আহতদের বিরুদ্ধেই মামলা

আহতদের বিরুদ্ধেই মামলা
+

কলকাতা, ১২ই সেপ্টেম্বর— শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে পুলিশের বর্বর আক্রমণের পর এবার মিথ্যা মামলার আক্রমণ। মানুষের দাবি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার ‘অপরাধ’-এ পুলিশের লাঠি, বুটের আঘাতে রক্তাক্ত, জখম হওয়ার পরেও নিস্তার মিললো না। এদিন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক নিরঞ্জন সিহিসহ ১৩ জনের ১৪ দিনের জেল হেপাজত হলো। বাঁকুড়াতেও সোমবারের নৃশংস ‍‌পুলিশি আক্রমণের পর গভীর রাতে বাড়ি থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলা রুজু করেছে পুলিশ। এমন কী হাসপাতাল, নার্সিংহোমে গিয়ে আক্রান্ত, জখমদের পরিচিতি জেনে নিয়ে সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে তৃণমূলী প্রশাসনের তরফে। এদিকে উত্তর ২৪ পরগনায় সি পি আই (এম) ও বামপন্থী কর্মী-নেতা তো বটেই, তারসঙ্গে মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন আদালতে আসা বিচারপ্রার্থীরাও। কিন্তু লাঠি, গুলি, কাঁদানে গ্যাস বা মিথ্যা মামলার বুলডোজার চালিয়েও প্রতিবাদী মুখ বন্ধ করা গেলো না। মঙ্গলবার রাজ্যের নানা প্রান্তে এমন স্বৈরাচারী সরকারের প্রতি ধিক্কার ছুঁড়ে দেওয়া হলো প্রতিবাদী মিছিল ও বিক্ষোভসভায়।
বারাসতে জেলাশাসকের কাছে দাবি জানানোর সোমবারের কর্মসূচিকে শায়েস্তা করতে মঙ্গলবার সাজানো মামলায় চার বিচারপ্রার্থীর ৪ দিনের জেল হেপাজত হলো। সোমবার এঁরা বারাসত আদালতে এসেছিলেন নিজস্ব কাজে। সেই সময়ে বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের উপর নৃশংস আক্রমণ চালানো তো হয়েছেই, সাধারণ মানুষের উপর, এমন কী আইনজীবীদের সেরেস্তায় ঢুকেও পুলিশ নির্বিচারে লাঠি চালিয়েছে। আক্রান্ত, জখমদের ধরপাকড় অভিযানে বাদ যাননি তাঁরাও। সোমবার সন্ধ্যায় আটক ১২৫ জন আন্দোলনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হলেও এই ৪ জনকে আটক করে রাখে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে এদিন মিথ্যা মামলা দায়ের করে আদালতে তোলা হয়। বারাসত থানার পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে বেআইনি অস্ত্রসহ জমায়েত এবং সরকারি কর্মচারী তথা পুলিশকে মারার উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া ইত্যাদি অভিযোগ তো এনেছেই, এর সঙ্গেই সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস প্রতিরোধ আইনেও অভিযুক্ত করা হয়েছে তাঁদের।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সোমবার বামফ্রন্টের জেলাশাসকের দপ্তর অভিযানে কোনও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাই ঘটেনি। এ ধরনের ছবি কোনও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়নি। রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের এমন হিংস্র প্রতিহিংসামূলক আচরণে তাই বিস্মিত আইনজীবীরাও। তাঁরা এদিন জানিয়েছেন, পুলিশ এই সাজানো মামলায় আইনের অপব্যবহার করল। যে ৪ জন সাধারণ মানুষ, বিচারপ্রার্থীর জেল হেপাজত হয়েছে, তাঁরা হলেন হিঙ্গলগঞ্জের দুর্গাপুর গ্রামের অসিত মণ্ডল, অশোকনগর গুমার অজয় মধু, হাবড়ার দিলীপ বিশ্বাস ও অমিতাভ বিশ্বাস। মঙ্গলবার বারাসত আদালতের আইনজীবীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখালেন এক ঘণ্টার কর্মবিরতি ও বুকে ব্যাজ পড়ে ধিক্কার মিছিল সংগঠিত করে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন আইনজীবীরা। বুকে কালো ব্যাজ পড়ে জেলা আদালত চত্বরে তাঁরা মিছিলও সংগঠিত করেন। মিছিল শেষে বক্তব্য রাখেন বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শিবপ্রসাদ মুখার্জি। সভার শেষে জেলা দায়রা বিচারক শুভ্রা ঘোষের হাতে কর্মবিরতিতে গৃহীত প্রস্তাবের কপি তুলে দেন বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উমাপদ চট্টোপাধ্যায় ও সম্পাদক শিবপ্রসাদ মুখার্জি। প্রায় ২০০ জন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে।
এদিন তমলুক আদালতে জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক নিরঞ্জন সিহিসহ ১৩ জনকে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল এই বাম কর্মী-সংগঠকদের বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত করা হয়। সাজানো মামলায় ধৃত এই ১৩ জন হলেন নিরঞ্জন সিহি, চিত্ত খান, পরিতোষ পট্টনায়েক, তপন হাজরা, জয়দেব মাইতি, মহাদেব বর্মণ, গৌতম মণ্ডল, অনাদি বেরা, হিমাংশু প্রামাণিক, পিণ্টু পাত্র, শেখ আজিজুল, বাদল প্রামাণিক এবং শংকর মাইতি।
এদিকে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বামপন্থী কর্মীদের উপর পুলিশের বর্বর আক্রমণের প্রতিবাদে মঙ্গলবার জেলার নানা জায়গায় বিক্ষোভসভা, ধিক্কার মিছিল সংগঠিত হয়েছে। সোমবার পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসকের কাছে জেলার কৃষক,শ্রমিক, ছাত্রযুব প্রমুখ নানা অংশের ন্যায্য দাবি জানাতে গিয়ে বামপন্থীরা পুলিশের ন্যক্কারজনক আক্রমণের শিকার হন। প্রায় শতাধিক বামপন্থী কর্মী রক্তাক্ত হন পুলিশেরর এলোপাতাড়ি লাঠিতে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর কাঁদানে গ্যাসও ছোঁড়া হয়েছিল। আক্রমণে রক্তাক্ত হয়েছেন মহিলা বামপন্থী কর্মীরাও। জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক নিরঞ্জন সিহিসহ অনেকেই আহত হন এই বর্বর আক্রমণে। আহত হন সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মিনতি ঘোষ। মঙ্গলবার তারই প্রতিবাদে কোলাঘাট, পাঁশকুড়া, রাতুলিয়া, পুরুষোত্তমপুর, ব্রজলালচক, ময়না, নন্দকুমার, হলদিয়া, মহিষাদল, চণ্ডীপুর, ভগবানপুর, পটাশপুর, এগরা, রামনগর, কাকটিয়া, কোলাঘাট, দইসাই ও কাঁথিতে ধিক্কার মিছিল ও বিক্ষোভসভা সংগঠিত হয়েছে।
এদিকে সোমবার দুপুরে বাঁকুড়ায় জেলাশাসকের দপ্তরের সামনে নির্মম আক্রমণ চালিয়ে বামপন্থী কর্মীদের রক্তাক্ত করার পর রাতেই পুলিশ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থী নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেপ্তার করে চারজনকে। সি পি আই (এম) বাঁকুড়া জেলা কমিটির সদস্য সুজয় চৌধুরি, এ বি টি এ-র জেলা সভাপতি অতনু ব্যানার্জি, বড়জোড়ার পার্টিনেতা তরুণ রাজ ও দিব্যেন্দু সরকারকে ঘুমন্ত অবস্থায় ঘর থেকে তুলে নিয়ে এসে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ। এরপর মঙ্গলবারও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থী কর্মীদের টেলিফোন করে সোমবারের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কতজন গিয়েছিলেন, তার জেরা চালিয়ে গেছে পুলিশ। বামপন্থী আন্দোলনের ২১ জন নেতা-কর্মীসহ একাধিক ব্যক্তির নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এদিন।
কিন্তু মিথ্যা মামলার প্রতিহিংসামূলক আক্রমণের মুখেও বামপন্থী কর্মীরা দমে যাননি। এদিন বাঁকুড়া জেলার বড়জোড়া, বিষ্ণুপুর ও বাঁকুড়া শহরে প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়। ধৃত বামপন্থী কর্মী-নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি ওঠে। বড়জোড়ায় মিছিল বিশাল আকার নেয়। বহু সাধারণ মানুষও এই মিছিলে পা মেলান। এদিকে পুলিশের প্রতিহিংসামূলক আক্রমণের মাত্রা এমনই বাড়লো যে, সোমবার সন্ধ্যায় বাঁকুড়ায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে চিকিৎসারত আহত বামপন্থী কর্মী-সংগঠকদের পরিচয়ের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। বাম ছাত্রনেতা বিশ্বজিৎ ধীবর বাঁকুড়া হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর পর বাঁকুড়ার এক জায়গায় সোমবার রাতে ছিলেন। সেই রাতেই তাঁর শালতোড়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ পুরো বাড়ি তছনছ করে। সোমবার রাতে বড়জোড়ায় সুজয় চৌধুরি, তরুণ রাজ, দিব্যেন্দু সরকারের বাড়িতে হাজির হয়ে তাঁদের বলা হয়, বাঁকুড়া থানায় যেতে হবে। দিব্যেন্দু সরকারকে পোশাক বদলানোর সুযোগও দেওয়া হয়নি। বড়জোড়ার মানুষ সকালে এই পুলিশের এই প্রতিহিংসামূলক আচরণের কথা জানার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement