কমরেড সুকোমল
সেনের জীবনাবসান 

কমরেড সুকোমল<br>সেনের জীবনাবসান 
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ২২শে নভেম্বর- দেশের মধ্যবিত্ত কর্মচারী আন্দোলনের অগ্রগণ্য নেতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, প্রাবন্ধিক কমরেড সুকোমল সেনের বুধবার জীবনাবসান হয়েছে। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান এবং পদাধিকারবলে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি ছিলেন সারা ভারত রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন-এর প্রতিষ্ঠাকালীন শীর্ষ নেতা, দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান। সি আই টি ইউ-র প্রাক্তন সহ-সভাপতি ও বর্তমানে জাতীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থায়ী আমন্ত্রিত, প্রাক্তন সাংসদ এই নেতার মৃত্যুতে দেশের শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মঙ্গলবার তাঁর শারীরিক অবস্থার আচমকা অবনতি হলে তাঁকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকাল ১০টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে সি পি আই (এম) নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনের বর্তমান নেতৃত্ব হাসপাতালে যান। তিনি স্ত্রী, দুই পু্ত্রকে রেখে গেছেন। 
সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো এদিন এক শোকবার্তায় বলেছে, কমরেড সুকোমল সেন ছিলেন একজন দায়বদ্ধ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের একজন অসামান্য নেতা। তাঁর লেখা ‘ওয়ার্কিং ক্লাস অব ইন্ডিয়া: হিস্টরি অব ইমার্জেন্স অ্যান্ড মুভমেন্ট’ বইটি ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসাবে চিহ্নিত হয়। পলিট ব্যুরো এই নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট নেতার জীবনাবসানে গভীর শোক জ্ঞাপন করছে এবং তাঁর স্ত্রী ও পুত্রদের প্রতি আন্তরিক শোক জানাচ্ছে। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু ও সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র কমরেড সুকোমল সেনের জীবনাবসানে গভীর শোক জানিয়েছেন। সি আই টি ইউ কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলীর পক্ষে সাধারণ সম্পাদক তপন সেন এদিন এক শোকবার্তায় বলেছেন, দেশের শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনের অনন্যসাধারণ নেতা কমরেড সুকোমল সেন শ্রমিকশ্রেণি ও কর্মচারী আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা আক্রমণকে প্রতিহত করতে মতাদর্শগতভাবে এবং সাংগঠনিক ক্ষেত্রে, উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ করে গেছেন। সি পি আই (এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি এদিন এক শোকবার্তায় বলেছেন, জম্মু ও কাশ্মীরের কর্মচারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কমরেড সুকোমল সেনের পরামর্শ ও সাহায্য আমরা সবসময় পেয়েছি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা হায়দার আকবর খান রণো কমরেড সুকোমল সেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এদিন কমরেড সেনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে প্রথমে সি আই টি ইউ-র রাজ্য দপ্তর শ্রমিক ভবনে আনা হয়। সেখানে মরদেহে সি আই টি ইউ-র পতাকা দিয়ে মাল্যদান করেন সি আই টি ইউ নেতা শ্যামল চক্রবর্তী, দীপক দাশগুপ্ত, সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনাদি সাহু, এ আর সিন্ধু, উষারানি, প্রশান্ত নন্দীচৌধুরি, রাজদেও গোয়ালা, দেবাঞ্জন চক্রবর্তীসহ নেতৃবৃন্দ। সেখান থেকে প্রয়াত নেতার মরদেহ আনা হয় সি পি আই (এম) রাজ্যদপ্তরে। সেখানে মরদেহ রক্তপতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করে সম্মান জানান পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য বিমান বসু ও সূর্য মিশ্র। মাল্যদান করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন সি পি আই (এম) নেতা মদন ঘোষ, নৃপেন চৌধুরি, রামচন্দ্র ডোম, মৃদুল দে, রেখা গোস্বামী, মিনতি ঘোষ, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, রবীন দেব, দীপক সরকার, অমিয় পাত্র-সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়া পার্টির রাজ্য দপ্তরে এসে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষে কমরেড সেনের দেহ নিয়ে যাওয়া বাড়ির পথে। সন্তোষপুরে তাঁর বাড়িতে শ্রদ্ধা জানান স্ত্রী রমা সেন, ছোটো ছেলে অর্ণব সেন, তাঁর দুই ভাই সুবিমল সেন ও সুনির্মল সেন-সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সেখান থেকে পার্টির সন্তোষপুর এরিয়া সাংগঠনিক কমিটির দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। 
এরপর আনা হয় রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কো-অর্ডিনেশন কমিটির দপ্তর কর্মচারী ভবনে। সেখানে তাঁর মরদেহে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠন সমূহের কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভাপতি অসিত ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক বিজয়শংকর সিংহ, বিশ্বজিৎ গুপ্তচৌধুরি, প্রণব চ্যাটার্জি, মনোজকান্তি গুহ, ত্রিপুরার রাজ্য সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের নেত্রী মহুয়া রায়সহ অন্যান্য কর্মচারী আন্দোলনের নেতৃত্ব। শ্রদ্ধা জানান অল ইন্ডিয়া পিয়ারলেস এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গৌতম চ্যাটার্জি। এই সংগঠনের ১৯৯৮ সাল থেকে সভাপতি ছিলেন কমরেড সুকোমল সেন। কর্মচারী ভবন থেকে এন আর এস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দেহ। সেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির স্বার্থে তাঁর দেহ দান করা হয়। 
সংক্ষিপ্ত জীবনী: কমরেড সুকোমল সেনের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৪ই জুন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। পরে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে তিনিও কলকাতায় চলে আসেন। তাঁরা ছিলেন চার ভাই। সুকোমল সেন এন্টালি আকাদেমি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। স্নাতক হওয়ার পরই তিনি রাজ্য সরকারি কর্মচারী হিসাবে কাজে যোগ দেন এবং কর্মচারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কো-অর্ডিনেশন কমিটি এবং পরে সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের সর্বভারতীয় নেতা হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে সারা ভারত রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন-এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তিনি ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম নেতা। পরে ১৯৮২ সালে তিনি এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই সংগঠনের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান। সারা দেশে রাজ্য সরকারি কর্মচারী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অবিসংবাদী নেতা। 
শুধু কর্মচারী আন্দোলনই নয়, সামগ্রিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে তিনি নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘদিন তিনি সি আই টি ইউ-র সর্বভারতীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন এবং ২০১০সালে চণ্ডীগড় সম্মেলনে সি আই টি ইউ-র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬সালে পুরী সম্মেলনে তিনি জাতীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থায়ী আমন্ত্রিত সদস্য হিসাবে যুক্ত হন। আমৃত্যু তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও তিনি অবদান রেখে গেছেন। ১৯৮২সালে প্রাগে ট্রেড ইউনিয়ন ইন্টারন্যাশনাল অব পাবলিক অ্যান্ড অ্যালায়েড সার্ভিস এমপ্লয়িজ-এর সম্মেলনে এর ডাইরেক্টিভ কমিটির সদস্য হন তিনি। ১৯৯৬সালে তিনি এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। 
১৯৫২ সালে তিনি সি পি আই (এম)-র সদস্য হন। তিনি দীর্ঘদিন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮২সালে তিনি সি পি আই (এম)-র পক্ষ থেকে রাজ্যসভার সদস্য হন। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি সাংসদ ছিলেন। সংসদে শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। 
মতাদর্শগত ক্ষেত্রে তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল অনন্যসাধারণ। সারা জীবন তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে এর তত্ত্বগত চর্চা করে গেছেন। তাঁর লেখা ‘ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস’; ‘মে ডে অ্যান্ড এইট আওয়ারস্‌ স্ট্রাগল ইন ইন্ডিয়া’; ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো অ্যান্ড থিওরি অব রেভলিউশন’ ইত্যাদি আকর গ্রন্থ দেশের শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনে সমাদৃত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক-‌রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন। সম্প্রতি নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উপলক্ষে ১৯১৭সালে বিপ্লবের পর থেকে ১৯৯১ সালে বিপর্যয় পর্যন্ত দুই খণ্ডে তাঁর লেখা একটি অনবদ্য বই প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। 

Featured Posts

Advertisement