‘ভালো’ শেষের স্বপ্ন ভারতের

‘ভালো’ শেষের স্বপ্ন ভারতের
+

রাজর্ষি গাঙ্গুলি : নয়াদিল্লি ১১ই অক্টোবর — ‘ভারতীয় দলের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলো ওদের স্টপার। আনোয়ার। ওকে টপকে গোল করা সত্যিই কষ্টকর।’ ঘানার কোচ স্যামুয়েল ফাবিন হোটেলের লবিতে বসে যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন সবে লাঞ্চ শেষ হয়েছে ফুটবলারদের। কিছুক্ষণ আগেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে ডাইনিং রুম থেকে নিজের ঘরের দিকে গেছেন আনোয়ার আলি। শঙ্কাটা তৈরি হচ্ছিল কলম্বিয়া ম্যাচের পর থেকেই। পারবেন না আনোয়ার? ঘানা ম্যাচের আগের দিন সেই আশঙ্কাটাই সত্যি হলো। অনুশীলন করলেন না আনোয়ার এবং অমরজিৎ। বাকিরা যখন অনুশীলন করছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাগবি মাঠে তখন ফিজিওর সঙ্গে মাঠের চারদিকে হাঁটছিলেন ভারতীয় দলের নির্ভরযোগ্য দুই খেলোয়াড়। মাতোসও জানিয়ে দিলেন ঘানা ম্যাচে না খেলার সম্ভাবনাই বেশি এই দুই ফুটবলারের।

অবশ্য ঘানা কোচ স্যামুয়েল ফাবিনেরও মন ভালো নেই। সদাহাস্যময় এই ভদ্রলোক বেশ মিশুকে। তবে তিনি কেমন যেন পালটে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের পর থেকে। না, হারতে হয়েছে বলে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের শেষের দিকে বিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে সংজ্ঞা হারান ঘানার খেলোয়াড় আব্দুল ইউসুফ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়। বুধবার ছাড়া পাওয়ার কথা তাঁর। এতেই ভেঙে পড়েছেন ঘানা কোচ। কেউ ঘানা দলের গ্রুপ ছবি তুলতে চাইলে তাকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছেন, ‘আমার দলে একজন খেলোয়াড় নেই। তাই আমরা কোন গ্রুপ ছবি তুলবো না।’ তার মধ্যেই মাথায় আছে পরের রাউন্ডে যাওয়া চিন্তাও। এমনিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হারের পর সোশ‌্যাল মিডিয়ায় তাঁর সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন ঘানা সমর্থকরা। ভারতের সঙ্গে জিততে না পারলে কি হবে? স্যামুয়েল বলছেন, ‘আমাকে হয়তো খুনই করে ফেলবে।’

দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘানা এবারও অন্যতম ফেভারিট। ঘানা দলের বড় শক্তি তাদের শারীরিক জোর এবং সেই সঙ্গে গতি। বিশেষত ঘানা দলের বাঁ প্রান্তটা যেন সোনা দিয়ে বাঁধানো। অধিনায়ক এরিক আইয়াহ, রাশিদ আল্লাসান এবং সাদিক ইব্রাহিম। এই তিন ফুটবলারের দুরন্ত বোঝাপড়াতেই মূলত একের পর এক আক্রমণ তুলে আনে আফ্রিকার এই দেশের যুব দল। ভারতীয় কোচ মাতোসও বলছেন ঘানাই গ্রুপের সবথেকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। ‘সবথেকে কঠিন ম্যাচ আমরা খেলতে নামছি। দলটার দুরন্ত গতি। দুজন উইঙ্গারই অসাধারণ। দলের তিন, চারজন ফুটবলার আছেন যারা ম্যাচের রঙ বদলে দিতে পারে।’ একে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তার উপর প্রায় লক্ষ্যহীন ম্যাচ। দলের চোট সমস্যা। ভারতীয় কোচ অবশ্য কোন কিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘প্রতিটা ম্যাচই নতুন। একটা ভালো শেষ চাই আমাদের। তাই লক্ষ্যহীন বলা ঠিক নয়। ফুটবলারদের কিন্তু জেতার জন্যেই মাঠে নামা উচিত। ভারতের মানুষ কিন্তু বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছেন এই দেশও ফুটবলে কিছু করে দেখাতে পারে।’

কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের পর আপশোস ভারতীয় ফুটবলমহলে। কারণ ম্যাচটা জিততেই পারতো ভারত। একই কথা বললেন ঘানা কোচও। বললেন জেতা ম্যাচই মাঠে ফেলে এসেছে ভারত। ‘এখানে আসার আগে ভারতীয় ফুটবল নিয়ে খুব কম জানতাম। ভরসা ছিলো ইউ টিউব। কিন্তু ভারতীয় দল আমাকে চমকে দিয়েছে। ওরা টিম গেম খেলে একটা ইউনিট হিসাবে। আমাদের খুব ভালো খেলতে হবে। গত দুটো ম্যাচে প্রচুর গোলের সুযোগ তৈরি করেও, কাজে লাগাতে পারেনি ফুটবলাররা। শেষ ম্যাচে সেই ভুল করলে হবে না’ বলছিলেন স্যামুয়েল।

ভারতীয় ফুটবলাররা সত্যিই একটা দল হয়ে উঠেছে। একটা পরিবার হয়ে উঠেছে। তার টুকরো টুকরো কয়েকটা ছবিই দেখা গেলো বুধবার টিম হোটেলে। গত ম্যাচের পর থেকেই মন খারাপ ইছাপুরে রহিম আলির। তাঁর মন ভালো করতে হোটেলে দেখা করে গেলেন তার কোচ অমিয় ঘোষ। পরের ম্যাচের জন্য দিলেন অনেক টিপস। হোটেলে এসেছিলেন ভারতীয় দলের রিজার্ভ গোলকিপার প্রভসুখন গিলের পরিবার। ছেলেকে দিয়ে ডেকে পাঠালেন অমরজিৎ, স্ট্যালিন, জিকসন এবং ধীরাজকে। নিজেদের পরিবারের ছবিতে ডেকে নিলেন ওদেরও। ছেলে প্রথম দলে সুযোগ পাচ্ছে না তাতে কি? প্রভসুখনের মা জড়িয়ে ধরলেন ধীরাজকে। জিকসনকে আদর করে বললেন, ‘তু তো হিরো হ্যায় বাচ্চে।’ হিরো কেউ একজন নন। হিরো সবাই। হিরোদের জন্যই যেন আজ মিশে গেছে পাঞ্জাব এবং মণিপুর। বাংলার রহিমের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছেন বেঙ্গালুরুর স্ট্যালিন। ভারতীয় ফুটবলের এটাই মনে হয় এই বিশ্বকাপ থেকে সবথেকে বড় পাওয়া।

Featured Posts

Advertisement