যোগীর রাজ্যে
হাসপাতাল
কসাইখানা 

৬৩টি শিশুর মৃত্যুতে যেন ফিরছে মোদীর ‘শ্মশান’ ঘোষণা 

যোগীর রাজ্যে<br>হাসপাতাল<br>কসাইখানা 
+

মনোজ সিং গোরক্ষপুর, ১২ই আগস্ট— চারদিনের ছেলেটাকে বাঁচাতে তিনি ওর মুখে মুখ দিয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে অক্সিজেন নেই। কাজ করছে না ভেন্টিলেটর। কিন্তু সদ্যোজাতকে বাঁচাতে বাবার সেই ম্যানুয়াল রিসাসিটেটর পাঁচ ঘণ্টার বেশি টানতে পারেনি। তাই গত পাঁচ দিনে বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন না পেয়ে ৬৩ মৃত শিশুর তালিকায় নাম উঠে গেছে কিশান গুপ্তার নামকরণ না হওয়া ছেলেটারও। 
শোকে বিহ্বল বাবা আর্তনাদ করে বলছিলেন, ‘এটা কোনো মেডিক্যাল কলেজ নয়, এ তো কসাইখানা।’ শনিবার সকালে হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে যখন টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আদিত্যনাথ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তাঁর খানিক তফাতেই তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আরো দুই মৃত শিশুর পরিবার। এদিন মারা গেছে সেই দুই শিশু। 
গোরক্ষপুর লাগোয়া দেহাত থেকে নিয়ে আসা এই সব এনসেফেলাইটিস রোগীদের সব পরিবারই এখন মৃত্যু শঙ্কায়। এদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই মনে হচ্ছিল, কথা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভোট প্রচারে এসে বলেছিলেন, ‘গাঁও মে আগর কবরস্থান বানতা হ্যায়, তো গাঁও মে শ্মশান ভি বানানা চাহিয়ে।’’ ওঁর সেই মেরুকরণের দগদগে ঘা নিয়ে এরাজ্যের তখ্‌তে চড়ে বসেছেন ওঁরই স্নেহধন্য স্বঘোষিত ‘যোগী’ আদিত্যনাথ। মাস কয়েকের মধ্যেই উত্তর প্রদেশের মানুষ মোদী শাসনের মতোই টের পেতে শুরু করেছেন ‘উত্তম প্রদেশের’ শাসন-মাহাত্ম্য। আর খোদ মুখ্যমন্ত্রীর এলাকা এই গোরক্ষপুরের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এখন রাজ্যের গ্রামে গ্রামে শ্মশান বানানোর ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। শুধু অব্যবস্থায় নয়, অনেকটাই হয়তো ইচ্ছাকৃত গাফিলতিতে এখন ৬০ শিশুর রক্ত লেগেছে আদিত্যনাথ সরকারের হাতে।
হাসপাতালেই একজন দেখালো কৈলাশ সত্যার্থীর টুইট। অক্সিজেন না পেয়ে এতগুলি শিশুর মৃত্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নোবেলজয়ী সমাজকর্মী। বলেছেন, অক্সিজেন না পেয়ে শিশুর মৃত্যু কোনো ট্র্যাজেডি নয়, এ তো নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এটাই কি আমাদের শিশুদের কাছে সত্তর বছরের স্বাধীনতার মানে? তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে স্পষ্ট হস্তক্ষেপ করতে বলেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য স্পষ্ট হস্তক্ষেপই করেছেন। গত মঙ্গলবার এস তিনি একটা দশ বিছানার আইসিইউ, ছয় বিছানার ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট উদ্বোধন করে গেছেন। ঘুরে দেখে গেছেন এনসেফেলইটিস আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ডও। আদিত্যনাথের সেই উদ্বোধনী সফরের দিনেই হাসপাতালে মারা গেছে নটি শিশু। সেদিন যে পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে তিনি বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছিলেন, এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলির উৎসস্থল ওই ওয়ার্ডই। ৯ই আগস্ট রাত সাড়ে দশটায় আদিত্যনাথ তাঁর সেই নিরীক্ষণের কথা ফলাও করে জানিয়েছেন টুইটে।
আর শনিবার রাত আটটায় তাঁর টুইট বার্তা হলো, বি আর ডি মেডিকেল কলেজে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আর এর পরও দোষীদের ছাড়া হবে না। হ্যাঁ, এদিনই সাসপেন্ড করা হয়েছে বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ রাজীব মিশ্রকে। সেই ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অক্সিজেনের বিল কেন মেটানো হয়নি, কেনই বা এত শিশুর মৃত্যুর পরও হাসপাতালে শনিবারও স্বাভাবিক হলো না অক্সিজেন সরবরাহ, সে সবের জবাব অবশ্য দেননি মুখ্যমন্ত্রী।
হাসপাতালের দেহাতি বাবা-মা’র কাছে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর ওই টুইট বাণী পৌঁছানোর অবকাশ নেই। তাঁরা খুঁজছেন যোগীকে, তাঁরা খুঁজছেন প্রশাসনের কোনো বড় আধিকারিককে। এনসেফেলাইটিস ওয়ার্ডে তাঁর সাত বছরের মেয়ে ভর্তি। ভগবতী যাদব ক্ষোভ উগরে বললেন, ‘রোগীগুলি যখন অক্সিজেন না পেয়ে মরছে, একজনও বড় অফিসারের টিকি দেখছি না।’ 
ভগবতী যাদবদের এই ক্ষোভের আঁচই এখন সোশ‌্যাল মিডিয়ার ওয়ালে ওয়ালে। স্থানীয়রা সেখানেই দাবি তুলছেন, মুখ্যমন্ত্রী কোথায়, মুখ্যমন্ত্রী আসুন। চাপে পড়ে এদিন সরকারি তরফে ঘোষণা হয়েছিল, শীঘ্রই হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ নাথ সিং ও মেডিক্যাল শিক্ষামন্ত্রী আশুতোষ ট্যান্ডন। কিন্তু চিঁড়ে ভেজেনি। স্থানীয়দের দাবি, আসতে হবে আদিত্যনাথকেই। শহরের খোরাবার এলাকার বাসিন্দা রাধে শ্যাম বলছিলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থার উপরই মানুষের বিশ্বাস চলে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী আসুন। সন্তান হারা মা-বাবার সঙ্গে কথা বলুন। 
আসলে গরিবের জীবনের মূল্যকে এত সস্তা ঠাহর করাকেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ। আদিত্যনাথ সরকারের এই ‘চলতা হ্যায়’ মনোভাবই এখন ক্ষোভের পাহাড় তৈরি করছে।  
শুক্রবার রাতে যখন একের পর এক শিশু মৃত্যুর খবর আসছিল এক টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম রাজ্যের সংখ্যালঘু কল্যাণ মন্ত্রী বলদেব আউলাখ স্বাধীনতা দিবস নিয়ে এক বিতর্কে হাজির। এক প্যানেলিস্ট বিআরডি হাসপাতালের প্রসঙ্গ তুলতেই খেপে গেলেন বলদেব। সঞ্চালক তড়িঘড়ি পরিস্থিতি সামাল দিলেন এই বলে, আসল ইস্যু থেকে ফোকাস ঘুরিয়ে দেবেন না।
সত্যিই, ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ স্লোগানটা যেন মোদী-যোগী রাজে বড্ড বেশি উপহাস করছে!