আগামী দুমাস দেশজুড়ে লাগাতার
আন্দোলনের পথে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা

আগামী দুমাস দেশজুড়ে লাগাতার<br>আন্দোলনের পথে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা
+

কলকাতা, ২২শে নভেম্বর— বাজেটে আই সি ডি এস, মিড ডে মিলসহ প্রতিটি প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে ডিসেম্বরজুড়ে দেশের প্রতিটি সাংসদের কাছে ডেপুটেশন দেবেন আই সি ডি এস-সহ অন্যান্য প্রকল্প কর্মীরা। জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দেশব্যাপী একদিনের ধর্মঘটে অংশ নেবেন প্রকল্প কর্মীরা। পয়লা ফেব্রুয়ারি বাজেটে আই সি ডি এস খাতে বরাদ্দ না বাড়লে ২রা ফেব্রুয়ারি দেশের প্রতিটি প্রান্তে রাস্তার দখল নেবেন আই সি ডি এস কর্মীরা। বুধবার রানি রাসমণি রোডে আই সি ডি এস কর্মী ও সহায়িকাদের রাজ্য সমাবেশে একথা ঘোষণা করেন ‘অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন অব অঙ্গনওয়াড়ি ওয়ার্কার্স অ্যান্ড হেল্পার্স (এ আই এফ এ ডব্লিউ এইচ)-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদিকা এ আর সিন্ধু। 
অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ন্যূনতম ১৮হাজার টাকা বেতন, আই সি ডি এস কর্মীদের ‘শ্রমিক’-র মর্যাদা এবং অবসরকালীন ভাতার দাবিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য আই সি ডি এস কর্মী সমিতির ডাকে ধরনা, বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠিত হয় রানি রাসমণি রোডে। বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী অংশ নেন সমাবেশে। এদিনের সমাবেশে এ আর সিন্ধু বলেন, কেন্দ্রের মোদী সরকার আই সি ডি এস প্রকল্পকে ধ্বংস করতে চাইছে। দেশের সবচেয়ে গরিব, সবচেয়ে প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা পড়তে আসে আই সি ডি এস সেন্টারে। দেশের আট কোটি শিশু এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত, কতটা অমানবিক হলে সরকার আই সি ডি এস প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ কমায়। প্রতিদিন কমানো হচ্ছে প্রকল্পে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ। চেষ্টা চলছে রান্না করা খাবারের পরিবর্তে প্যাকেট খাবার দেওয়ার। কর্পোরেট প্যাকেটজাত খাদ্যনির্মাতাদের গরিব শিশুদের সামান্য খাবার নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিতে চাইছে কেন্দ্র। খাবার তুলে দিয়ে আই সি ডি এস প্রকল্পকে আধারের সঙ্গে যুক্ত করে সরাসরি টাকা হস্তান্তরের নামে এই প্রকল্পকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। আই সি ডি এস প্রকল্পকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দিয়ে কর্মী ও সহায়িকাদের ছাঁটাই করতে চাইছে সরকার। গরিব মা-শিশুর স্বার্থে এই প্রকল্পকে বাঁচানোর জন্য দেশজুড়েই রাস্তায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা। 
সিন্ধু বলেন, লড়াইয়ের মাধ্যমেই গত তিন বছরে ষোলোটি রাজ্যে কর্মী ও সহায়িকাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি আদায় করা সম্ভব হয়েছে। কদিন আগে বেঙ্গালুরু শহর দেখেছিল লালঝান্ডা হাতে হাজার হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মিছিল। লড়াই করেই কর্ণাটকে আই সি ডি এস প্রকল্প কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি করা গেছে। এ রাজ্যে মমতা সরকারের বিরুদ্ধেও আন্দোলন তীব্র করে ভাতা বৃদ্ধি করতে হবে। এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের সময় কর্মী ও সহায়িকাদের ভাতা বৃদ্ধির পর তৃণমূল সরকার ছবছরে মাত্র পাঁচশো টাকা ভাতা বাড়িয়েছে। মোদী ও মমতা দুই সরকারের বিরুদ্ধেই দাবি আদায়ের লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকবে বাংলা। 
এদিনের সমাবেশে সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনাদি সাহু বলেন, ২০১৭ সালের সদ্য প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার ইনডেক্স’ অনুযায়ী ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান তালিকার ১০০ নম্বরে। বর্মা, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার থেকেও নিচে। তবু এদেশে গরিব মা ও শিশুদের যতটুকু পুষ্টিকর খাবার পায় এই প্রকল্পে তা ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রের মোদী সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের নয়া ফরমানে আদ্যন্ত প্রকল্পটাই লাটে ওঠার জোগাড়। ঠিক যেভাবে গোটা দেশে ছড়িয়ে থাকা গণবণ্টন ব্যবস্থা ভাঙার হাজারো চেষ্টা চালানো শুরু হয়েছে। এ রাজ্যে তৃণমূল সরকারও একই কায়দায় আই সি ডি এস প্রকল্পগুলিতে আক্রমণ চালাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী কবিতা, গান, লিখলেও গরিব ঘরের শিশুরা যাতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে এসে ছবি আঁকা শিখতে পারে, কবিতা পড়া শিখতে পারে তা তিনি চান না। দাবি আদায় করতে হলে প্রয়োজনে একদিন বা দুদিন নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত দাবি আদায় হচ্ছে রাস্তায় ধরনা চালিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি নিতে হবে। 
সমাবেশে সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদিকা রত্না দত্ত বলেন, বর্তমানে এরাজ্যে আড়াই লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা এরাজ্যে ১লক্ষ ২০হাজার আই সি ডি এস কেন্দ্রে কাজ করেন। ‘কর্মচারী’ হিসাবে স্বীকৃতি পর্যন্ত নেই। বাজারে প্রতিদিন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে। শিশুদের মুখে সামান্য ডিম ভাত তুলে দিতেও নাজেহাল হচ্ছেন কর্মীরা। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সহায়িকারাও মা, তাই ডিমের দাম বাড়লেও কখনো নিজেদের খরচেই সন্তানতুল্য শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তাঁরা। অথচ তাঁরা ভাতা পান যৎসামান্য। এ রাজ্যের সরকারকে বার বার দাবি জানানো সত্ত্বেও মাত্র পাঁচশো টাকা ভাতা বাড়ানো হয়েছে, যা অপমানের শামিল। প্রয়োজনে এরাজ্যের কর্মী-সহায়িকারা ধর্মঘটের পথে যেতে বাধ্য হবেন।
এদিনের সমাবেশে ‘এ আই এফ এ ডব্লিউ এইচ’-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী উষা রানি তাঁর নিজের রাজ্য পাঞ্জাবের উদাহরণ দিয়ে বলেন সরকার এত নির্মম, পাঞ্জাবে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠি চালায় পুলিশ। আন্দোলনরত অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামানও ব্যবহার করে। তিনি নিজেও গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন, তবু লড়াই থেকে সরে আসেননি। তিনি বলেন, বাংলায় আই সি ডি এস প্রকল্প রক্ষা করতে গিয়ে কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তবু লড়াই করছেন। বাংলার লড়াইয়ের পাশে সংহতি জানিয়ে আছে গোটা দেশের সংগঠন। এছাড়াও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আই সি ডি এস আন্দোলনের প্রবীণ নেত্রী নীলিমা মৈত্র, মলিনা ঘোষ প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের রাজ্য সভানেত্রী মনীষা চক্রবর্তী।
এদিন সমাবেশের পর দাবিদাওবা সংবলিত স্মারকলিপি রাজ্যপালের কাছে দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলে ছিলেন রত্না দত্ত, নীলিমা মৈত্র, মলিনা ঘোষ, মণীষা চক্রবর্তী, দীপালি মাইতি, পার্বতী মাহাতো, মিতা ঘোষ, খুকু দত্ত ও মাসুদ আলি। 

Featured Posts

Advertisement