বুথে বুথে গড়ে তুলুন
প্রতিরোধের দুর্গ 

আহ্বান সূর্য মিশ্রের 

বুথে বুথে গড়ে তুলুন<br>প্রতিরোধের দুর্গ 
+

শান্তনু দে: জামুড়িয়া, ১১ই জানুয়ারি— জামুড়িয়ার মাঠ-ছাপানো সমাবেশে সূর্য মিশ্রের প্রত্যয়ী ঘোষণা, পিছু হটার কোনও জায়গা নেই। বুথে বুথে গড়ে তুলুন প্রতিরোধের দুর্গ। প্রস্তুত হোন। আমরা লড়ব। আমরা জিতব।
সি পি আই (এম) পশ্চিম বর্ধমান জেলা ২৪-তম সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। তার ঠিক আগেই পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন পদ্মফুল আর ঘাসফুল মিলে কীভাবে দেশ-রাজ্যের মানুষকে ‘এপ্রিল ফুল’ বানাচ্ছে। সূর্য মিশ্র বলেন, কী করতে হবে। তিনি বলেন, সামনে বড় লড়াই। পঞ্চায়েত নির্বাচন। শাসকদল ঘোষণা করেছে ওরা আমাদের প্রার্থী দিতে দেবে না। মনোনয়ন দেওয়া আটকাবে। ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেবে, তা তো আমরা দেখছিই। বি জে পি দাবি করছে ওরা নাকি ওদের রুখতে পারবে। আর মাঠে-ময়দানে আমরা। একদিকে ঘাসফুল, অন্যদিক পদ্মফুল। দুই বিপদ। এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই আমাদের বুথগুলিকে দুর্গে পরিণত করতে হবে। তৃণমূলের আছে দুষ্কৃতী বাহিনী। আর মাঠে অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে আর আর এস এস। আমাদেরও তাই তৈরি হতে হবে। বুথে-বুথে গড়ে তুলতে হবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে, ছাত্র-যুব-মহিলাদের নিয়ে। অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়। ফরাসি বিপ্লবের লা মার্সাই গানের উর্দু অনুবাদ ‘আব কোমর বাঁন্‌ধ তৈয়ার হো’ শুনিয়ে মিশ্র বলেন, ‘এবার কোমর বেঁধে তৈরি হও লাখ-কোটি ভাইয়েরা/ আমরা অনাহারপীড়িত, কিন্তু মৃত্যুকে ভয় পাই না/ স্বাধীনতার ডঙ্কা বাজাও, ওড়াও অগ্নিনিশান/ শ্রেণিযুদ্ধের শেষ আহ্বান শোন, ওই শোনা যায়/ হে কিষান তৈরি হও, হে মজুর তৈরি হও। 
জামুড়িয়ার নজরুল মঞ্চে বৃহস্পতিবার নজরুলের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান ও রক্তপতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে সম্মেলনের সূচনা। রক্তপতাকা উত্তোলন করেন জেলার বর্ষীয়ান পার্টি সদস্য সুবোধ ব্যানার্জি। লাগোয়া মাঠে তখন উপচে পড়েছে সমাবেশ। থিক থিক করছে ভিড়। ভাষণের শুরুতে সূর্য মিশ্র বলেই ফেলেন, এই মাঠ আপনাদের চেয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বাইরে অনেক মানুষ। এবারে সমাবেশ করতে হলে খুঁজতে হবে অন্য জায়গা। মঞ্চে তখন সেলিম ছাড়াও রয়েছেন পার্টি নেতা মদন ঘোষ, দীপক দাশগুপ্ত, অঞ্জু কর। আছেন অমল হালদার, অচিন্ত্য মল্লিক, অনাদি সাহু, গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি, আভাস রায়চৌধুরি প্রমুখ। সমাবেশের সভাপতি ছিলেন বংশগোপাল চৌধুরি। 
পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে সূর্য মিশ্র বলেন, রেশন কার্ড সবার নেই। সবাই পাচ্ছেন না ২ টাকা কিলো চাল। প্রত্যেকের রেশন কার্ড, প্রত্যেকের জন্য ২ টাকা কিলোতে চালের দাবি আমাদের তুলতে হবে। প্রত্যেকের জন্য চাই মাথা গোঁজার ঠাঁই। আমাদের জন্যই একশো দিনের কাজ আজ বাস্তব। কিন্তু মানুষ তার মজুরি পাচ্ছেন না। এক-দেড় বছর বকেয়া পড়ে রয়েছে। কৃষক পাচ্ছেন না ফসলের দাম। হিমঘর থেকে আলু বের করছেন না কৃষকরা, নতুন আলুতেই যে লোকসানের বহর বাড়ছে। কারখানা বন্ধ হচ্ছে, নতুন কাজ নেই। এখানেই শুধু ২২টা বেসরকারি কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা গড়বার চেষ্টা করেছিলাম, শিল্প করার চেষ্টা করেছিলাম। ২০০৮-’০৯ বছরে এখানে বিনিয়োগ হয়েছিল ৪,০০০ কোটি টাকা, পরের বছর দ্বিগুণ বেড়ে ৮,০০০ কোটি টাকা, আর ২০১০-’১১তে তারও দ্বিগুণ বেড়ে ১৬,০০০ কোটি টাকা। অথচ, সাত বছরে এখানে কেন, গোটা রাজ্যে ৪০০ কোটি টাকাও বিনিয়োগ হয়নি। 
তৃণমূল থাকলে যে আর এস এস-এর বাড়বাড়ন্ত রোখা যাবে না, সেকথা বিশদে ব্যাখ্যা করে মিশ্র বলেন, একজন থাকলে আরেকজনের লাভ। ওরা একই। এ থাকলে ওর সুবিধা। হরবোলার চরিত্র। বাঘের গলায়ও ডাকতে পারে, আবার বিড়ালের গলাতেও। আসলে একই, একজনই। 

উপচে পড়া সমাবেশ। বৃহস্পতিবার জামুড়িয়াতে নজরুল মঞ্চ সংলগ্ন মাঠে।: ছবি বিধান ভট্টাচার্য।
এই প্রসঙ্গে মহম্মদ সেলিম বলেন, এই বি জে পি-কে এ রাজ্যে ডেকে এনেছে তৃণমূল। খাল কেটে ওরাই কুমির এনেছে। তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল সঙ্ঘের ব্লুপ্রিন্টে। আসলে মোদী আর দিদি একই পাঠশালার। দুজনে পড়েছেন একই সিলেবাস। দুইয়ের বিরুদ্ধে তাই একইসঙ্গে লড়তে হবে। লালঝান্ডা দুর্বল হলে, দুর্বল হবে মানুষের রুটিরুজির আন্দোলন। বামপন্থীরা মানে হকের লড়াই। খেতমজুরের মজুরি বৃদ্ধির লড়াই, অসংগঠিত শ্রমিকের কাজের নিরাপত্তা, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর লড়াই। বামপন্থীরা মানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ঐক্য, সম্প্রীতির গ্যারান্টি। বামপন্থীরাই পারে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে। সবকিছু মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে ওরা করছে মাটি উৎসব। সঙ্ঘের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের লড়াই খাদ্যের অধিকার নিয়ে। আর ওরা করে খাদ্য নিয়ে রাজনীতি। কে কী খাবার খাবেন, তা নিয়ে রাজনীতি। 
জামুড়িয়া, সালানপুর, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল কীভাবে মরুভূমির চেহারা নিচ্ছে তা তুলে ধরে বংশগোপাল চৌধুরি বলেন, ইস্পাত শিল্প আজ আক্রমণের মুখে। হিন্দুস্থান কেবলস বন্ধ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী একটা চিঠিও লেখেননি। বিপদ কয়লা খনিতে। দিল্লি বেসরকারিকরণের বিল এনেছে। আর তা যাতে আইনে পরিণত হয়, তৃণমূল তাতে সমর্থন দিয়েছে। চালু কারখানা আজ বন্ধ হচ্ছে। আসছে না কোনও নতুন বিনিয়োগ। 
সমাবেশ শেষে এদিনই শুরু হয়েছে প্রতিনিধি সম্মেলনের কাজ। উদ্বোধন করে ভাষণ দিয়েছেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপক দাশগুপ্ত। আন্তর্জাতিক, জাতীয় পরিস্থিতি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আয়-সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে মানুষের উপর আক্রমণ। তবে মানুষের আন্দোলনও থেমে নেই। সংকটের সুবিধা তুলছে দক্ষিণপন্থীরা। যদিও, যেখানে বামপন্থীরা শক্তিশালী, সেখানে জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। 
এদিনই খসড়া সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পেশ করেছেন বিদায়ী কমিটির সম্পাদক গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি। সম্মেমন পরিচালনা করছেন বীরেশ মণ্ডল, বিবেক চৌধুরি, নুরুল ইসলাম, জি কে শ্রীবাস্তব, শান্তি মজুমদারকে নিয়ে গঠিত সভাপতিমণ্ডলী। সম্মেলন উপলক্ষে জামুড়িয়ার নামকরণ করা হয়েছে কমরেড বিকাশ চৌধুরি, কমরেড প্রকাশ তেওয়ারি নগর। নজরুল শতবার্ষিকী মঞ্চ এখন কাজী নজরুল ইসলাম মঞ্চ।  

Featured Posts

Advertisement