দেশের মাটিতে প্রথম
মসজিদে গেলেন মোদী!

জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে পাশে নিয়ে ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা

দেশের মাটিতে প্রথম<br>মসজিদে গেলেন মোদী!
+

গণশক্তির প্রতিবেদন আমেদাবাদ, ১৩ই সেপ্টেম্বর— পাথরের জালির কাজের জন্যই তার নামডাক। শুধু স্থাপত্যকলার বিশেষত্ব হিসাবেই নয়, আমেদাবাদ শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থল এটি। নিজের মুখ্যমন্ত্রিত্বে তো বটেই, প্রধানমন্ত্রী হয়েও, এমনকি রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও কোনোদিন তিনি এর আগে কখনও এখানে আসেননি। বুধবার পর্যন্ত দেশের মাটির যে কোনও মসজিদ-দরগা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন মোদী। হঠাৎ করেই বদলে গেল চিত্রনাট্য। গুজরাট সফরে আসা জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে নরেন্দ্র মোদী এদিন সবরমতী আশ্রম ঘুরে দেখানোর পর শিনজো আবেকে নিয়ে ষোড়শ শতকে তৈরি আমেদাবাদের সিদি সৈয়দ মসজিদে। 
তথাকথিত গোরক্ষকদের দাপাদাপি, সংখ্যালঘু-আদিবাসী খুন, রোহিঙ্গা বিতাড়ন, মুক্তমনা সাংবাদিক খুন- দেশজুড়ে একের পর এক অসিহিষ্ণুতার নজিরে ঘরে বাইরে বিব্রত নরেন্দ্র মোদী। সেই বিড়ম্বনা কাটাতে চমকের রাস্তাতেই হাঁটালেন মোদী। দেশের মাটিতে কোনো মুসলিম ধর্মস্থানে শুধু পা রাখাই নয়, বেনজিরভাবেই ভারত সফররত বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে নিয়ে শহরের রাস্তায় রোড-শো-ও করলেন মোদী।
গুজরাটের বহুধর্মী সংষ্কৃতির অন্যতম প্রতীক এই মসজিদ। হিন্দু-মুসলিম সংষ্কৃতির মিলনে অন্যতম অনুঘটকও বটে। গত জুলাই মাসে ইউনেস্কোর তরফে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ শহরের তকমা পেয়েছে আমেদাবাদ। এখানকার জৈন, বৈষ্ণব ও মহাজনদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। তবে এই শহরের ইসলামিক ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি শব্দ খরচ করেননি কেউ। এর আগে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন অথবা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও গুজরাটের ধর্মীয় ঐক্য ও বিভিন্ন ধর্মের মিলন নিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে কোনোদিন মুখ খুলতে শোনা যায়নি। দেশ-বিদেশের নানান পোশাকে সেলফি তোলা ও ফ্যাশন শুটের দক্ষ মোদীকে কখনও দেখা যায়নি কোনো মসজিদের বাইরে ফোটো শ্যুটে। এর আগে কখনও এই মসজিদে তিনি যানওনি। মুসলিম পীর সঈদ ইমাম শাহী সাঈদ মোদীকে একবার ফেজ পরাতে গেলে তা পরতে অস্বীকার করেন তিনি। তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনাও হয়েছিল। বৌদ্ধ বা শিখ এমনকি পার্শী পোশাকে সেলফি তোলা মোদী অবশ্য দাবি করেছিলেন, কোনও একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে খুশি করা নয়, সমাজের সকলের উন্নয়নই আমাদের আসল লক্ষ্য। তবে তাতে সমালোচনা থামেনি। এরপরও নানা সময়ে মুসলিমদের সংস্পর্শ সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি।
এহেন নরেন্দ্র মোদীর হঠাৎ কী হলো? তবে কি শিনজো আবের সফরকেই সচতুর মোদী কাজে লাগাতে চাইলেন নিজের মুসলিম বিরোধী তকমা ঝেড়ে ফেলতে। সামনেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। প্যাটেল সমস্যাসহ নানা প্রশ্নে জর্জরিত বি জে পি। তাই কি মোদীর এই নতুন চমক? প্রশ্ন কিন্তু উঠতে শুরু করেছে। 
শুধু মসজিদ-চমকই নয় আমেদাবাদে এদিন রোড-শো করতে দেখা গেল মোদীকে। হুড-খোলা জিপে চড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেদাবাদের রাস্তায় আট কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সবরমতী আশ্রমে নিয়ে গেলেন শিনজো অ্যাবেকে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর পরনে তখন ছিল কুর্তা-পাজামা-নেহরু জ্যাকেট। কোনও বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে প্রধানমন্ত্রীর এহেন রোড-শোতে প্রথম দেখলেন দেশবাসী।
দুদিনের সফরে বুধবার ভারতে এসেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে এসেছেন তাঁর স্ত্রী আকি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির ছিলেন খোদ মোদী। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অ্যাবেকেও তিনি জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানিয়েছেন। এরপর জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে একদফা গার্ড অব অনার দেওয়া হয় বিমানবন্দরেই।
সেখানে কিছুক্ষণ থেকে সবরমতী আশ্রমের দিকে রওনা দেন দুই রাষ্ট্রনেতা। তবে, তার আগে বিমানবন্দরের ভি ভি আই পি লাউঞ্জে পরনের পোশাক পরিবর্তন করে নেন অ্যাবে। বিমান থেকে এদিন যখন অবতরণ করেন অ্যাবে, তখন তাঁর পরনে ছিল ফর্মাল শ্যুট। কিন্তু, সবরমতী আশ্রমের রওনা দেওয়ার আগে বিদেশি পোশাক ছেড়ে পুরো ভারতীয় পোশাকে সেজে নেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দর থেকে অ্যাবে যখন বের হলেন, তখন তাঁর পরনে ছিল কুর্তা-পাজামা ও নেহরু জ্যাকেট। তাঁর স্ত্রীর পরনে ছিল লাল সালোয়ার-কামিজ। সঙ্গে সাদা স্টোল।
এই রোড শো পর্ব শেষে সবরমতী আশ্রম সফর শেষ করেই মোদী আবেকে নিয়ে গেলেন পূর্ব আমেদাবাদের হলুদ বেলে পাথরের তৈরি ওই মসজিদে।