ধসা রোগে
সংকটে আলু চাষ

ধসা রোগে<br>সংকটে আলু চাষ
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: মাথাভাঙা, ১২ই জানুয়ারি— শীতের পারদ ক্রমশ নামছে। আবহাওয়ার এহেন খামখেয়ালিপনায় আলু এবং বোরোচাষে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন কোচবিহারের কৃষকরা।
প্রবল ঠান্ডায় ‘কোল্ড ইনজুরি’-তে আক্রান্ত হচ্ছে বোরো ধানের চারা। ঠান্ডায় ধানের বীজতলায় এখন রীতিমত চিলিং এফেক্ট দেখা দিয়েছে। কোচবিহার থেকে মালদহ সর্বত্র বীজতলা প্রথমে হলুদ পরে বাদামী হয়ে যাচ্ছে। এদিকে আলুতে দেখা দিয়েছে ধসা রোগ। কোচবিহারের ২নং ব্লকের খোলটা গ্রামের নারায়ণ কাটি এবারেও ৫ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছেন। একবিঘা জমিতে আলু চাষ করতে এবছরে খরচ প্রায় ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা।
নারায়ণ কাটি হিসাব কষে বলছেন, বিঘাতে ৮০ থেকে ১০০ প্যাকেট (৫০ কেজি এক প্যাকেটে) উৎপাদন হয়। এবারে কনকনে ঠান্ডায় আলুতে ধসা রোগ দেখা দিয়েছে। এরকম চললে বিঘাতে ৪০ প্যাকেট আলুও মিলবে না।
মন ভালো নেই নারায়ণ কাটির। ৫ বছর আগে কে সি সি-র ঋণ ছিল ৪০ হাজার টাকা। এখন সেই ঋণ বেড়ে হয়েছে এক লক্ষ টাকা। বলছেন, ‘ফসল ফলিয়ে লাভের কোনও সম্ভাবনা নেই। এবারে ঋণ শোধ কিভাবে করবো সেটা ভাবলেই দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম উবে যাচ্ছে।’
একই অবস্থা রমেশ রায়ের। ব্যাঙ্কে ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই। গত বছরের ২০০ প্যাকেট আলু হিমঘরে ছিল। দিন কয়েক আগে সেই আলু ৮০ পয়সা কেজি দরে বেচতে বাধ্য হয়েছেন। এদিকে তুফানগঞ্জ-২ ব্লকে ইতিমধ্যে ৭০০ হেক্টর জমিতে আলুতে ধসা রোগ দেখা দিয়েছে। এই তথ্য দিচ্ছেন ব্লকসহ কৃষি আধিকারিক। এই রোগ আরও ছড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না কৃষি দপ্তর।
শালবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বজরাপুর, তুর্চানির কুঠি, ভানুকুমারি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ধলজবরি এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। মূলত ৩টি কারণে আলু চাষে ধসা রোগ হচ্ছে। প্রথমত আবহাওয়া। রাতে অত্যধিক কুয়াশা পড়ায় এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত বীজ। জেলায় বীজ সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেই। হিমঘরের আলুকেই বীজ হিসাবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। তৃতীয়ত, একই জমিতে বারবার আলুচাষ করে ধসা রোগের প্রবণতা বাড়াচ্ছেন অনেকেই।
ব্লকে ব্লকে কৃষি দপ্তর থাকলেও ধসার প্রকোপেও দেখা মিলছে না কে পি এস‍‌দের। এমনটাই অভিযোগ কোচবিহার-২ ব্লক থেকে তুফানগঞ্জসহ সর্বত্র। কোচবিহারসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে আলুর চাষ ক্রমশ বাড়ছে বলছে কৃষিদপ্তর। আলু বিপণনের কোনও ব্যবস্থাই করে উঠতে পারেনি কৃষি বিপণন দপ্তর। জেলাগুলিতে নতুন হিমঘরের ব্যবস্থাও হয়নি।
আমন ধানের অভাবী বিক্রির পাশাপাশি প্রকৃতির রোষে এবার বোরো ধান চাষিরা।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে ধানের চারা ‘কোল্ড ইনজুরি’তে আক্রান্ত হতে পারে বলছেন কৃষি আধিকারিকরা। কারণ এরফলে চারাগাছের শেকড় মাটি থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না। এবারে গত ৬দিন ধরে উত্তরের জেলাগুলিতে তাপমাত্রা কখনোই ৭ ডিগ্রির বেশি ওঠেনি। কোচবিহারে চলছে ৫-৬ ডিগ্রি।
কৃষকরা বিকালে বীজতলায় ভূর্গভস্থ অপেক্ষাকৃত গরমজল বীজতলায় দিচ্ছেন। ভোরে সেই জল বের করে দিচ্ছেন। বীজতলায় ছাই দিচ্ছেন কেউ কেউ। রাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দিয়ে বীজতলা বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে গ্রামে গ্রামে। যেহেতু কোল্ড ইনজুরির কারণে চারা মাটি থেকে পুষ্টি নিতে সক্ষম হয় না। সে কারণে এসময়ে ১০০ শতাংশ জলে দ্রবণীয় এন পি কে ১৮:১৮:১৮ একশো লিটার জলে এক শতাংশ হারে এবং সমুদ্র শৈবাল নির্যাস প্রতি লিটার জলে দুই মিলিলিটার পরিমাণ মিশিয়ে ধানের চারায় স্প্রে করলে কিছুটা লাভ হবে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও দেওয়া যেতে পারে চিলেটেড জিঙ্ক।
আলুর ধসা রোগ ঠেকাতে বা আগাম সতর্কতা নিতে ডাইথেন এম ৪৫ এবং থাইমোক্সিন ম্যাঙ্কোজেবের মিশ্রণ আলুর জমিতে প্রয়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়ার কারণে কোচবিহারসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে আলু ও বোরো চাষের চরম সংকটে তখন পাশে নেই সরকার। ফসল বাঁচাতে নিজেরাই লড়ছে আলু ও বোরো চাষি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement