ফেসবুকে নিজের মত
প্রকাশ করে হাজতবাস

ফেসবুকে নিজের মত<br>প্রকাশ করে হাজতবাস
+

গণশক্তির প্রতিবেদন: নয়াদিল্লি, ১১ই অক্টোবর— গঙ্গার ‘প্রাণের অস্তিত্ব’ নিয়ে মজা করেছিলেন। বি জে পি-র রাম মন্দির তৈরির প্রতিশ্রুতিতে বিতর্ক তুলেছিলেন। কেন এয়ার ইন্ডিয়াকে দেওয়া হজ-ভরতুকি কেন্দ্রীয় সরকার তুলে নেয়নি, তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। সোশ‌্যাল মিডিয়ায় নিজের মত প্রকাশ করার ‘অপরাধ’-এ ৪২দিন জেলের ঘানি টানতে হলো উত্তর প্রদেশের জাকির আলি ত্যাগীকে। অবশ্যই যোগী আদিত্যনাথের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে। জাকিরের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ। চাকরি খুইয়েছেন তিনি। শুনানির দিন নির্দিষ্ট হলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে সেই শুনানি। সংবিধানকে উপেক্ষা করে স্বেচ্চাচারী বি জে পি সরকার শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধাচারণের জন্যই একমাসেরও বেশি সময় ধরে হেনস্তা করলো এই যুবককে, এমনই অভিযোগ। 

 সোশ‌্যাল মিডিয়ায় নিজের ব্যক্তিগত কিছু মত লিখেছিলেন বছর ১৮’র জাকির আলি। বিনা বাক্যব্যয়ে আচমকাই তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ। মুজফ্‌ফরনগর জেলে ৪২দিন বন্দি ছিলেন এই যুবক। জামিনের পর জাকির জানিয়েছেন, গত ২রা এপ্রিল রাতে তাঁকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সেইসময় তিনি একটি অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলেন। প্রাথমিকভাবে প্রতারণা এবং তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কিত অভিযোগ চাপানো হয় তাঁর উপর। তারপর আচমকাই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ, জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী কাজী আহমেদ। কিন্তু দেওয়া হয়নি কোনও চার্জশিট। কেন দেশদ্রোহিতার অভিযোগ চাপানো হলো, তা-ও স্পষ্ট করতে পারেনি পুলিশ।

‘জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন অপরাধীদের সঙ্গে একই লক-আপে ফেলে রাখা হয়। এমনকি শৌচাগার যাওয়ার জন্যও টাকা দিতে হয়েছে’, জেল থেকে বেরিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন জাকির। ‘যেদিন জেলে ঢোকানো হলো, সেদিন রাতে একজন লক আপে ঢুকে আমাকে মারধরও করে। সে পুলিশের পোশাকেও ছিল না। বারবার আমায় সন্ত্রাসবাদী বলা হয়’, এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জাকির। জেলের ভিতর মারধর করা হলেও জাকিরের মেডিক্যাল রিপোর্টে সেসবের কোনও উল্লেখ না করেই স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ।

মুজফ্‌ফরনগরেই একটি ইস্পাত কারখানায় কাজ করতেন স্নাতক স্তরের ছাত্র জাকির। তাঁর আট হাজার টাকা বেতনে পরিবারে সচ্ছলতা এসেছিল। কিন্তু জেলে রাত কাটানোর পর চাকরি খোয়া গিয়েছে ওই যুবকের। যদিও কারখানার মালিক যুক্তি দেখিয়েছেন, জি এস টি-র কারণেই এই ছাঁটাই।

উত্তর প্রদেশ পুলিশ তাদের এফ আই আর-এ জাকিরের কয়েকটি ফেসবুক পোস্টের উল্লেখ করেছেন। জাকির ফেসবুকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কেউ যদি গঙ্গায় ডুবে যায় তাহলে কী তার মধ্যেও প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে?’ সরকারের রাম মন্দির তৈরি নিয়ে সওয়াল ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়, লিখেছিলেন জাকির। পাশাপাশি, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ব্যবহৃত প্রোফাইল ছবির বিষয়ও উঠে এসেছে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশের অভিযোগনামায়। ২০১৬ সালে দাদরিতে অপরাধীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে নিহত পুলিশ আধিকারিক আখতার আলির ছবি রয়েছে জাকিরের প্রোফাইলে। এই ছবি সাধারণ মানুষকে ‘ঠকাচ্ছে’, উল্লেখিত হয়েছে এফ আই আর-এ। ‘আমি রাজনীতি ভালোবাসি। বিভিন্ন ধরনের বিষয় পড়ি এবং নিজের মতামতও অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। দুষ্কৃতীদের গুলিতে নিহত পুলিশ আধিকারিকের ছবি একমাত্র আমিই প্রোফাইলে রেখেছি তা তো নয়। আরও অনেকেই শোকজ্ঞাপন করে এই ছবি প্রোফাইলে আপলোড করেছেন। স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করে দেশদ্রোহী হয়ে উঠতে হবে, তা কখনও ভাবিনি’, ক্ষোভ-হতাশা একসঙ্গে ধরা পড়েছে জাকিরের গলায়। কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ, যিনি জাকিরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি অবশ্য এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। জানা গিয়েছে, জাকিরের জামিনের জন্য আদালত থেকে পরপর শুনানির দিন ধার্য করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা ভেস্তে দেওয়া হচ্ছিল। জাকিরকে কী ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিতভাবেই ফাঁসানো হলো? সেই প্রশ্নও উঠছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement