পরিবারকে বিঁধে
ইস্তফা মুকুল রায়ের

নারদ- সারদায় আড়াল মমতাকে

পরিবারকে বিঁধে<br>ইস্তফা মুকুল রায়ের
+

গণশক্তির প্রতিবেদন:  নয়াদিল্লি ও কলকাতা, ১১ই অক্টোবর— রাজ্যসভার সদস্যপদ ও তৃণমূল কংগ্রেস একই সঙ্গে ছেড়ে দিলেন মুকুল রায়। একদা মমতার পরেই দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলে স্বীকৃত মুকুল রায় বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন করে মমতাকে কার্যত স্বৈরাচারী বলে আক্রমণ করেছেন। তবে সতর্ক মুকুল সারদা-নারদে নিজের পিঠ বাঁচানোর খেলাতেই মমতাকেও আড়াল করেছেন। বলেছেন, এইসব ব্যাপারে মমতা কিছুই জানতেন না। তাঁর দলের ব্যক্তি নেতারা কী করছেন তা সব নেত্রী জানবেন কী করে ? আবার একই নিঃশ্বাসে এই মুকুলই এদিন বলেছেন, ‘তৃণমূল এক ব্যক্তির দল। দলে নেতারা চাকর।’ যে দলে নেত্রীই সব, মুকুলেরই অভিযোগ মতো যে দলে গণতন্ত্রের বালাই নেই, সেই দলে শুধু চিট ফান্ড বা উৎকোচ কেলেঙ্কারিই নেত্রীর চোখের বাইরে কী করে থাকে, তার স্পষ্ট কোনও জবাব ছিল না মুকুল রায়ের কাছে।

বস্তুত বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের বারংবার প্রশ্নের উত্তরে আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে থাকেন তিনি। তার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে তিনি নিজেই এইসব কেলেঙ্কারিতে অন্যতম অভিযুক্ত। বিরোধীদের এমনও অভিযোগ রয়েছে, তাঁর চেষ্টা ও দৌত্যে সারদা-রোজভ্যালির মতো কেলেঙ্কারির তদন্ত শ্লথ করা হয়েছে। নিজেকে ও তৃণমূলকে বিশেষ করে সারদা কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচাতে তিনি ভূমিকা পালন করেছেন। সুতরাং ওই প্রসঙ্গ তুলে নতুন বিষের কৌটো খুলতে চাননি মুকুল। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো মমতা ব্যানার্জিকে আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে জড়ালে রাজ্যের পুলিশকে দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধেও তৎপরতা শুরু করে দিতে পারেন মমতা। এই দুই আশঙ্কা থেকেই আর্থিক কেলেঙ্কারির বদলে তিনি অন্য প্রশ্নে বিঁধেছেন তৃণমূলকে।

তৃণমূল কংগ্রেস থেকে আগেই সাসপেন্ড করা হয়েছে মুকুল রায়কে। এদিন তিনি দলের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ছাড়াও রাজ্যসভার চেয়ারপার্সন ভেঙ্কাইয়া নাইডুকে সাংসদ পদ থেকে ইস্তফার চিঠি দিয়ে আসেন।

মুকুল রায় অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল বি জে পি-কে সাম্প্রদায়িক দল বলে কী করে? মমতা ব্যানার্জি বি জে পি-নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন। সঙ্ঘের সঙ্গে ২০০৩, ২০০৪-এও বৈঠক করেছেন। তখন মাঝে মাঝে বলতেন বাজপেয়ী নরম, আদবানি কট্টরপন্থী। এখন বলছেন মোদী ঠিক আছে, অমিত শাহ সাম্প্রদায়িক। এইসব কথা অর্থহীন। এইসব চলতে পারে না।

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করে রায় বলেন, তৃণমূল তো তৈরি হয়েছিল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করবে বলে। তাহলে বারবার কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করা হলো কেন? তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে না কেন?

এক ব্যক্তির দল রাজনীতির পক্ষেই খারাপ, মন্তব্য করে মুকুল রায় বলেন, তৃণমূলে থাকার মতো পরিস্থিতি ছিল না। অন্য নেতাদের মতো ভৃত্য হয়ে থাকতে পারব না। দলে পারিবারিক রাজনীতি চলছে। দলের এমনই আবহাওয়া এ নিয়ে কথা বলার পরিস্থিতিও নেই। ইঙ্গিত মেলে, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির দাপট বৃদ্ধির কথাই বলতে চাইছেন মুকুল রায়। অভিষেকের উত্থান যে তাঁর শক্তিহীন হতে হতে ছিটকে বাইরে আসার একটি বড় কারণ, তা রাজনৈতিক ঘটনাক্রমেও স্পষ্ট।

ভবিষ্যৎ কী, স্পষ্ট বলেননি মুকুল। তবে নয়াদিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক মহলের খবর, বি জে পি-র সঙ্গেই কথা বলে এগচ্ছেন তিনি। সময় বিচার করে আনুষ্ঠানিক ভাবে বি জে পি-তে যাবেন। জানিয়ে রেখেছেন, বি জে পি-র শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি বি জে পি-কে সাম্প্রদায়িক দল বলে মনে করি না। প্রশ্ন হয়েছিল, দল থেকে বেরিয়ে এসে কিছু করতে পারবেন কি? সদম্ভে উত্তর দিয়ে মুকুল বলেছেন, কংগ্রেস থেকে আমরা যখন বেরিয়েছিলাম তখন একজনও সাংসদ, বিধায়ক আমাদের সঙ্গে ছিল না। ২০দিন পরে আমরা তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করি। লোকের অভাব হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও বুথ নেই যেখান থেকে আমার সঙ্গে কেউ আসবেন না।

বি জে পি-তে মুকুলের যোগদান একেবারে মসৃণ হবে, তা মনে হয় না। বি জে পি-র নেতাদের একাংশের মধ্যে তাঁকে নিয়ে যথেষ্টই অস্বস্তি রয়েছে। বস্তুত এদিনই সারদা-নারদ নিয়ে তাঁর মন্তব্যে ক্ষোভ জানিয়ে দিল্লির নেতাদের বার্তা পাঠিয়েছেন রাজ্য বি জে পি-র একাংশ। 

মুকুল রায়ের ইস্তফার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁকে ফের আক্রমণ করেছেন তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চ্যাটার্জি, যাকে মুকুল রায় ‘বাচ্চা ছেলে’ বলে কটাক্ষ করেছেন। এদিন পার্থ চ্যাটার্জিও দলের পুরানো সহকর্মীকে ‘কাঁচড়াপাড়ার ক্যাচড়াবাবু’ বলে আক্রমণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভালোই হয়েছে উনি চলে গেছেন। কাঁচড়াপাড়ার কাঁচা ছেলের হাত থেকে দল বাঁচলো।

তৃণমূলের সঙ্গে আর এস এস-এর সম্পর্কের কথা ফাঁস করে দিয়ে মুকুল রায় যা বলেছেন তা অস্বীকার করলেও পালটা কোনও যুক্তি দিতে পারেননি তিনি। শুধু বলেছেন, মমতা ব্যানার্জি কেবল ওঁকেই আর এস এস–এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দিতো? এসব কথা আগে বলেননি কেন? সি বি আই থেকে বাঁচার জন্য এখন এসব বলছেন।

মুকুল রায় এদিন বলেছেন, ‘মমতা ব্যানার্জি তৃণমূলের নেত্রী, কিন্তু আমরা চাকর নই। আমি তৃণমূলে থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের মতো মুখ বন্ধ করে থাকতে পারব না।’ এই প্রসঙ্গে পার্থ চ্যাটার্জি বলেন, উনি দলনেত্রীকে অপমান করেছেন। মমতা ব্যানার্জি আমাদের রোল মডেল, তাঁকে অনুসরণ করেই আমরা চলি, কিন্তু আমরা কেউ চাকর নই।

পার্থ চ্যাটার্জি এভাবে আক্রমণ করলেও মুকুল রায় সম্পর্কে অন্যরকম মনোভাব দেখিয়েছেন বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এর আগে পাহাড়ে দিলীপ ঘোষকে নিগ্রহের ঘটনায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন মুকুল রায়। এদিন মুকুল রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে দিলীপ ঘোষ বলেছেন, উনি যা সঠিক বুঝেছেন তাই বলেছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement