বখরার বিবাদেই খুন
ভদ্রেশ্বরের পৌরপ্রধান? 

বখরার বিবাদেই খুন<br>ভদ্রেশ্বরের পৌরপ্রধান? 
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: ভদ্রেশ্বর, ২২শে নভেম্বর- তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর তোলাবাজির বখরার বিবাদের জন্যই কি খুন হতে হলো ভদ্রেশ্বর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতা মনোজ উপাধ্যায়কে? 
মঙ্গলবার রাতে দুষ্কৃতীদের গুলিতে মনোজ উপাধ্যায়ের খুনের পর এ প্রশ্নই উঠছে ভদ্রেশ্বর তেলিনিপাড়া শিল্পাঞ্চল জুড়ে। 
মঙ্গলবার রাত ১১টা কুড়ি নাগাদ ভদ্রেশ্বরে জি টি রোডের উপর রবীন্দ্রনগরের কাছে একটি বেসরকারি হাসপাতালের অদূরেই দুষ্কৃতীদের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ছোঁড়া গুলিতে নিহত হন মনোজ উপাধ্যায় (৪৮)। বাড়ির কাছে তাঁরই ক্লাব জয় ভারত সংঘে রোজ রাতে আড্ডা মারতে যেতেন তিনি। ফিরছিলেন মোটর সাইকেলে, চালাচ্ছিলেন তৃণমূল কর্মী চিন্টু দুবে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জি টি রোডের পাশেই একটি দোকানের পাঁচিলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল জনা পনেরো দুষ্কৃতী। খুব কাছ থেকে পর পর গুলি করা হয় তাঁকে। বুকে ও পেটে একাধিক গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন মনোজ উপাধ্যায়। গুলির শব্দে স্থানীয় তৃণমূলকর্মীরা ছুটে আসেন। তড়িঘড়ি করে রক্তাক্ত মনোজ উপাধ্যায়কে চন্দননগর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার রাত থেকেই চন্দননগর হাসপাতালে ভিড় বাড়তে থাকে তৃণমূল কর্মীদের। তৃণমূলের শাসনেই বাড়ির কাছে পৌরপ্রধান যেভাবে খুন হয়েছেন তাতে হতবাক হয়ে যান দলীয় কর্মীরা। রাতেই হাসপাতালে আসেন তৃণমূল নেতা ও মন্ত্রী তপন দাশগুপ্ত, চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার পীযূষ পান্ডে। 
বুধবার সকাল থেকে কার্যত বনধের চেহারা নেয় ভদ্রেশ্বর মানকুণ্ডু তেলিনিপাড়া এলাকা। গোটা এলাকায় দোকানপাট ছিল বন্ধ। সকালে চুঁচুড়া হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর নিহত মনোজ উপাধ্যায়ের দেহ ভদ্রেশ্বর গেটবাজার এলাকায় নিয়ে আসা হলে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল কর্মীরা। পৌরপ্রধানকেই যদি খুন হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়, এ প্রশ্ন তুলেছেন উত্তেজিত তৃণমূল কর্মীরাই। 
এলাকায় পুকুর বুজিয়ে আবাসন, সিন্ডিকেট রাজ, মাফিয়া চক্রের অন্তর্দ্বন্দ্বেই কি খুন হতে হলো পৌরপ্রধানকে? প্রশ্ন উঠেছে পর পর গুলি চললেও তাঁর মোটর সাইকেলের চালক তৃণমূলের কর্মী চিন্টু দুবে অক্ষত রইলেন কীভাবে? প্রশ্ন উঠেছে পর পর গুলি চালিয়েও থানা ও তৃণমূল কার্যালয় থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্ব থেকে কীভাবে পালাতে পারলো দুষ্কৃতীরা?
স্থানীয় সূত্রের খবর, এলাকায় কতগুলি পুকুর ভরাট নিয়ে শাসক দলের মধ্যে চলছিল বখরা নিয়ে ঝগড়া। ‘পৌরপ্রধান হিসাবে এলাকায় দুষ্কৃতীরাজ রুখে দিতে উদ্যমী হওয়ার জন্যই খুন হতে হল তাঁকে’— মঙ্গলবার রাত ও বুধবার সারা দিনে হুগলীর তৃণমূল নেতা তপন দাশগুপ্ত এমন কথা বললেও পালটা প্রশ্ন উঠছে মনোজ উপাধ্যায়ের দুষ্কৃতী যোগ নিয়েও। ২০০৩ সালে এই এলাকায় মহেশ সাউ নামে এক ব্যক্তির খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন মনোজ উপাধ্যায়, খুনের মামলায় তিন মাস জেলও খাটতে হয় তাঁকে। ২০০৫ সালে জেল থেকেই পৌরভোটে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ২০১০ সালে ১৬নং ওয়ার্ড থেকে জিতে উপ পৌরপ্রধান ও ২০১৫ সালে একই ওয়ার্ড থেকে জিতে তিনি পৌরপ্রধান হন। মনোজ উপাধ্যায়ের পুরানো শত্রুতার জেরেও তিনি খুন হতে পারেন এমনটাও মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 
এদিন ভদ্রেশ্বরে পরিস্থিতি সামাল দিতে আসেন রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। তিনি অবশ্য নাম না করে ইঙ্গিত দিয়েছেন বি জে পি এবং সি পি আই (এম) এই খুনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ অবশ্য খুনের মামলায় এলাকার দাগি ৬ দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করেছে। এফ আই আর-এ নাম আছে রাজু চৌধুরি, রতন চৌধুরি, আকাশ চৌধুরি, রাজেশ চৌধুরি, প্রভু চৌধুরি ও মুন্না রায়ের। মুন্না রায়কে এদিন পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং আকাশ, রাজেশ ও প্রভুকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার পীযূষ পান্ডে বলেছেন ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে দুষ্কৃতীরাই খুন করেছে, পুরানো শত্রুতার জেরেও খুন হতে পারেন তিনি। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ও কয়েকজনকে আটক করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত চলার পর বোঝা যাবে কী উদ্দেশ্যে খুন করা হয়েছে মনোজ উপাধ্যায়কে’। 
সি পি আই (এম) হুগলী জেলা সম্পাদক সুদর্শন রায়চৌধুরি বলেছেন, ‘সামগ্রিকভাবে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা। হুগলী জেলা জুড়েই দুষ্কৃতীদের রমরমা। গত দশ মাসে হুগলী-চুঁচুড়া অঞ্চল জুড়ে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটেছে, কমিশনারেট গঠিত হওয়ার পর আইন শৃঙ্খলার আরো অবনতি হয়েছে। আমরা এই খুনের ঘটনার প্রকৃত তদন্ত দাবি করছি , অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছি’।

Featured Posts

Advertisement