ডেঙ্গুতে দেগঙ্গায়
 আরও তিনজনের মৃত্যু

জ্বর-সমীক্ষা বন্ধের কথা নাকি জানেন না মন্ত্রী!

ডেঙ্গুতে দেগঙ্গায় <br> আরও তিনজনের মৃত্যু
+

গণশক্তির প্রতিবেদন: কলকাতা, ১১ই অক্টোবর— ডেঙ্গু নিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি স্তরে ঢিলামি চলছেই। এরই সঙ্গে পৌর এলাকাগুলিতে সরকারের তরফে বাড়ি বাড়ি জ্বর-সমীক্ষার কাজ যে বন্ধ হচ্ছে— তা জানেনই না পৌর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী! মুখ্যমন্ত্রী ডেঙ্গু নিয়ে কোনও কথা বলেননি। তাই তাঁর দপ্তরের মন্ত্রীদেরও কোনও হেলদোল নেই। অন্যদিকে, উত্তর চব্বিশ পরগনার দেগঙ্গায় ডেঙ্গু নিয়ে শোরগোল হওয়ায় শেষপর্যন্ত বুধবার বারাসত হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার হাল হকিকৎ সরেজমিনে দেখতে আসতে বাধ্য হলেন রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরা। গত ২৪ ঘন্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে দেগঙ্গায়। সেখানে মৃতের সংখ্যা এই পর্যন্ত ২৩ বলে জানা যাচ্ছে। গোটা উত্তর চব্বিশ পরগনায় তা দাঁড়িয়েছে ৫০। সি পি আই (এম) হাবড়া শহর এরিয়া কমিটির ডাকে এদিন হাবড়া হাসপাতালের সুপারের কাছে ডেপুটেশন দেন নেতৃবৃন্দ। উত্তরবঙ্গের ধূপগুড়িতে নতুন করে মৃত্যুর খবর না পাওয়া গেলেও, এখনো চা-বাগানগুলিতে প্রায় প্রতি ঘরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। এছাড়া গত কয়েকদিনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে কলকাতাতেও। কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে উপযুক্ত সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি। সংগঠনের তরফে দেওয়া হয়েছে ডেপুটেশন।

‘ফিভার সার্ভে’ বন্ধ করে দিচ্ছে রাজ্যের পৌর ও নগর উন্নয়ন দপ্তর। এই কাজ করতেন পৌর ও নগর উন্নয়ন দপ্তরের কর্মীরা। অথচ সেই দপ্তরেরই মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম তা জানেন না। বুধবার মহাকরণে এক বৈঠকে শিলিগুড়ি কর্পোরেশনের মেয়র অশোক ভট্টাচার্য রাজ্যের পৌর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করে বলেন, রাজ্যজুড়ে যেখানে ডেঙ্গু থেকে শুরু করে মশাবাহিত বিভিন্ন জ্বর বা রোগ প্রায় মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? ফিরহাদ হাকিম প্রশ্ন শুনে বলেন, এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি। 

এদিকে রাজ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কলকাতা পৌরসভার সহযোগিতা চেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি। বুধবার সমিতির পক্ষ থেকে মেয়র পরিষদ সদস্যের কাছে এক ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন সুখরঞ্জন দে, আবদুর রউফ, শিবেন্দু ঘোষ, দীপক কুমার হালদার। ডেপুটেশনে তাঁরা বলেন, প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। কলকাতাতে মারাও গিয়েছেন অনেকে। প্রাণঘাতী এই মশা নিধনে বা মশার লার্ভাগুলি নির্মূল করতে কলকাতা পৌরসভার যে পরিকাঠামো আছে তার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এবং জনসচেতনতা গড়তে গণ-উদ্যোগ প্রয়োজন। সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বস্তিতে বস্তিতে ব্লিচিং দিয়ে সাফাই, চৌবাচ্চা পরিষ্কার, প্রচারপত্রপত্র বিলি চলছে। এছাড়া স্বাস্থ্য শিবির করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই কাজে পৌরসভার সহযোগিতা দরকার।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় ডেঙ্গু যে মহামারীর রূপ নিয়েছে তা কয়েকদিন আগে থেকেই গণশক্তিতে প্রকাশিত হয়ে আসছে। অনেক সংবাদ মাধ্যম রাজ্য সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে ‘অজানা রোগ’-এ আক্রান্ত হচ্ছেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু বর্তমানে প্রচার মাধ্যম সুর পালটে বলতে শুরু করেছে উত্তর ২৪ পরগনায় ডেঙ্গু মহামারীর রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা এই জেলায় ৫০ ছুঁয়েছে।

বুধবার বারাসত হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার হাল হকিকৎ সরেজমিনে দেখতে এসেছেন রাজ্য স্বাস্থ্যঅধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথি, স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি অনিল ভার্মা, জেলা শাসক অন্তরা আচার্য, জেলার মুখ্যস্বাস্থ্য আধিকারিক রাঘবেশ মজুমদার সহ অন্যান্য আধিকারিক। এদিনের প্রতিনিধিদল প্রথমে বারাসত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের কাছে যায়। তাঁদের সঙ্গে সামান্য কথাও বলেন। এরপর তাঁরা হাসপাতাল সুপারের ঘরে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন। স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রতিনিধিদল দেখে গেল হাসপাতালের চেহারা। কেমনভাবে হাসপাতালে বেডে দুজন, এমনকি মাটিতে বিছানা পেতে রোগীরা পড়ে আছেন, দেখে গেলেন তাও।

এদিন ডেঙ্গুতে দেগঙ্গার চাপাতলার গ্রাম পঞ্চায়েতের তাজমীরা বিবি (৩৭), পণ্ডিতপুল এলাকার মজিনা বিবি (৫৫)-র মৃত্যু হয়। দেগঙ্গার ডেঙ্গু আক্রান্ত রেহেনা বিবি হাড়োয়া হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অবস্থার অবনতি ঘটলে বুধবার সকালে তাঁকে বারাসত হাসপাতালে নিয়ে আসার প্রায় ২ ঘন্টা পর চিকিৎসা না হওয়ার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এমনই অভিযোগ জানিয়েছেন মৃতার আত্মীয়স্বজন। দেগঙ্গায় এই ৩জনকে নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ২৩। এছাড়া হাবড়া, আমডাঙা, বিধাননগর, রাজারহাট, দমদম, বরানগর, বসিরহাট, বনগাঁ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছুঁয়েছে।

হাবড়াতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। হাবড়া হাসপাতালে পরিষেবা অপ্রতুল। প্রশাসন নির্বিকার। রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দাবিতে এদিন সি পি আই (এম) হাবড়া শহর এরিয়া কমিটির ডাকে প্রতিবাদ মিছিল হাবড়া থানার সামনে থেকে হাসপাতালের সামনে পৌঁছায়। সেখানে অবস্থান শেষে এক প্রতিনিধিদল হাবড়ার সুপার ডাঃ শংকরলাল ঘোষের কাছে উপযুক্ত চিকিৎসার দাবিতে ডেপুটেশন দেন। মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন পার্টিনেতা বাবুল কর, স্বপ্না ঘোষ, আশুতোষ রায়চৌধুরি, রঘুনাথ শীল সহ অন্যান্যরা। আমডাঙার স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, আমডাঙার সাধনপুর, বেড়াবেড়ি ও তাড়াবেরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় রক্ত পরীক্ষার নমুনা জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি পরীক্ষাগারের সাহায্য সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ এই গ্রামগুলিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং ইতিমধ্যে ৩ জন মারাও গিয়েছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement