অনাদরের ‘রেকর্ড রুমে’
অসহায় ইতিহাসের বিবরণ

অনাদরের ‘রেকর্ড রুমে’<br>অসহায় ইতিহাসের বিবরণ
+

মনোজিৎ দাস: কলকাতা, ১১ই জানুয়ারি — কলকাতার প্রথম নির্বাচিত মহানাগরিক দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। জানেন সবাই। তাঁর মৃত্যুর সাল, তারিখ বলাও অনেকের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণ কী? কোথায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন? বলা সহজ নয়। অনেকে জানেনও না। কিন্তু সেই সব তথ্যই এখনও মজুত এই মহানগরে। সবই আছে ৫নম্বর এস এন ব্যানার্জি রোডের ঠিকানায়।
মহাকরণ অভিযানে শহীদ হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বাদল দত্ত। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, জানা স্বাভাবিক। কিন্তু কখন মারা গিয়েছিলেন? কোন চিকিৎসক তাঁকে শেষ পরীক্ষা করেছিলেন? কী লেখা হয়েছিল মৃত্যুর কারণ? তারও নথি আছে ওই একই বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আশুতোষ মুখার্জি কিংবা ঋত্বিক ঘটক—অনেক প্রথিতযশার অন্তিম সময়ের বিবরণ আছে। এছাড়াও আছে শহরের অনেক বাড়ি, ঐতিহ্যশালী ভবনের নকশা, বহু বিখ্যাত স্থাপত্যের নকশা এবং অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যা‌য়নের নথি। এই সব কিছুই রয়েছে এস এন ব্যানার্জি রোডের প্রায় পশ্চিমপ্রান্তের সেই বাড়িটিতে। 
ওই ঠিকানাটি কলকাতা কর্পোরেশনের কার্যালয়ের। সেখানেই রয়েছে সেই ঘর, যেখানে আছে এমন অনেক নথি। তবে আছে, এই পর্যন্তই। অত্যন্ত অনাদরে রয়েছে সব। যে কর্পোরেশনে মেয়রের ঘর তৈরি হয় লক্ষাধিক টাকায়, সেখানে রাজ্য তথা দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র কোনও রকমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয় মাত্র চার হাজার টাকা। 
কলকাতা কর্পোরেশ সূত্রে জানা গেছে, কর্পোরেশন তার কাজকর্ম চালানোর জন্য ১৮৭২সালে কেন্দ্রীয় পৌরভবনটি তৈরি করে। ওসমন্ড ম্যাকিনটস এই পৌরভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন। সেই সময়ে প্রায় ২লক্ষ টাকা খরচ হয় এই বিশাল ভবনটি তৈরি করতে। ১৯০১-এ আশপাশের আরও কিছু জমি নিয়ে নতুন করে গড়ে তোলা হয় পৌরভবনটি। নতুন ভবন তৈরি হওয়ার আগে একাধিক বিভাগের কাজ হলেও নথি সংরক্ষের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ছিল নথি সংরক্ষণের জন্য ‘বান্ডিল’ ব্যবস্থা। এরপর ‘নাম্বারিং সিস্টেম’ চালু করে একেকটি বিষয়কে রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হতে থাকে। ১৮৯২সালে ‘দ্য কালেকশন ফাইল’ নামে পদ্ধতি চালু হয়। বিভিন্ন বিভাগ নিজস্ব তথ্য সংরক্ষণ করত। ১৯০৪ সালে কেন্দ্রীয় নথি বিভাগ তৈরি হয়। এখানে বিভিন্ন দপ্তরের পুরানো কাগজপত্র ও নথি সংগ্রহ করে সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। ১৯০৭ সালে গুরুত্ব অনুসারে নথির প্রকার ভেদ করা হয়। চারটি ভাগ করা হয়। এ শ্রেণি– চিরকালীন সংরক্ষণ, বি–১২ বছর পর্যন্ত, সি–১২ বছর পর্যন্ত, ডি– তাৎক্ষণিকভাবে নষ্ট করে ফেলা। নষ্ট করা নথিকে তালিকাভুক্ত করা হতো। বহু বছরের হাতে লেখা নথি সংরক্ষিত আছে এই বিভাগে। যেমন, ১৯৩০-র পর থেকে জন্ম সংক্রান্ত বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য, ১০০ বছরের বেশি আগে অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান, ১৮৩৮ সালের অ্যাসেসমেন্টের নথি, ১৯০০-র পর থেকে বাড়ির কর সংক্রান্ত নথি। 
এই রেকর্ড রুমের পরিসর খুব একটা বিস্তৃত নয়। কাঠের বাঙ্ক দিয়ে চার তলার ব্যবস্থা করা রয়েছে। বছরের পর বছর পেরিয়েছে, নথির পরিমাণও ক্রমশ বেড়েছে। কাঠের বাঙ্ক উপচে নথির বর্তমান ঠাঁই ঘরের মেঝেতে। জরুরি ভিত্তিতেই দরকার নথি সংরক্ষণের নতুন ঘর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু উদাসীন কর্তৃপক্ষ। এই রেকর্ড রুমেই সংরক্ষিত আছে মহাজাতি সদনের নকশা, যেখানে আবেদনকারীর জায়গায় সুভাষচন্দ্র বসুর সই আছে। রয়েছে নিবেদিতার বাড়ি ১৬নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়ির রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত নথি, ১৮৯২সালের বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর নথি, ১৯১৫-এর উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরির মৃত্যুর নথি, রামকৃষ্ণের মৃত্যুর নথি। আছে ঋত্বিক ঘটক, জীবনানন্দ দাস, প্রমথেশ বড়ুয়া, বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্তের মৃত্যুর তথ্য, আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর নথি। আছে এমন আরও বহু বিশিষ্ট মানুষের মৃত্যুর নথিও। বহু বিখ্যাত ও পুরানো বাড়ির নকশা ও অ্যাসেসমেন্ট তথ্য সার সার দিয়ে পড়ে আছে এই রেকর্ড রুমে। এই রেকর্ড রুম ইতিহাসের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ভাণ্ডার। এখানে নথির সংখ্যা ঠিক কত? কর্তৃপক্ষও সঠিক কোনও সংখ্যা দিতে পারেনি। আনুমানিকভাবে বলা যেতে পারে, কয়েক লক্ষ নথি আছে, যার মধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিও রয়েছে। 
প্রতি মাসে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টাকা খরচ করা হয় এই গোটা ভাণ্ডারটিতে কীটনাশক স্প্রে করার জন্য। এই বিভাগে ৪০ জনের বেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের চেষ্টায় এই নথিগুলি এখনও আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানালেন, বিপুল পরিমাণ নথি। বহু নথি সময়ের সঙ্গে নষ্টও হয়েছে। তবে শুধু কীটনাশক দিয়ে এই নথি রক্ষা করা সম্ভব নয়। আগেকার দিনের কাগজের মান উৎকৃষ্ট হওয়ায় এত দিন আছে। তবে নথিগুলি যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে কত দিন রক্ষা করা যাবে, বলা যাচ্ছে না। আর এই পরিস্থিতিতেই দাবি উঠেছে, অবিলম্বে রেকর্ড রুমে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে, তার ডিজিটালাইজেশন হোক। ইতিমধ্যেই কলকাতা কর্পোরেশনে তৈরি হয়েছে ‘অমল হোম ডিজিটাইজড আর্কাইভ’। এখানে দৃশ্যমান ছবিও দেখা যায়। এই আর্কাইভ-এ সংরক্ষিত আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবি, পুরানো কলকাতার চিত্র, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল গেজেটকে লেখা কবিগুরুর বার্তা, ঘোড়াচালিত ট্রামের ছবি থেকে বর্তমান ট্রাম। এমন বিভিন্ন ছবি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিকে আর্কাইভে রাখা হলে কেন রেকর্ড রুমের গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলিকে ডিজিটাইজড করা হবে না? কেন সেগুলি আর্কাইভে আসবে না? এই প্রশ্নই উঠেছে কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে।   

Featured Posts

Advertisement