রাত বাড়লে দুশ্চিন্তা
বাড়ে যুধিষ্ঠিরদের

ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা, দাবি দ্বীপাঞ্চলের

রাত বাড়লে দুশ্চিন্তা<br>বাড়ে যুধিষ্ঠিরদের
+

চিরন্তন পাড়ুই : হাওড়া, ১০ই অক্টোবর — ছিটেবেড়ার ঘরে দুই ছেলেকে নিয়ে যুধিষ্ঠির দোরজির সংসার। ঘরে এখন মেয়েও আছে। আছে জামাই। মেয়ে সন্তানসম্ভবা। তাই রাত বাড়লে আজকাল দুশ্চিন্তাও বাড়ে যুধিষ্টির দোরজির। তাঁর কথায়, ‘‘পোয়াতি মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা। হাসপাতাল নেই আমাদের দ্বীপে। নদী পেরিয়ে গাড়ি করে দূরে অমড়াগোড়ি বি বি ধর হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা করানো যায়। রাতে গাড়িও পাওয়া যায় না।’’

মুণ্ডেশ্বরী, দামোদর ও রূপনারায়ণ সীমানা এঁকেছে হাওড়ার প্রান্তসীমার দ্বীপাঞ্চলকে। সেখানেই উত্তর ভাটোরা এক গ্রাম। খেতমজুর, কৃষিজীবী মানুষের বসবাস। দুই মাস আগে চিকিৎসার অভাবে সাপের কামড়ে প্রাণ গেছে গ্রামেরই গৃহবধূ লীলাবতি দোরজির। পরিকাঠামো হীনতায় সরকারি মাতৃযানও অমিল। ‘‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বেড রয়েছে। কিন্তু, ২৪ঘণ্টার জন্য ডাক্তার নেই। তাই নদনদী ঘেরা দ্বীপাঞ্চল ভাটোরা ও ঘোড়াবেড়িয়া চিৎনান এলাকার মানুষের কিছু রোগ-ব্যাধি হলেই নৌকা করে নদী পেরিয়ে গাড়ি ভাড়া করে যেতে হয় জয়পুরের অমরাগোড়ি বিভূতিভূষণ ধর গ্রামীণ হাসাপাতালে। সংকটজনক হলে যেতে হয় উলুবেড়িয়ায়। দুর্গম পথ পেরিয়ে যেতে গিয়ে অনেকসময় মৃত্যুর সঙ্গেও পাঞ্জা লড়তে হয়’’ — বলছিলেন মানিক দোরজি।

এলাকায় জাঠা হবে বি পি এম ও-র। সেই জাঠায় চিকিৎসা, হাসপাতালের দাবিতে সোচ্চার হবেন দ্বীপের বাসিন্দা।

ঘোড়াবেড়িয়া চিৎনান ও ভাটোরা দুই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা নিয়ে দ্বীপাঞ্চল। গরিব খেতমজুর ও কৃষিজীবী মানুষের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় ভাটোরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা বলতে আউটডোরের চিকিৎসা। ডাক্তার বসেন বুধবার ও শুক্রবার। রাতে কিছু হলে চিকিৎসার সুযোগই নেই। উত্তর ভাটোরার গায়েন পাড়া থেকে নদী তারপর গাড়িতে আরো ঘণ্টাখানেক গেলে তবেই মেলে সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল। নদনদী ঘেরা ঘোড়াবেড়িয়া চিৎনান গ্রাম পঞ্চায়েত ও ভাটোরা গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের বসবাস। বেশিরভাগের উপার্জন কৃষিকাজ।

বাগনান থেকে ম্যাজিক গাড়িতে ঘণ্টাখানেকের যাওয়ার পর মধ্যে কুলিয়া। তারপর ভক্সেল ভ্যানে করে গায়েন পাড়ার মুণ্ডেশ্বরী নদীপাড়ে। বাঁশের সেতু পায়ে হেঁটে পেরোতেই ইজারাদার ১টাকা ভাড়া চাইলো। বিপদের ঝুঁকি নিয়েও হাজার হাজার মানুষ মোটর বাইক, ভ্যান নিয়ে নদী পার হন বাঁশের সেতু দিয়ে। ভাটোরা গ্রাম পঞ্চায়েত পরিচালনায় রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাই শাসকদলের ঠিক করা ইজারাদারদের উপার্জনের পাকা বন্দোবস্ত।

গ্রামে কাজ নেই বলে অলঙ্কারের কাজ শিখে কাঠমুণ্ডুতে সোনার কাজ করেন উত্তর ভাটোরার মণিশঙ্কর দোরজি ও দিলীপ দোরজিরা। আবার বিঘেখানেক জমিতে পটোল ও তিন বিঘে জমিতে ধান চাষ করেছিলেন গ্রামের ভূপেশ পাত্র। ভূপেশ পাত্র বলেন, ‘‘বন্যায় সব জলে গেল। আমরা দ্বীপে যারা থাকি লটারি কেটেই জীবন কাটাই। ফসল থাকবে কি থাকবে না কেউ জানি না। তবুও লটারির মতো চাষ করি। এই দশা দেখে ছেলেটা চাষ করে না। ধুলাগোড়ির এক কারখানায় কাজে লেগেছে। আমি বলেছি পারলে ওখানেই থাকিস। এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই। তাই ঘরের ছেলেরা বাইরে থাকলেই ভালো করবে।’’ কয়েকদিন হলো কাঠমাণ্ডু থেকে সদ্য বাড়িতে ফেরা দুই যুবক মণিশঙ্কর দোরজি ও দিলীপ দোরজিরা বললেন, ‘‘এলাকাতে ফিরতে চাই। পরিবারও হয়ে গেছে। কিন্তু, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগের জন্য পাকা সেতু না থাকায় রাতের বেলায় মুমূর্ষু রুগীকে নিয়ে দুশ্চিন্তাতে কাটাতে হয়। ২৪ ঘণ্টার ডাক্তার নেই। চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কাজও নেই। কী করবো ফিরে?’’

২০১১সালের জনগণনার প্রতিবেদন অনুসারে উত্তর ভাটোরা গ্রামের জনসংখ্যা ৫৩৭০ জন। দক্ষিণ ভাটোরা গ্রামের জনসংখ্যা ৮৮৫৪ জন। বেশিরভাগ গরিব মানুষের এখনও শৌচাগার নেই। উত্তর ভাটোরা দোলুই পাড়ার মামণি পণ্ডিত কিংবা দোরজি পাড়ার লক্ষ্মী দোরজি, পুতুল দোরজিরা বললেন, ভাটোরা গ্রাম পঞ্চায়েতে আবেদন করেও মেলেনি পাকা পায়খানা। তাই খোলা আকাশের নিচে ছাড়া পথ নেই।

বানভাসি হওয়ার পর দুর্গতি নেমে এসেছিল গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে। সরকারি ত্রাণ না পৌঁছালেও সি পি আই (এম) কর্মীরা ত্রাণ নিয়ে গরিব মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন গ্রামের মুমূর্ষু রুগীদের নিয়ে রাতবিরেতে সমস্যায় ভোগেন তার থেকে মুক্তির জন্য দ্বীপাঞ্চলে পাকা সেতু ও হাসপাতালের দাবি করছেন সর্বস্তরের মানুষ।

সি পি আই (এম) নেতা ও প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ মিত্র জানালেন, প্রায় তিরিশ হাজার মানুষ বসবাস করেন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নদ-নদী ঘেরা দ্বীপাঞ্চল ঘোড়াবেড়িয়া চিৎনান ও ভাটোরা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ভাটোরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ঘিরে ধাপে ধাপে গ্রামের মানুষের দিকে চেয়ে গ্রামীণ হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। সাংসদ হবার পর তৃণমূল সাংসদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পাকা সেতু নির্মাণের। দ্বীপাঞ্চলে পাকা সেতু ও হাসপাতাল তৈরির দাবিতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের লড়াই জারি রয়েছে।’’

Featured Posts

Advertisement