‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলেই শপথ

‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলেই শপথ
+

লক্ষ্ণৌ, ১৯শে মার্চ- হিন্দুত্বের নামে হিংসা ছড়ানোয় দায়ী যোগী আদিত্যনাথ শপথ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী পদে। রবিবার লক্ষ্ণৌয়ে তাঁর সঙ্গে শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদের ৪৭সদস্য। যার মধ্যে রয়েছেন মুজফ্‌ফরনগর দাঙ্গায় অভিযুক্ত সুরেশ রানাও। ভালো সংখ্যায় রয়েছেন দলবদলুরা। উপমুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন দু-দু’জন, কেশবপ্রসাদ মৌর্য এবং দীনেশ শর্মা। 
উপমুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ রাজ্য বি জে পি-র সভাপতি এবং সাংসদ। দীনেশ শর্মা লক্ষ্ণৌয়ের মেয়র। দু’জনের কেউই বিধানসভার সদস্য নন। পরিষদীয় দলের বৈঠকে আদিত্যনাথ এবং কেশবপ্রসাদ মৌর্য নিজেদের সমর্থকদের আলাদা করে জড়ো করেছিলেন চাপ তৈরির জন্য। মনে করা হচ্ছে যে মুখ্যমন্ত্রী পদে দলেরই বিভিন্ন অংশের আলাদা দাবি, তার সঙ্গে ভিত্তি সংগঠন আর এস এস-র পছন্দের শর্ত মেলাতে দু’জনকে উপমুখ্যমন্ত্রী করেছে বি জে পি। 
বিধানসভা নির্বাচনে ৪০৩আসনের মধ্যে ৩২৫টিতে জয়ী বি জে পি এবং সঙ্গীরা। শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বি জে পি জাতীয় সভাপতি অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিজে পি’র প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। অনুষ্ঠানের পরই প্রধানমন্ত্রী টুইটে বলেছেন, উত্তর প্রদেশকে উত্তমপ্রদেশে রূপান্তরে চেষ্টার ত্রুটি রাখবে না এই মন্ত্রিমণ্ডল। নজিরবিহীন উন্নয়ন হবে। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য উন্নয়ন। শপথ নিয়ে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান আউড়েছেন আদিত্যনাথও। কিন্তু এদিনই শপথ অনুষ্ঠানের কিছু আগে স্পষ্ট করেছেন কেমন রূপান্তরের পক্ষে বি জে পি। 
কেমন রূপান্তর চান, শপথের দিনই বোঝালেন যোগী আদিত্যনাথ। টুইটারে আদিত্যনাথ পোস্ট করে দেন লোকসভায় গোরখপুরের সাংসদ হিসেবে তাঁর দেওয়া বক্তৃতার ভিডিও। আরো লেখেন, ‘শপথে থাকছেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। জয় শ্রীরাম’। পোস্ট করা ভিডিও-তে দেখা যায় লোকসভায় তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন সাচার কমিটি গঠনের সমালোচনা করে। সংখ্যালঘুদের আর্থিক, সামাজিক পরিস্থিতি অনুসন্ধানে গড়া হয়েছিল যে কমিটি। তার জন্য কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ তুলছেন তিনি। উত্থানের পর্ব থেকে সংখ্যালঘু বিরোধী হিংস্র প্রচারকে হাতিয়ার করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জিগির তুলতে অভ্যস্ত আদিত্যনাথ যে এই পথেই চলবেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন শপথের দিনেই। 
গোরখপুর মঠের প্রধান মহন্ত আদিত্যনাথ একের পর এক হিংস্র স্লোগান তুলেছেন বিভিন্ন পর্বে। ২০০৭-এ গোরখপুর দাঙ্গায় গ্রেপ্তারও করা হয় তাঁকে। রাম মন্দিরের জিগির তুলে ধর্মীয় মেরুকরণ প্রিয় অভ্যাস তাঁর। ২০১৫তে তাঁর হুঙ্কার ছিল, যারা যোগাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে দেশের বাইরে যেতে হবে তাদের। ধর্মীয় বিভাজনের পরিচিত এই মুখ সরব থেকেছেন ধর্মান্তরকরণ থেকে লাভ জিহাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পে। ২০০৫-এ ধর্মান্তরকরণের পক্ষে উগ্র প্রচারে পান্ডা তিনি। উগ্র হিন্দুত্ব নিয়ে সমস্যা না থাকলেও আদিত্যনাথের সময়জ্ঞানের অভাব অনেকক্ষেত্রে বিপাকে ফেলেছে দলকে, বলছেন বি জে পি রাজ্য নেতাদের একাংশ। জানা গিয়েছে, মোদী-শাহ চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনোজ শর্মাকে। কিন্তু আর এস এস এবং দলে তা নিয়ে ভিন্নমত ছিল। রাজনাথ সিংয়ের পক্ষে ছিলেন বিধায়কদের একাংশ। রাজনাথ নিজে চাননি। আর এস এস-র চাপ ছিল যোগীর পক্ষে। যদিও আর এস এস তা বরাবরের মতোই অস্বীকার করছে। নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টায় যোগীর সঙ্গে দু’জন উপমুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন মোদী এবং শাহ। 
মন্ত্রিপরিষদের বিন্যাসে ভারসাম্যের অভাব থাকার অভিযোগও উঠতে শুরু করেছে এদিনই। সদস্যদের ২৬জন উচ্চবর্ণের। তার মধ্যেও গরিষ্ঠতা বেশি ঠাকুর অংশের। দলিত রয়েছেন ৩জন। অনগ্রসর অংশের ১৪জন সদস্য রাখা হয়েছে। তার মধ্যে একজন যাদব। ভোটের প্রচারে বি এস পি এবং সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে নিজের নিজের অংশকে ক্ষমতায় বাড়তি সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ চালিয়েছিল বি জে পি। আবার অঞ্চলের বিচারে পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিনিধি রাখলেও বুন্দেলখণ্ডের ১৯বিধায়কের থেকে মন্ত্রী করা হয়েছে ১জনকে।  
সমাজবাদী পার্টির নেতা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদব বাবা মুলায়ামকে নিয়ে শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ও হয়। কিন্তু, অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন বি এস পি নেত্রী মায়াবতী। তাঁর প্রতিক্রিয়া, ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচন ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে লড়বে বি জে পি। যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে সেজন্যই। জম্মু ও কাশ্মীরে ন্যাশানাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা বি জে পি সঙ্গী মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিকে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন। ওমরের টুইট, মৃত মুসলিম মহিলাদেরও ধর্ষণ করতে বলেছিলেন যিনি, তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী করলো আপনার সঙ্গী বি জে পি।  
বি এস পি ছেড়ে আসা ৭জনকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। কংগ্রেসের প্রাক্তন প্রদেশ সভানেত্রী রীতা বহুগুনা যোশীকেও পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। সংখ্যালঘু উন্নয়ন, হজ বিষয়ক দপ্তরে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে প্রাক্তন ক্রিকেটার মহসিন রেজাকে। নির্বাচনে কোন মুসলিমকেই প্রার্থী করেনি বি জে পি। ফলে, রেজা এখনো বিধানসভার সদস্য নন। মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন আরেক প্রাক্তন ক্রিকেটার চেতন চৌহান। জাতীয় স্তরের দুই নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিং এবং শ্রীকান্ত শর্মাকেও মন্ত্রী করা হয়েছে। সিদ্ধার্থনাথ টানা পশ্চিবঙ্গের দায়িত্বে ছিলেন বেশ কিছুদিন। শরিকদের মধ্যে এস বি এস পি এবং আপনা দলের ১জন করে মন্ত্রী হয়েছেন।  
উত্তর প্রদেশে টানা পনেরো বছর সরকার গড়ার সুযোগ পায়নি বি জে পি। আদিত্যনাথের আগে উত্তর প্রদেশে বি জে পি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তিনজন। তার মধ্যে কল্যাণ সিংয়ের সময়েই বাবরি মসজিদ ভাঙে সঙ্ঘের উন্মত্ত ব্রিগেড। কল্যাণ সিং এখন রাজস্থানের রাজ্যপাল। তাঁর নাতি সন্দীপ সিং প্রথমবার বিধায়ক হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন। একদফায় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন রাজনাথ সিং-ও।