবাদিঘিতে অশান্তি, তাদের সাথে আলোচনা করেই মুকুল রায় জানান ‘সমস্যা মিটে গেছে’। তাই মুকুল রায়ের মতো বড় মাপের তৃণমূল নেতা ভাবাদিঘিতে এলেও তাঁদের সাথে কোন কথাই বলতে চান না গ্রামবাসীরা। তৃণমূল নেতাদের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন গ্রামের মানুষ। তাই ভাবাদিঘির ‘কন্ট্রোল ড্যামেজ’ কোন ডাকসাইটে নেতার সফর দিয়ে সম্ভব নয়। তাঁদের এখন বিশ্বাস শুধু দেশের আইন ব্যবস্থার ওপর। ২০১১ সাল থেকেই দিঘি রক্ষার জন্য হাইকোর্টে মামলা লড়ছেন ভাবাদিঘির মানুষ। তাঁদের কথায়, কলকাতা হাইকোর্ট যদি রায় দিয়ে জানায় দিঘি বুজিয়ে রেললাইন হবে, সেক্ষেত্রেই মেনে নেবেন তাঁরা। কোন তৃণমূল নেতার সঙ্গে সমঝোতা করে দিঘির অধিকার ছাড়বেন না তাঁরা। 
রবিবার দুপুরে মাঠ থেকে আলু তুলে ফিরছিলেন শঙ্কর মালিক। বছর সত্তরের শঙ্কর খেতমজুরের কাজ করেই সংসার চালান। নিজের জমি নেই। এখন চলছে মাঠের আলু প্যাকেটবন্দি করার কাজ। সেকাজ করতে মাঠেও যেতেও ভয় পাচ্ছেন তিনি। গ্রামের প্রতিটি বাসিন্দা জানে, গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বাইরে গেলেই ধেয়ে আসবে শাসকদলের দুষ্কৃতী বাহিনী। দিঘি তাঁদের জীবন কিভাবে বাঁচিয়ে রাখে সেই কথাই বলছিলেন শঙ্কর। শুধু দিঘির মাছ বা দিঘির জল সেচের কাজে লাগানো নয়, দিঘিতে ফোটা শালুক ফুলের ঘণ্ট, দিঘির গেঁড়ি গুগলির ঝোলও পেট ভরায় গরিব বাগদিপাড়ার। ‘দিঘি ছাড়া আমাদের বাঁচার রাস্তা নেই। বার বার আমরা দিঘি বাঁচাতে ছুটে গিয়েছি রেল থেকে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে। কেউ আমাদের কথা শোনেনি, সবাই গরিব বলে খেদিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলকে আমরা ভোট দিয়ে এনেছি, তৃণমূলের নেতারা বেইমানি করছে। আমাদের এখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। নয় মরতে হবে আর নয় লড়তে হবে। দিঘি বোজাতে এলে আমরা তাই লড়েই মরব’। এক নাগাড়ে বলেছেন শঙ্কর। বৃহস্পতিবারের পর থেকে মাটি ফেলার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, ভাবাদিঘি বিলক্ষণ জানে প্রতিরোধই ঠেকিয়েছে উচ্ছেদ। শুক্রবারও মার খেয়েছেন গ্রামের দু’জন। শনি, রবি গ্রামে অশান্তি নেই। কারণ দিঘির দিকে কেউ এগিয়ে আসেনি। আবার মাটি ফেলার কাজ শুরু হলেই জানকবুল প্রতিরোধ করবেন তাঁরা, বলেছেন গ্রামের মানুষ। 
বৃহস্পতিবারের পর চারটি দিন কেটে গেলেও এখনো ভাবাদিঘিতে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না তৃণমূলের মাতব্বররা। এলাকার তৃণমূল বিলক্ষণ জানে, গ্রামে ঢুকলেই প্রতিরোধের মধ্যে পড়তে হবে। তাই তৃণমূল অন্য কৌশল নিয়েছে দিঘি দখলের। গ্রামে ঢোকার দু’দিকে বসানো হয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। সেখানে পুলিশ ছাড়াও চোখে পড়বে বাইরে থেকে আসা তৃণমূল দুষ্কৃতীদের। ভাবাদিঘি থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরেই বাঁকুড়া সীমান্ত। দশ কিলোমিটার দূরেই পশ্চিম মেদিনীপুরের চকমাইতলা। সকাল থেকেই গ্রামের সীমানার রাস্তা বরাবর টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে কোতলপুর, বাঁকাদা, চৈতল, চমকাইতলা থেকে আসা বাইকবাহিনী। বাইরের লোকের আনাগোনাই আশঙ্কা বাড়াচ্ছে গ্রামবাসীদের। তবে আশার কথা, অবরুদ্ধ ভাবাদিঘির প্রতি সমর্থন বাড়ছে গোঘাটের আশেপাশের বাগদি পাড়ার গ্রামগুলিতেও। ভাবাদিঘির পাশেই বকুলতলা, নবাসন, কাঁটালির মতো গ্রাম। প্রতিটি গ্রামেরই সিংহভাগ বাসিন্দা গরিব খেতমজুর। তাঁরাও বলছেন, ভাবাদিঘির দিঘি বুজিয়ে রেললাইন হলে বাঁচার রসদই থাকবে না ১৪৫টি পরিবারের। শুধু ভাবাদিঘি নয়, আশপাশের গ্রামের গরিব মানুষও এখন বলছেন রেললাইন হোক দিঘি বাঁচিয়ে, গ্রামের উত্তর দিকে দিঘির পাড়ের জমিতে হোক রেললাইন। কাল যা বলছিল ভাবাদিঘির বাগদিপাড়া, আজ তা বলছে কাঁটালি, বকুলতলার গরিব মানুষও। গোঘাট জুড়ে কান পাতলে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে ভাবাদিঘির মানুষ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে তাদের বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে আশপাশের গ্রামগুলির গরিব মানুষও। ক্রমশ নিজেরদের আন্দোলনের প্রতি প্রতিবেশী গরিব গ্রামগুলির সমর্থনই ভরসা জোগাচ্ছে ভাবাদিঘিকে দিঘি রক্ষার লড়াইয়ে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement