লাভজনক এয়ার ইন্ডিয়াকে
এবারে বেসরকারীকরন

লাভজনক এয়ার ইন্ডিয়াকে<br>এবারে বেসরকারীকরন
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: নয়াদিল্লি, ১১ই জানুয়ারি- এয়ার ইন্ডিয়া লোকসানের ধাক্কা সামলে লাভ শুরু করতেই এবারে দেশীয় সংস্থার বদলে বিদেশি সংস্থার কাছে তা পাকাপাকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র। বুধবার একক ব্র্যান্ডে খুচরো বিপণনে বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ করার কথা ঘোষণা করে কেন্দ্র। একই সঙ্গে বিমান পরিষেবাতেও বিদেশি লগ্নি অবাধ করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান পরিষেবা সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগে করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা ছিল। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রের মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই বাধা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, এখন যে কোনও বিদেশি বিমান পরিষেবা সংস্থা এবার ইন্ডিয়ার শেয়ার ৪৯শতাংশ শেয়ার কিনে নিতে পারবে। যার মূল কথা হলো রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান পরিষেবা সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়াকে বিদেশি সংস্থার কাছে এবারে সরাসরি ঢালাও বিক্রির পথ অবাধ করে দেওয়া হলো।
এদিন বিমান পরিবহণে বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন্দ্র সূত্রে জানানো হয়েছে, দেশি বিমান পরিষেবা সংস্থার মতো রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান পরিষেবায় বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে এতে যে বিধিনিষেধ ছিল তা তুলে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশি বিমান সংস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ করা হলেও এয়ার ইন্ডিয়ায় তা অবাধ ছিল না। গতকাল বিদেশি বিনিয়োগ সর্বক্ষেত্রে অবাধ করার সময় এয়ার ইন্ডিয়ায় এই বিধি নিষেধ তুলে দেওয়ার চাপ দেয় কর্পোরেট মহল। তাতে এদিন মন্ত্রীসভা এই বিধিনিষেধ পুরো তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্র জানিয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আরও সরল ও সবরকম বাধা মুক্ত করে দেওয়ায়  বিদেশি বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে কর্পোরেট শিল্প সংস্থার সংগঠন সি আই ‌আই। সংস্থার অধিকর্তা চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, বিদেশি সংস্থার কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার বিনিয়োগ অবাধ করায় আশা করা যাচ্ছে বিদেশি সংস্থা এবার ইন্ডিয়ার শেয়ার কিনতে এগিয়ে আসবে। তাঁর দাবি এই বিদেশি বিনিয়োগ এলেই এয়ার ইন্ডিয়া ঘুরে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা সংগঠনের পক্ষে আলবার্ট জং জানান ,ভারত সরকার এয়ার ইন্ডিয়ার বিদেশি বিনিয়োগে বাধা দূর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে গত মাসে অসামরিক বিমান পরিষেবামন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ পরামর্শদাতা সংস্থা ই ওয়াই-কে নিয়োগ করা হয়েছে এয়ার ইন্ডিয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া বিষয়ে তদারকির জন্য। ফলে কিভাবে তা বিক্রি হবে তার পরিকল্পনা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে বলে কেন্দ্র সুত্রে খবর।
এদিকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়াকে এবারে পুরোপুরি বিদেশি সংস্থাকে কেন্দ্র বিক্রি করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার তীব্র বিরোধিতা করেছে সি আই টি ইউ। এনিয়ে প্রতিক্রিয়ায় সি আই টি ইউ নেতা তপন সেন বলেন, এয়ার ইন্ডিয়া তিন বছর ধরে লড়াই করে ক্রমশ তা লাভজনক সংস্থা হয়ে উঠেছে। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দলমত নির্বিশেষে সকলে এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রির উদ্যোগ বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে সবে ঘুরে দাঁড়িয়ে লাভের মুখ দেখছে এয়ার ইন্ডিয়া। এসময় এই সংস্থা বিক্রি করা উচিত হবে না। এসময় আরও তিন বছর সময় দেওয়া উচিত এয়ার ইন্ডিয়াকে বলে সুপারিশ করে কমিটি। সেন বলেন এসব সুপারিশ  উপেক্ষা করে তা বিদেশি সংস্থাকে বিক্রি করে দিতে চলেছে কেন্দ্র। তিনি বলেন,  দেশের বড় সম্পদ এয়ার ইন্ডিয়ার মতো সংস্থা। দেশের এই সম্পদকে বিদেশি সংস্থাকে বিক্রি করে দেওয়া আদৌ দেশের স্বার্থবাহী কাজ নয়। তা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ বলেই তিনি জানান।
কর্পোরেট মিডিয়া বারে বারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবার ইন্ডিয়ার লোকসানের খবর প্রচার করে গেছে। কেন্দ্র বর্তমানে এই বিক্রির  পিছনে সংস্থার লোকসানের দোহাই দিয়েছে। কিন্তু সংস্থার বর্তমান আর্থিক চিত্র এখন আড়াল করা হচ্ছে। এয়ার ইন্ডিয়াকে নয়া উদারবাদের জমানায়  বিক্রি করে দেওয়ার নিশানা রয়েছে অনেক আগে থেকে। তবে লোকসানে চলার জন্য তা বিক্রির প্রক্রিয়ায় কিছুটা ঢিলে পড়ে। সেন এ প্রসঙ্গে জানান, যদিও ঐ লোকসানের জন্য দায়ী কেন্দ্রের সরকার। বিগত কেন্দ্রের সরকার তাড়াহুড়ো করে এয়ার ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স সংস্থা সংযুক্তি করে। এসময় সরকার জোর করে প্রয়োজন ছাড়া তাড়াহুড়ো করে বিদেশি সংস্থা থেকে বহু বিমান কেনে। এই বিমান কেনার জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি অনুসরণ না করায় তাতে বিপুল খরচ হয়। এই লোকসানের দায় চাপে এয়ার ইন্ডিয়ার ঘাড়ে। এই লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে তা বিক্রির উদ্যোগ নেয় কেন্দ্র। বামপন্থীরা তার প্রবল বিরোধিতা করে। সংস্থার উপর চাপিয়ে দেওয়া লোকসান কাটাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়। আন্দোলনের চাপে সেসময় বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে তাতে অর্থ বিনিয়োগ করে কেন্দ্র। ২০১২ সালের এপ্রিলে ইউ পি এ সরকার এয়ার ইন্ডিয়ায় পুনরুজ্জীবনে ৩০ হাজার কোটি  টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয়। ২০২১সালের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা শেষ করা হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়। সেই পরিকল্পনা মতো এয়ার ইন্ডিয়া গত তিন বছর হলো লাভজনক হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার মুনাফার পরিমাণ হলো ১০৫ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ সালে তা তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। বিপুল সম্পদ নিয়ে লাভজনক অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানো এয়ার ইন্ডিয়াকে বিদেশি সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পিছনে কর্পোরেট ও মোদী সরকারের অশুভ আঁতাতকে দায়ী করছেন অনেকে। 
এদিকে খুচরো বিপণনে বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র তার বিরোধিতা করছে সি আই টি ইউ। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠন। বিবৃতিতে সংগঠন জানিয়েছে খুচরো বিপণনে বিদেশি বিনিয়োগের অবাধ প্রবেশে সংকট নেমে আসবে ছোট শিল্প বাণিজ্যে। এতে কর্মসংস্থানে সংকোচন ঘটবে। 
খুচরো বিপণনে বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ করার বিরোধিতা করছে ফরওয়ার্ড ব্লক। এক বিবৃতিতে ফরওয়ার্ড ব্লক জানিয়েছে, ৪কোটি মানুষ খুচরো বিপণন পেশায় যুক্ত, তাদের রুটি রুজি এতে বিপন্ন হবে।

Featured Posts

Advertisement