গ্রেপ্তার না করা
নিয়ে পুলিশ চুপ,
আজ খুলছে স্কুল

জি ডি বিড়লায় অপসারিত প্রিন্সিপাল

গ্রেপ্তার না করা<br> নিয়ে পুলিশ চুপ,<br>আজ খুলছে স্কুল
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ৬ই ডিসেম্বর— অভিভাবকদের বিক্ষোভে চিড় ধরিয়েও লাভ হলো না। টানা ছয় দিন স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনড় মনোভাব ধরে রেখে দাবি আদায় করলেন জি ডি বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশন-এ বিক্ষোভরত অভিভাবকরা। সরানো হলো স্কুলের প্রিন্সিপাল শর্মিলা নাথকে। বৃহস্পতিবার জি ডি বিড়লা স্কুলের সেকেন্ডারি সেকশন বা প্রাথমিক-পরবর্তী বিভাগের পঠনপাঠন শুরু হচ্ছে। শুক্রবার শুরু হবে প্রাইমারি সেকশন বা প্রাথমিক বিভাগের পঠনপাঠন। স্কুল পরিচালনার দায়িত্বে এখন থাকবেন ভাইস প্রিন্সিপাল।
স্কুলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লড়ে এইটুকুই আদায় করা গিয়েছে। তবে প্রিন্সিপালকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো কি না, তা নিয়ে ধন্দ রয়ে গেলো অভিভাবক ফোরামের লিখিত প্রস্তাবনায়। পুলিশ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অভিভাবকদের রাত পর্যন্ত বৈঠক চললেও প্রিন্সিপালকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হলো, না কি ওই পদ থেকে সাময়িকভাবে তাঁকে অপসারিত করা হলো, তা পরিষ্কার হয়নি। প্রিন্সিপাল অপসারিত হলেও অভিভাবকরা প্রিন্সিপালকে গ্রেপ্তার করার যে দাবি তুলেছেন, তাও আপাতত মুলতুবি থাকলো। অভিভাবকদের একাংশের মতে, পুলিশ প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেদের কাজ হাসিল করে নিলো জি ডি বিড়লার কর্তৃপক্ষ।     
মুখ্যমন্ত্রী ‘স্কুল বন্ধ হবে না’ বলে ঘোষণা করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জি ডি বিড়লা স্কুলের অচলাবস্থা দূর হওয়ায় একপ্রকার স্বস্তিতে কলকাতা পুলিশ। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন গোয়েন্দা প্রধান বিশাল গর্গ। নজরুল মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্কুল খোলার সঙ্গে শিক্ষিকাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘সবাই তো দোষী নয়, দুই-একজন হতে পারে। শিক্ষকরা আমাদের অভিভাবক। তাই তাঁদের আরও দায়িত্ব নিতে হবে।’’
পুলিশের কাছে এই বার্তা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই মঙ্গলবার রাতে তদন্তের দিক পালটে দেয় কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। বুধবার সকালে জি ডি বিড়লার প্রিন্সিপাল শর্মিষ্ঠা নাথকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। ফোন করেই তাঁকে এদিন লালবাজারে আসতে না করা হয়। সেই সঙ্গে তদন্ত চলছে বোঝাতে আচমকা ডেকে পাঠানো হয় নির্যাতিতা শিশুর ক্লাস টিচার, লেডি অ্যাটেনডেন্ট এবং দুই নিরাপত্তারক্ষীকে। তাঁদের আবার ডাকা হবে বলে জানালেও কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান বিশাল গর্গ জানাননি, কী কারণে প্রিন্সিপালকে গ্রেপ্তার করা হলো না। যাঁর বিরুদ্ধে এর মধ্যেই যাদবপুর থানায় প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, তথ্য-প্রমাণ লোপাট এবং যৌন নির্যাতনের খবর চাপার অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে কী করে পুলিশ অব্যাহতি দেয়, সেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রসঙ্গত, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক সূত্রে জানা গিয়েছে, লেডি অ্যাটেনডেন্টের সামনে বসিয়ে বুধবার  প্রিন্সিপালকে জেরা করার পরিকল্পনা ছিল। কারণ, লেডি অ্যাটেনডেন্ট নির্যাতিতা শিশুটিকে যৌন নিগ্রহের কথা প্রিন্সিপালকে জানানোর পরেও তিনি কোনও ব্যবস্থা নেননি।  
এদিকে, পূর্ব ঘোষণা মতোই বুধবার বিকালে রানিকুঠীর জি ডি বিড়লা স্কুলে একে একে হাজির হন জুনিয়র ও সিনিয়র সেকশনের ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা। এঁদের মধ্যে আটজনের একটি প্রতিনিধিদল স্কুলের ভিতরে গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে বৈঠক বসে। সওয়া পাঁচটা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। কিন্তু বৈঠকের সময় যত এগিয়েছে, ততই স্কুলের বাইরে অভিভাবকদের মধ্যে মত পার্থক্য গড়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে। অভিভাবকরা সকলেই চাইছিলেন, বৃহস্পতিবারই স্কুল খুলুক। তবে অভিভাবক ফোরামের মূল অংশের দাবি ছিল, প্রিন্সিপালকে অপসারণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার করার পরেই স্কুল খোলা হোক। কিন্তু বাকি অংশের অভিভাবকদের বক্তব্য ছিল, মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত করছে, তাঁকে অপসারণ করতেই স্কুল কর্তৃপক্ষ সময় চাইছে। এই অবস্থায় বিক্ষোভের জন্য স্কুল টানা বন্ধ থাকতে পারে না। 
অনেক অভিভাবক আবার জানান, প্রয়োজনে জুনিয়র সেকশনকে বন্ধ রেখে সিনিয়র সেকশন চালু করা হোক। কারণ, অনেক ছাত্রছাত্রী বোর্ডের পরীক্ষায় বসবে। অনেকে স্কুলের পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারছে না। কার্যত এদিন সুপরিকল্পিতভাবে অভিভাবকদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেওয়া হয়। পুলিশ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অভিভাবক ফোরামের বৈঠকে যখন প্রিন্সিপালকে অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে রীতি মতো বচসা চলছে, তখন আচমকা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের একাংশকে সামনে নিয়ে আসা হয়। তাঁরা বৃহস্পতিবার স্কুল খোলার পক্ষে কথা বলতে শুরু করে। কিছু অভিভাবক আবার চিৎকার করে বলতে থাকেন, অভিভাবক ফোরামের যে আটজন স্কুল কর্তৃপক্ষ আর পুলিশের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, তাঁরা অভিভাবকদের কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। তাঁদের বক্তব্যের কী দাম থাকতে পারে? বিকালের বৈঠকের শুরুতেই বৃহস্পতিবার স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও প্রিন্সিপালকে সরানো নিয়েই এদিন রাত পর্যন্ত বৈঠক দীর্ঘায়িত হয়েছে। যখন স্কুলের বাইরে অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে যায়, তখন অভিভাবক ফোরামের তরফে বিষয়টিকে একটু সরল করার চেষ্টা হয়। মাইকে ফোরামের সদস্যরা জানাতে থাকেন, এদিনের বৈঠকের প্রধান ‘অ্যাজেন্ডা’ দ্রুত স্কুল খোলার ব্যবস্থা করা। প্রিন্সিপালকে গ্রেপ্তার ও অপসারণের কথাটি কৌশলগতভাবে বৈঠকে তোলা হয়েছে বলে ফোরাম সদস্যদের একজন ঘোষণা করতেই বাকি কাজটি করে দেয় কলকাতা পুলিশ। 
ভিতরে যখন প্রিন্সিপালকে অপসারণ আর গ্রেপ্তার করা নিয়ে বৈঠক উত্তাল, তখন কলকাতা পুলিশের তরফে অপসারণের উপরেই জোর দেওয়া হয়। অচলাবস্থা কাটাতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে সব রকমের সাহায্যের আশ্বাস মঙ্গলবারেই পুলিশ কমিশনার দিয়ে রেখেছিলেন। পুলিশের উপর ভরসা রাখা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ ছিল না স্কুল কর্তৃপক্ষের সামনে। কলকাতা পুলিশের উপর এই ভরসার কথা অবশ্য দিনের শুরুতেই জানিয়ে রেখেছিলেন বিড়লা স্কুলের মুখপাত্র সুভাষ মোহান্তি। তিনি প্রকাশ্যেই এদিন জানিয়েছিলেন, স্কুল কবে খুলবে, তা পুলিশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। প্রিন্সিপালকে অপসারণের সঙ্গে স্কুল খোলাকে যুক্ত করে এদিন সমঝোতা করা হয়েছে কিনা, তা অবশ্য জানা যায়নি।
অন্যদিকে, অভিভাবকদের ক্ষোভ মিটিয়ে বুধবার সকালে চালু হয়ে গেলো বেহালার এম পি বিড়লা স্কুল। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেক বহিরাগত রয়েছে বলে অভিভাবকদের একাংশের দাবি মেটাতে পুলিশ তদন্তও শুরু করলো। তদন্তের স্বার্থে পুলিশের হাতে সিসিটিভি ফুটেজ তুলে দেওয়া হবে বলে এদিন জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে অভিভাবকদের দাবি মেনে স্কুলে ‘গণেশ’ নামে কোনও কর্মী নেই বলে লিখিত দিতে চাননি স্কুলের জেনারেল ম্যানেজার সুরিন্দর সিং।
ছাত্রী নিগ্রহের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মনোজ মান্নাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর অভিভাবকরা দাবি করেছিলেন, অভিযুক্ত ‘গণেশ’ যে স্কুলের কর্মী নয়, তা লিখিতভাবে দিতে হবে স্কুল কর্তৃপক্ষকে। মঙ্গলবার মৌখিকভাবে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি হলেও বুধবার বেঁকে বসে কর্তৃপক্ষ। এদিন কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, লিখিত কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। তবু ছাত্রীদের পঠনপাঠনের কথা ভেবে এদিন বেহালার এম পি বিড়লায় স্বাভাবিক ক্লাস হয়েছে। নার্সারি থেকে সিনিয়র সব বিভাগে ক্লাস করতে  হাজির হয়েছিল ছাত্রছাত্রীরা।
স্কুলে এদিন সকাল থেকে নতুন করে কোনও বিক্ষোভ হয়নি। 

Featured Posts

Advertisement