জনস্রোতে হুঁশিয়ারি
দাঙ্গাবাজদের

জনস্রোতে হুঁশিয়ারি<br>দাঙ্গাবাজদের
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ৬ই ডিসেম্বর — সঙ্ঘ পরিবার মন্দির মসজিদ নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির যতো চেষ্টাই করুক না কেন, লালঝান্ডা হাতে বামপন্থীরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা করলেন বামপন্থী নেতৃবৃন্দ। বুধবার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫তম বার্ষিকীতে কলকাতায় ‘কালা দিবস’ পালন করে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সম্প্রীতির ঐতিহ্য থাকলেও এখন পশ্চিমবঙ্গও সাম্প্রদায়িকতার বিপদ থেকে মুক্ত নয়। এরাজ্যের শাসকদল কেন্দ্রের শাসকদলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি চালাচ্ছে। মানুষকে এই সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক করে তোলার দায়িত্ব বামপন্থীদেরই পালন করতে হবে।
৬টি বামপন্থী দলের দেশব্যাপী ‘কালা দিবস’ পালনের কর্মসূচিতে এদিন কলকাতায় বামফ্রন্ট ও সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলি যৌথভাবে ধর্মতলা থেকে রাজাবাজার পর্যন্ত মিছিল করেছে। মিছিল শেষে রাজাবাজারে সংক্ষিপ্ত সভায় সভাপতিত্ব করে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দায়িত্ব একদিনে শেষ হয়ে যাবে না। ধারাবাহিকভাবে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। মতাদর্শ নিয়েই সাম্প্রদায়িকতাকে ঠেকাতে হবে। 
সভায় সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেছেন, ২৫বছর আগে বাবরি মসজিদ রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং জাতীয় সংহতি পরিষদের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে পারেনি। সেদিন যারা বাবরি মসজিদ ভাঙায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভি ডি ও-তে তাঁদের ছবি সারা দেশ দেখেছে। আজকে সেই অপরাধীরাই কেন্দ্রে ক্ষমতায় বসে রয়েছে, কেউ সাজা পায়নি। এল কে আদবানিসহ সেদিনের সব অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে বামপন্থীদের লড়াই চলবে। 
ভারতের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা বি আর আম্বেদকরের মৃত্যুদিনও ছিল এদিন। বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে শুধু মসজিদ নয়, ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ওপরে আক্রমণ হিসাবে বর্ণনা করে মিশ্র বলেন, ২৫বছর পরে আবার কর্ণাটক থেকে মোহন ভাগবৎ ঘোষণা করেছেন, ‘ওখানেই রামমন্দির বানানো হবে।’ এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণার বিরুদ্ধে আমরা বামপন্থীরা লড়াই চালিয়ে যাব। যতদিন লালঝান্ডা থাকবে, যতদিন আমাদের শরীরে লালরক্ত বইবে এর বিরুদ্ধে লড়াইও জারি থাকবে। ধর্ম যার যার, কিন্তু দেশ সবার। তাই সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য বামপন্থীরা লড়াই চালিয়ে যাবে। 
মানুষের জীবন-জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, বাজারে যখন জিনিসপত্রের দাম অগ্নিমূল্য তখন কৃষক ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা করছেন, শিল্পে সংকট, বেকার বাড়ছে। সরকারের এই সব সমস্যার সমাধানের মুরোদ নেই, ‘পুত্র-ভাইপো’দের পকেট থেকে কালো টাকা উদ্ধারের মুরোদ নেই, মন্দির বানানোর ঘোষণা শোনাচ্ছে। মানুষের ক্ষোভ এবং লড়াই তীব্র হচ্ছে বলেই  দাঙ্গা বাধিয়ে বিভাজন সৃষ্টির জন্য এই সব ঘোষণা। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শপথ নেওয়ার দিন আজ।
এরাজ্যের বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করে দিয়ে বিমান বসু বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিপন্মুক্ত একথা আর বলা যাচ্ছে না। উত্তর ২৪পরগনার হাজিনগরে অথবা বসিরহাটের কয়েকটি এলাকায়, উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে, চোপড়া ইত্যাদি জায়গায় যা ঘটেছে তা উদ্বেগজনক। মানুষ সচেতনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু হাওড়ার ধুলাগড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের দুই বিধায়ক দুই সম্প্রদায়কে দাঙ্গায় ইন্ধন দিয়েছেন। আমাদের বামপন্থী সাংসদরা উত্তেজনা প্রশমনের জন্য সেখানে গিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছেন। 
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নরম সাম্প্রদায়িকতার খেলায় বিপদ ঠেকান যাবে না। সঙ্ঘ পরিবার যেভাবে হনুমানের লেজে আগুন দিয়ে ভারতের বহুত্ববাদকে পুড়িয়ে খাক করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে মতাদর্শ নিয়ে লড়াই করতে হবে। বামপন্থীরাই একাজ করতে পারে। পাড়ায় পাড়ায়, বিশেষ করে মিশ্র এলাকায় মানুষের মধ্যে গিয়ে ভালো মন্দ নিয়ে আলোচনা করতে হবে, মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। 
সি পি আই (এম) সাংসদ মহম্মদ সেলিম বলেছেন, করসেবার নামে, ইটপুজোর নামে দেশে অনেকবার উত্তেজনা ছড়িয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। বাংলায় সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে, এখানে ওরা সফল হতে পারেনি। কিন্তু এখন আর পরিস্থিতি তেমন সহজ নেই। মোদী লাইন এখন বাংলায় নিয়ে আসা হচ্ছে, তাই উত্তর প্রদেশের মতো বাংলার ধূপগুড়িতেও গোরক্ষার নামে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। 
বাংলার এই পরিবর্তনের জন্য বর্তমান শাসকদল এবং মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী করে সেলিম বলেন, উনিই তো বি জে পি-কে এরাজ্যে ডেকে এনেছেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়ে বাংলার আজকের মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রে খেলাধুলোর মন্ত্রী ছিলেন। তখন তিনি চুপ করে ছিলেন, এখন এরাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার খেলা খেলছেন। গণতন্ত্র ভেঙে সাম্প্রদায়িকতার পথ প্রশস্ত করছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরে নরেন্দ্র মোদীকে তিনি ফুল পাঠিয়েছিলেন। একসময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বাজপেয়ী ভালো, আদবানি খারাপ।’ পরে বললেন ‘আদবানি ভালো, মোদী খারাপ।’ এখন বলছেন, ‘মোদী ভালো, অমিত শাহ খারাপ।’ এরপরে হয়তো বলবেন, ‘অমিত শাহ ভালো, যোগী খারাপ।’ অনুষ্ঠান শেষ হলে ডেকরেটার্স যেমন প্যান্ডেল খুলে অন্য জায়গায় লাগায়, মুকুল রায় তেমনি তৃণমূলের প্যান্ডেল খুলে বি জে পি-র প্যান্ডেল বাঁধতে নেমেছেন। সরঞ্জাম সব একই আছে। 
সি পি আই-র রাজ্য সম্পাদক প্রবোধ পান্ডা বলেন, সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে কেন্দ্রের সরকার এখন সংবিধানকেই ভাঙতে চেষ্টা করছে। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে যুক্ত করার জন্য তারা যেভাবে নেমেছে তাতে ভারত আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ থাকবে কিনা সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সি পি আই (এম এল-লিবারেশন)-র রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ বলেছেন, বিকাশের নামে প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতির ভাঁওতা উন্মোচিত হয়ে গেছে। গোরক্ষার নামে তিনি আর বেশিদিন চালাতে পারবেন না। ছাত্রযুব, মহিলা, শ্রমিক, কৃষক সবাই রাস্তায় নামছে। এস ইউ সি আই (সি) নেতা চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, পুঁজিপতিরা শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য চায় না। তাই হিটলারের আদর্শ নিয়ে বি জে পি ভারতে হিন্দু মুসলিম বিভেদ ঘটিয়ে রক্ত ঝরাতে চায়। এই চক্রান্ত রোখার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য বলেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীসভায় যিনি চুপ করে বসেছিলেন তিনি আজকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ‘সংহতি দিবস’ পালন করছেন। সেদিন কেন চুপ করে ছিলেন? বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্য দোষীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেন মন্ত্রিত্ব নিয়েছিলেন? সারা ভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সম্পাদক নরেন চ্যাটার্জি বলেছেন, হিন্দু-মুসলিম সবাই খেয়ে পরে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু খাদ্য বস্ত্রের জন্য দাবি করলেই তাঁদের মধ্যে ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করা হয়। ইংরেজ আমল থেকে আজও তাই ঘটছে। এর বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
এদিনের মিছিল ও সভায় এই ৬টি বামপন্থী দল ছাড়াও আর সি পি আই, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেস, পি ডি এস, এন সি পি, জে ডি (ইউ), আর জে ডি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ভারত, বলশেভিক পার্টি এবং সি আর এল আই-র নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন বামপন্থী গণসংগঠনের কর্মী-সমর্থকরাও পা মিলিয়েছিলেন মিছিলে। 

Featured Posts

Advertisement