‘ডি লিট’ মুখ্যমন্ত্রীর ঝুলিতে

স্বরচিত চিত্রনাট্যে কলকাতার

‘ডি লিট’ মুখ্যমন্ত্রীর ঝুলিতে
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ১১ই জানুয়ারি— স্বরচিত চিত্রনাট্যের সফল রূপায়ণ ঘটিয়ে ঐতিহ্যবাহী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডি লিট’ শেষপর্যন্ত হস্তগত করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি! নিজের সরকারের মনোনীত সদস্যদের মাধ্যমে ‘সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ করিয়ে, খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ সম্মান নিজেরই ঝুলিতে পুরলেন মুখ্যমন্ত্রী! এ নিয়ে শিক্ষামহলের যাবতীয় নিন্দামন্দ এবং অসন্তোষ তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ‘দীক্ষান্ত ভাষণ’ দেওয়ার দুঃসাহসী নজিরও তৈরি করলেন তিনি! অতীতে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর ‘ডক্টরেট’ প্রাপ্তির ভ্রান্তিবিলাস ভুলিয়ে দিতেই সম্ভবত বৃহস্পতিবার নজরুল মঞ্চে ‘ডি লিট’ মুখ্যমন্ত্রীর জন্য রাজকীয় আয়োজন রাখা হয়েছিল। আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ‘ডি লিট’ দিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পক্ষান্তরে ‘দীক্ষান্ত ভাষণ’ দিতে গিয়ে চিরাচরিত কায়দায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০০কোটি টাকা দেওয়া হবে সরকারি তহবিল থেকে। ‘দেওয়া–নেওয়া’য় সাঙ্গ হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘এই টাকা দিয়ে উদ্ভাবনী বিভিন্ন গবেষণা করুক বিশ্ববিদ্যালয়।’
কয়েকমাস আগেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্নিয়োগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গবেষণার কাজ। বহু গবেষণা বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক গবেষণার কাজ অর্ধেক অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কিন্তু উপাধিপ্রাপ্তিতে খুশি হয়ে অকৃপণ মুখ্যমন্ত্রী এদিন ‘প্রতিদান’ ঘোষণা করেছেন।
ডি লিট প্রদানের নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর মুখ্যমন্ত্রীর নির্লজ্জতার বিরুদ্ধে শিক্ষামহলে যে সমালোচনা হচ্ছে তা টের পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘নিজেকে ধন্য মনে করছি। কখনোই কোনও সম্মানের যোগ্য বলে নিজেকে মনে করি না। এর আগেও বহু সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছি। এমনকি আজও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা নিয়ে সংশয়ে ছিলাম। আসার সময় পার্থ দা-কে (শিক্ষামন্ত্রী) বলছিলাম। বহু সময় আমি অসম্মানিত হয়েছি, এক্ষেত্রেও হতে হয়েছে। তারপরেও এসেছি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে সম্মান আমাকে দিয়েছেন তার জন্য আমি গর্ববোধ করি।’
এদিকে মুখ্যমন্ত্রীকে ডি লিট দেওয়ার বিস্ময়কর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থে যে মামলা হয়েছে বৃহস্পতিবারও তার ফয়সালা হয়নি, বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। আদালতের বিচারাধীন বিষয়কে অগ্রাহ্য করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে ডি লিট দিয়েছে তার সমালোচনা করেছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আদালতের বিচারাধীন বিষয়টিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুলতুবি রাখা উচিত ছিল। তা না করে তারা মুখ্যমন্ত্রীকে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ডি লিট দেওয়া হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্বশাসন ছিল তা এখন আর নেই। অতীতে এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের আগের থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সিন্ডিকেটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকতেন। সরকার মনোনীত প্রতিনিধি আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে অনেক পার্থক্য। যে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে টাকা দিচ্ছে, তারাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি মনোনীত করে দিচ্ছে এবং সেই মনোনীত সদস্যরাই ডি লিটের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নাম স্থির করে দিচ্ছেন! এ কখনো সমর্থন করা যায়? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী যে কাজ করেছে, বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে তার তীব্র নিন্দা করছি।’ বিমান বসু একথাও বলেন, ‘কেউ কেউ জ্যোতি বসুকে ডক্টরেট দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। জ্যোতি বসুকে যখন ডক্টরেট দেওয়া হয় তখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। কাজেই দুটো ঘটনা তুলনীয় নয়।’
মুখ্যমন্ত্রীর ডি লিট প্রাপ্তি নিয়ে এদিন আদালতে বিশ্ববিদ্যালয় পক্ষের আইনজীবী শক্তিনাথ মুখার্জি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুকে ‘ডক্টরেট’ দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সেনেট, সিন্ডিকেটের জ্যোতি বসুকে ডক্টরেট দেওয়ার যে নথি তা আদালতকে দেখানো হয়েছে। আদালত সেই সব নথি দেখেছে।’ বুধবারই মামলার আবেদনকারীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, ‘জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীন সময়ে ‘ডক্টরেট’ (ডক্টর অব ল ) সম্মান পাননি। জ্যোতি বসুর ডক্টরেট পাওয়ার বিরুদ্ধে সেসময় সিন্ডিকেটে দুজন সদস্য বিরোধিতাও করেছিলেন। সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদের সম্মতিতে জ্যোতি বসুকে ডক্টরেট দেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।’
ঠিক এই জায়গাতেই মুখ্যমন্ত্রীর ডি লিট পাওয়া নিয়ে বিরোধিতা উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে তোষামোদ করতেই ডি লিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতি সেনেট, সিন্ডিকেটে ছিলেন মূলত গণতান্ত্রিক নির্বাচনী বিধির মেনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ফলে সেখানে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বলার সুযোগ থাকতো এবং বিরোধিতাও করা যেত। সে অধিকার ছিল সেনেট, সিন্ডিকেট সদস্যদের। তাই, জ্যোতি বসুর ডক্টরেট পাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তৎকালীন দুই সিন্ডিকেট সদস্য। কিন্তু, এখন সেই সুযোগ নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট, সিন্ডিকেটে। বর্তমানে যাঁরা সেনেট, সিন্ডিকেট সদস্য তাঁরা সবাই সরকার মনোনীত। তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন বিধি (স্ট্যাটুট) কার্যকর হয়নি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই যা খুশি করার একচ্ছত্র অধিকার পেয়ে যাচ্ছেন বর্তমান সেনেট, সিন্ডিকেটের মনোনীত সদস্যরা। এমন সুবর্ণ সুযোগে মুখ্যমন্ত্রীকে ডি লিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত একইদিনে সেনেট ও সিন্ডিকেটে পাশ হয়ে যায়। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে মনে করে শিক্ষকমহল।
তবে এদিন সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য ঠেকেছে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর ‘দীক্ষান্ত ভাষণ’। দীক্ষান্ত ভাষণ, না রাজনৈতিক প্রচার—বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল শ্রোতাদের মধ্যে। পি এইচ ডি, এম ফিল এবং  অন্যান্য ডিগ্রি প্রাপকরা ছাড়াও এদিন বহু ছাত্র-ছাত্রীর ভিড় ছিল নজরুল মঞ্চে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানের দীক্ষান্ত ভাষণ সাধারণত উচ্চশিক্ষাসহ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের প্রেরণা জোগায়। তাই দীক্ষান্ত ভাষণের জন্য কোনও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ অথবা সমাজবিজ্ঞানীকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়। এবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেই রীতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীকেই দীক্ষান্ত ভাষণ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই ঘটেছে। তথাকথিত ‘দীক্ষান্ত ভাষণ’ শিক্ষাগত লক্ষ্যের বদলে দিশাহীন রাজনৈতিক লক্ষ্যেই চালিত হলো। মুখ্যমন্ত্রীর দীক্ষান্ত ভাষণ সম্পর্কে বিমান বসু বলেছেন, ‘অতীতে কেউ এমন দীক্ষান্ত ভাষণ দেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রচারের জায়গা হিসেবে ব্যবহারেরও নিন্দা করছি।’  
মুখ্যমন্ত্রীর দীক্ষান্ত ভাষণের সিংহভাগ অংশ জুড়ে ছিল তাঁর ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণা এবং ডি লিট পাওয়া ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেসম্পর্কে স্বরচিত আবেগের চিত্রনাট্য। সমাজ গড়তে ছাত্রসমাজকে তিনি 'ভয়শূন্য চিত্তে' এগিয়ে আসার ডাক দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই আহ্বান নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য, ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার অধিকার কেড়ে নিলে কোথায় এগিয়ে যাবো? কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী ছাত্রছাত্রীদের মারধর করে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদী কন্ঠ যিনি আটকে রাখতে চান তাঁর মুখে ছাত্রসমাজকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা মানায় না বলেই ছাত্রছাত্রীরা মন্তব্য করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাও এমন মতই জানিয়েছেন এদিন।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নির্বাক বসে থাকতে দেখা গেছে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আচার্য তথা রাজ্যপাল বক্তব্য রাখলেও শিক্ষামন্ত্রীকে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে তাঁর প্রয়াত স্ত্রী বাবলি চট্টোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত মেডেল এবং স্কলারশিপের অর্থ এদিনের সমাবর্তন অনুষ্ঠান থেকে চালু করে দিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া কথাকলি ব্যানার্জি ও সুপ্রিয় দাস পেয়েছেন সেই স্কলারশিপ। প্রসঙ্গত, কারও নামে মেডেল বা স্কলারশিপ চালু করতে হলে একবছর সময় নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যে মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ডি লিট পাবেন, সেই মঞ্চেই স্ত্রী-র নামে স্কলারশিপ, মেডেল চালু করতে বদ্ধপরিকর শিক্ষামন্ত্রীর ইচ্ছাও মর্যাদা পেয়েছে। তাই বাড়তি ৪০হাজার টাকা দেওয়ায় এবছর থেকেই চালু হয়ে গেল শিক্ষামন্ত্রীর প্রয়াত স্ত্রী-র নামে স্কলারশিপ। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীকে ডি লিট-এর স্মারক ও উত্তরীয় তুলে দেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। সমাবর্তনে রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল এম কে নারায়ণনও উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মেমোরিয়াল মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও ১হাজার ৪জনকে এদিন পি এইচ ডি দেওয়া হয়। শিক্ষকতায় অবদানের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের ১৪জন অধ্যাপক-অধ্যাপিকাকে সম্মানিত করা হয়েছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement