বিচারাধীন সত্ত্বেও ডি লিট,
প্রতিবাদে সরব শিক্ষকসমাজ

বিচারাধীন সত্ত্বেও ডি লিট,<br>প্রতিবাদে সরব শিক্ষকসমাজ
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১১ই জানুয়রি— শিক্ষাক্ষেত্রে বিপন্ন গণতন্ত্র এবং স্তাবকতার সর্বশেষ নির্লজ্জ উদাহরণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডি লিট নেওয়া। আজ থেকে যে কালা দিবস শুরু হলো তাতে লজ্জায় মাথা হেঁট শিক্ষক থেকে ছাত্র—সবারই। এই ঘটনা প্রমাণ করে শাসকের একচেটিয়া কর্তৃত্বকে। এবার রাস্তায় নেমে এর তীব্র প্রতিবাদ করবো আমরা। বৃহস্পতিবার এভাবেই নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে রাজ্যের শিক্ষক ও অধ্যাপক সমাজ। 
জয়েন্ট প্ল্যাটফরম অব মুভমেন্ট ফর এডুকেশনের ডাকে এদিন শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও স্বাধিকার হরণের তীব্র প্রতিবাদ জানান তাঁরা। সেই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র বজায় রাখার আবেদন জানান। মুখ্যমন্ত্রীর ডি লিট প্রাপ্তির ঘটনাটিকে সামনে এনে শিক্ষকরা বলেন, আজ যা ঘটলো তাতে গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। এই প্রথম বিচারাধীন বিষয়ে ডি লিট দেওয়া হলো কাউকে। তবে মুখ্যমন্ত্রী ডি লিট তো পাননি, তিনি সেটা নিয়েছেন। যা হয়েছে সবটাই ‘মনোনীত এবং মনোমত’ হিসাব-নিকাশের প্রতিফলন। শিক্ষা ও সন্মানকে তিনি কোথায় নামিয়ে এনেছেন তা আজ দেখলেন রাজ্যবাসী। 
কলকাতার সত্যপ্রিয় ভবনে এদিন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী অধ্যাপকদের সংগঠনের মধ্যে থেকে। শিক্ষক সংগঠনগুলির এই যুক্ত মঞ্চে বক্তব্য রাখেন শ্রুতিনাথ প্রহরাজ, কেশব ভট্টাচার্য, অশোকেন্দু সেনগুপ্ত, কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, সমর চক্রবর্তী, অঞ্জন ঘোষ, প্রদ্যোৎ মাইতি, প্রবীর ঘোষ প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন শ্যামল চক্রবর্তী, উৎপল রায়, নকুলেশ্বর চক্রবর্তী, রাজকুমার রাজা, নীলকমল সাহাকে নিয়ে গঠিত এক সভাপতিমণ্ডলী। উপস্থিত ছিলেন সুস্নাত দাসসহ অন্যান্য শিক্ষক-অধ্যাপকরা।, 
বিপন্ন গণতন্ত্রের উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক শ্রুতিনাথ প্রহরাজ বলেন, বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র অত্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এক ভয়াবহ সংকটের জায়গা তৈরি হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে আগে ক্যাম্পাসগুলি রক্ষা করতে হবে। না হলে দলতন্ত্র আরও বেশি করে কায়েম হবে। আর তাহলেই পূর্ণ একচেটিয়া কর্তৃত্ব হবে শাসক গোষ্ঠীর। ‘ক্রিয়েটিভ’ মুখ্যমন্ত্রীর ডি লিট প্রাপ্তি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সেই একচেটিয়া কর্তৃত্বেরই ফল। এই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবের আমন্ত্রণপত্রে আচার্যের নামের আগে মুখ্যমন্ত্রীর নাম বসলো। এই প্রথম কাউকে বিষয়টি বিচারাধীন হওবা সত্ত্বেও ডি লিট দেওয়া হলো। এসবের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি। আজকের শুরু হওয়া কালা দিবস চলবে আগামী দিনেও। অধ্যাপক কেশব ভট্টাচার্য বলেন, আজ লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। আসলে শিক্ষাক্ষেত্রের ওপর যেভাবে আক্রমণ নেমে এসেছে তার মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে গৈরিকীকরণ, অন্যদিকে রয়েছে শিক্ষার ওপর নানাভাবে কর্তৃত্ব কায়েম। এসবে বাধা দিতে গেলে হেনস্তা, মামলা-মোকদ্দমা চলে। সরকার যা খুশি করতে পারে বলে আইন প্রণয়ন হচ্ছে। উদ্দেশ্য, শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বাজারজাতকরণ। শিক্ষাক্ষেত্রের সন্মান প্রদানও তো তাই। ডি লিট-এর জন্য নির্দিষ্ট বিচার পদ্ধতিতে কোর কমিটি বা সেনেট-এ অনুমোদন ইত্যাদি দরকার হয়। এখানে কীভাবে বিচার হলো তা এতক্ষণে সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। যা যুশি সিদ্ধান্ত এভাবে নেওয়া যায় না, এই অব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর ডি লিট পাওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য বলেন, ইতিহাস বিকৃতি থেকে শিক্ষায় নানাভাবে সন্ত্রাস আমরা দেখেছি। যিনি এসবের নেপথ্যে আছেন তাঁকেই ডি লিট দেওয়া হলো। এর প্রতিবাদের ভাষা নেই। সমর চক্রবর্তী বলেন, যাঁরা শিক্ষাকে প্রকৃতই এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরাই আজ পিছিয়ে পড়ছেন। আর রত্ন-সন্মান পাচ্ছেন তারা, যারা গণতন্ত্র লুণ্ঠন করছে। অশোকেন্দু সেনগুপ্ত বলেন, শিক্ষার সঙ্গে যারা যুক্ত নন, তারাই আজ নাক গলাচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে। এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াচ্ছে এখন। সুতরাং প্রতিবাদ চলবে। ছাত্রদেরও এই প্রতিবাদে শামিল করা গেলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে। অঞ্জন ঘোষ বলেন, এ তো ডিগ্রি বেচাকেনার মতো বিষয় এসে পড়লো সামনে। মুখ্যমন্ত্রীর মনোনীতরা তাঁদের মনোমতো মানুষকে সন্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদ হওয়া দরকার। সভাপতিমণ্ডলীর পক্ষ থেকে উৎপল রায় বলেন, আজকের ঘটনা নৈরাজ্যের আর একটি উদাহরণ। মুখ্যমন্ত্রী ডি লিট নিয়েছেন, পাননি। এই উপাধি অনৈতিকভাবে উপার্জন হলো কিনা তা রাজ্যবাসীই বলবেন। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। জয়েন্ট প্ল্যাটফরম অব মুভমেন্ট ফর এডুকেশনের পক্ষ থেকে আমরা রাস্তায় নামব।

Featured Posts

Advertisement