ঘুষখোরদের বাঁচাতে রাজ্যের থাবা কোষাগারের টাকাতেই

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৯শে মার্চ— সারদাসহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে সি বি আই’ তদন্ত ঠেকাতে প্রায় ১১কোটি টাকা খরচ করেছিল মমতা ব্যানার্জির সরকার। সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা, দেশের নামী দামি আইনজীবীদের দাঁড় করানো হয়েছিল এই মামলায়। তা সত্ত্বেও সি বি আই তদন্ত ঠেকাতে পারেনি রাজ্য।
ফের সরকারি কোষাগারের বিপুল টাকা খরচ করেই নারদকাণ্ডে সি বি আই তদন্ত ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন মমতা ব্যানার্জি। শনিবার থেকেই দিল্লিতে মুকুল রায়সহ একাধিক দলীয় নেতা ও আইনজীবীদের পাঠিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সম্ভবত সোমবার সকালেই হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করতে চলেছে তৃণমূল। দলের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের তরফেও মামলা দায়ের হচ্ছে। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, দিল্লির কংগ্রেস নেতা আইনজীবী কপিল সিবাল সম্ভবত রাজ্য সরকারের হয়ে এই মামলায় অংশ নিতে চলেছেন। প্রাথমিকভাবে কথাবার্তাও হয়ে গিয়েছে। কপিল সিবাল সারদাকাণ্ডের মামলাতেও রাজ্য সরকারের হয়ে লড়েছিলেন। মদন মিত্রের হয়েও কলকাতা হাইকোর্টেও সওয়াল করে গিয়েছিলেন। এবার নারদ ঘুষকাণ্ডেও বিপুল টাকার বিনিময়ে কপিল সিবাল দাঁড়াতে চলেছেন। তৃণমূলের হয়ে এই মামলায় দাঁড়াচ্ছেন আইনজীবী গোপাল সুব্রহ্মণ্যম।
ফলে সারদার মতো এবার নারদ ঘুষ মামলাতেও জনগণের করের টাকাতেই অভিযুক্ত নেতাদের সি বি আই তদন্তের হাত থেকে বাঁচাতে মাঠে নেমে পড়েছে রাজ্য সরকার। দিল্লিতে প্রবল তৎপরতা। কলকাতা থেকেও একাধিক আইনজীবী রওনা দিয়েছেন।
শাসকদলের এই তৎপরতাকে উপেক্ষা করেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সি বি আই জোর কদমেই তদন্তের পথে। এদিন রাতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি জানা গিয়েছে, ৭২ ঘণ্টার প্রাথমিক তদন্ত শেষে এফ আই আর করতেই চলেছে সি বি আই। শুক্রবার আদালতের নির্দেশ ছিল ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে এবং তার ভিত্তিতেই সি বি আই চাইলে এফ আই আর রুজু করতে পারবে। সি বি আই’র দাবি প্রাথমিক তদন্তে ইতিমধ্যেই যা উঠে এসেছে তাতেই দুর্নীতির ও ঘুষের অভিযোগ মামলা রুজু সময়ের অপেক্ষা।
এফ আই আর রুজু করেই আনুষ্ঠানিকভাবে নারদকাণ্ডে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হতে চলেছে সম্ভবত মঙ্গলবারই। গত ৪৮ ঘণ্টায় রীতিমত তৎপরতার সঙ্গেই তদন্তের কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে সি বি আই। ইতিমধ্যে নারদের ৪২৮ মিনিটের ফুটেজের অনুবাদ সম্পূর্ণ। অসম্পাদিত ফুটেজে আরও নয়জন তৃণমূল নেতার প্রসঙ্গ রয়েছে। সেই কথোপকথনের অনুবাদও সম্পূর্ণ। ফরেন্সিক ল্যাবরেটরির রিপোর্ট বিশ্লেষণের কাজও চূড়ান্ত হয়েছে।
এর মধ্যেই এদিন দিল্লিতে নারদ নিউজের সি ই ও ম্যাথু স্যামুয়েলের অফিসে যায় সি বি আই-র এক তদন্তকারী দল। সেখান থেকে ল্যাপটপ, সিডিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ম্যাথু স্যামুয়েলকেও প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা সি বি আই-র। স্যামুয়েলকে ১২টি প্রশ্ন ই-মেলে পাঠায় সি বি আই। এদিন স্যামুয়েল সেই প্রশ্নের উত্তর ই-মেল মারফত সি বি আই-র কাছে পাঠিয়েছেন। সি বি আই মূলত জানতে চায় কেন এই স্টিং অপারেশন করা হয়েছিল, তখন তিনি কোন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এই স্টিং অপারেশনের জন্য টাকাকে দিয়েছিলেন, তাঁর অফিসে উর্ধ্বতন আধিকারিকরা কী জানতেন স্টিং অপারেশনের কথা, কার মারফত তৃণমূল শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, স্টিং অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত টাকা কোথা থেকে এলো, কে দিয়েছে। সি বি আই সূত্রে জানা গিয়েছে, সমস্ত প্রশ্নেরই লিখিত উত্তর দিয়েছেন ম্যাথু স্যামুয়েল। 
তাতে স্যামুয়েল জানিয়েছেন, তহেলকা-তে থাকার সময়েই এই স্টিং অপারেশনের কাজ শুরু হয়। তিনি কলকাতায় সে সময় কোন কোন হোটেলে ছিলেন তাও জানান। এই স্টিং অপারেশনের জন্য তৃণমূল সাংসদ কে ডি সিং টাকা দিয়েছিলেন। কলকাতায় তাঁকে বিভিন্ন সময় প্রয়োজনে তহেলকা অফিসের এক ব্যক্তি এসে টাকা দিয়ে গিয়েছেন। ইসমাইল নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথম টাইগারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সূত্রেই এরপর ইকবাল আহমেদ হয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছান তিনি। সি বি আই’র এক আধিকারিকের কথায়, স্যামুয়েল তদন্তে সাহায্য করছেন, প্রতিটি প্রশ্নেরই উত্তর মিলেছে।
এদিকে সোমবারই শেষ হতে চলেছে আদালতের দেওয়ার ৭২ ঘণ্টা সময়। আর তাতেই রীতিমতো আতঙ্কের চোরাস্রোত এখন তৃণমূল শিবিরে। অভিযুক্ত একাধিক নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনাও সেরেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। হাইকোর্ট অবিলম্বে সাসপেন্ড করার কথা জানালেও রবিবার পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই রয়েছেন আই পি এস অফিসার মির্জা। 
তৃণমূল শিবিরে আতঙ্ক বাড়িয়েছে এখনও পর্যন্ত সামনে না আসা বেশ কিছু অসম্পাদিত ভিডিও ফুটেজ যা রীতিমতো কপালের ভাঁজ চওড়া করতে পারে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির। নারদ স্টিং অপারেশনের ফুটেজের কথোপকথনে ঘুষ নেওয়ার প্রসঙ্গে অভিষেকদের নিয়েও রীতিমতো তথ্য মিলেছে বলে দাবি সি বি আই সূত্রের।
এদিন রাতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, আপাতত এফ আই আর’ করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিচ্ছে সি বি আই। কোথায় এফ আই আর হবে, এরাজ্যে নাকি অন্যত্র তা নিয়েও চলছে দফায় দফায় আলোচনা। দিল্লি থেকে আসা আধিকারিকরা এদিনও দুপুরে বৈঠকে বসেন। এদিন এদিন দুপুরেই হাইকোর্টে নারদকাণ্ডে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা অমিতাভ চক্রবর্তী, অক্ষয় সারেঙ্গি ও ব্রজেশ বর্মাকে তলব করা হয়। নিজাম প্যালেসে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন সি বি আই’র আধিকারিকরা।
এদিন রাতেই ‘বুকে ব্যথা’ নিয়ে দক্ষিণ কলকাতায় এক বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি হন নারদকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত তৃণমূলী বিধায়ক ইকবাল আহমেদ। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement