কমরেড শিশির সেনের জীবনাবসান 

কমরেড শিশির সেনের জীবনাবসান 
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ২২শে নভেম্বর — গণনাট্য আন্দোলনের পুরোধা, বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠক এবং সি পি আই (এম) নেতা কমরেড শিশির সেন প্রয়াত হয়েছেন। বুধবার রাত ৯টা ১৫মিনিটে খিদিরপুরের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেশ কিছুদিন ধরেই শারীরিক নানা সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন কমরেড শিশির সেন। গত প্রায় দেড় মাস ধরে বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। প্রয়াত কমরেডের বয়স হয়েছিল ৮৬।
বুধবার রাতে কমরেড শিশির সেনের জীবনাবসানের খবর পেয়ে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সদস্য বিমান বসু ও পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। এদিন কমরেড শিশির সেনের প্রয়াণে শোকাহত হয়েছেন গণনাট্য সঙ্ঘের রাজ্য নেতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নানা আঙিনার সংগঠকরা। গভীর শোক জ্ঞাপন করেছেন গণনাট্য সঙ্ঘের রাজ্য সম্পাদক গোরা ঘোষ। তিনি এদিন এক শোকবার্তায় বলেন, গভীর অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল কমরেড শিশির সেনের। গণনাট্য সংগঠন পুনর্গঠিত হওয়ার পর শিশির সেন ছিলেন সঙ্ঘের প্রাণপুরুষ। শোক জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের রাজ্য নেতৃত্ব পার্থ রাহা ও রজত বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুধবার রাতে প্রয়াত কমরেডের মরদেহ থাকছে খিদিরপুরের বেসরকারি নার্সিংহোমে। বৃহস্পতিবার সকালে নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে প্রথমে কমরেড শিশির সেনের বাসভবনে (১০১-সি/১ সেলিমপুর রোড) নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর মরদেহ। এরপর প্রয়াত কমরেডের মরদেহ নিয়ে আসা হবে সি পি আই (এম) কলকাতা জেলাদপ্তর প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত প্রয়াত কমরেডের মরদেহ থাকবে পার্টির জেলাদপ্তরে। এরপর ১২টার সময় সি পি আই (এম) রাজ্য দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর মরদেহ। পার্টি নেতৃত্বের শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ৮০নম্বর এ জে সি বোস রোডে গণনাট্য সঙ্ঘের রাজ্য দপ্তরে। এখানেই এক ঘণ্টা শায়িত থাকবে কমরেড শিশির সেনের মরদেহ। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী-সংগঠকরা প্রিয় সংগঠকের প্রতি ফুল-মালায় শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর কেওড়াতলা শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। 
১৯৩১সালে পূর্ববঙ্গের যশোহর জেলায় নড়াইলে কমরেড শিশির সেনের জন্ম। ছোটবেলাতেই এই বাংলায় চলে আসার পর কলকাতায় সাউথ সুবার্বন স্কুলে পড়াশুনা করার পর আশুতোষ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে এই আশুতোষ কলেজেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষাকর্মী হিসেবে। পরবর্তী সময়ে স্টেট ওয়্যার হাউজিং কর্পোরেশনে তিনি চাকরি করেন দীর্ঘদিন। সেখান থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন। পরিবারেই বড়দাদা নারায়ণ সেনের হাত ধরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ১৯৬৬সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সদস্যপদ অর্জন করেন কমরেড শিশির সেন। ১৯৭৮সালে পার্টির কলকাতা জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৫ সাল থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কলকাতা জেলার অন্তর্ভুক্ত ১নং সাংস্কৃতিক আঞ্চলিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 
১৯৫০সালে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সাউথ স্কোয়াডে যোগদান করেন কমরেড শিশির সেন। সাউথ স্কোয়াড ভেঙে যাওয়ার পর প্রান্তিক শাখা গড়ে তোলেন তিনি। গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় ও বীরু মুখোপাধ্যায়দের সঙ্গে থেকেই এই প্রান্তিক শাখায় তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭সালে বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত গণনাট্য সঙ্ঘের তৃতীয় রাজ্য সম্মেলনে তিনি রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৭সাল থেকে ২০১২সাল পর্যন্ত গণনাট্য সঙ্ঘের রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কমরেড শিশির সেন। ২০১২সালে হুগলী জেলার হরিপালে সংগঠনের চতুর্দশ রাজ্য সম্মেলনে তিনি রাজ্য সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন গণনাট্য সঙ্ঘের রাজ্য কমিটির সদস্য।
প্রান্তিক শাখায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সময়েই ‘রাহুমুক্ত’, ‘২০শে জুন’, ‘বনফুলের বিদ্যাসাগর’, ‘নীলদর্পণ’, ‘সংক্রান্তি’, ‘নৌকাডুবি’, ‘মুক্তির উপায়’, ‘অন্নপূর্ণার দেশে’ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেন। ‘লং মার্চে’ সূত্রধরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কমরেড শিশির সেন। ‘নীলদর্পণ’ নাটকে গঙ্গাপদ বসুর পরিবর্ত হিসেবে গুপি দেওয়ানির ভূমিকায় অসামান্য অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় অভিনয় করেন ও পরিচালনা করেন। অসংখ্য পোস্টার নাটকে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়াও ‘হারানের নাতজামাই’, ‘মহানায়ক’ (যাত্রা), ‘দর্পণে নীলদর্পণ’ ‘আলোর ঠিকানা’, পল্লীসমাজ’ (যাত্রা), ‘মাদারিকা খেল’, ‘বুনো হাঁস’ ইত্যাদি নাটকগুলিতে পরিচালনা করেন তিনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে ‘হারানের নাতজামাই’-সহ বেশকিছু নাটক রচনা করেছিলেন কমরেড শিশির সেন। গণনাট্য পত্রিকায় স্তানিসলাভস্কি-র ‘অ্যান অ্যাক্টর প্রিপেয়ার্স’-র অনুবাদ এবং লাজোস এগরির নাটকীয় রচনার অনুবাদ করেছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ লেখক শিল্পী কলাকুশলী সম্মিলনী, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ ও পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী ও লোকশিল্পী সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন কমরেড শিশির সেন। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি, চলচ্চিত্র বিষয়ক কমিটি, রাজ্য সংস্কৃতি দপ্তরের উপদেষ্টা, লোকশিল্পী পর্ষদের সদস্য, নন্দন এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট-এর আমন্ত্রণে মস্কোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন কমরেড শিশির সেন।

Featured Posts

Advertisement