অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ
আছে বলেই ক্ষোভ

অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ<br>আছে বলেই ক্ষোভ
+

অশোককুমার গাঙ্গুলি, সুপ্রিম কোর্টের মতো বিরাট প্রতিষ্ঠান যার ওপর গোটা দেশের মানুষ ভরসা করে থাকেন। সেখানে যা ঘটলো তা আমাকে অত্যন্ত পীড়া দিয়েছে। এমনটা দেখতে হবে জীবনে কখনো ভাবিনি। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অন্য বিচারপতিদের মধ্যে যে মতবিরোধ তা হয়তো আলোচনা করে মেটানো যেতো। কিন্তু তা হয়নি। এটা দেশবাসীর পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগের, দুশ্চিন্তার বিষয়।
সুপ্রিম কোর্টের অত্যন্ত প্রবীণ ও বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়দানকারী চারজন বিচারপতি সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির কর্মধারা নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমার মনে হয় না, কোনও একদিনের ঘটনা থেকে পরিস্থিতি এই জায়গায় পৌঁছেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই এধরনের অসন্তোষ আদালত ও তার বাইরে শোনা যাচ্ছিল। তাই নিয়ে পত্রপত্রিকা, অন্যান্য গণমাধ্যমে আলোচনাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর থেকেই বোঝা যায় যে, একটা গোলোযোগ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল, এটা হঠাৎ কয়েকদিনের ঘটনা নয়। এখন প্রবীণ চারজন বিচারপতি প্রকাশ্যে যা বলেছেন তা দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের বিচারধারা সম্পর্কে মানুষের মনে সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি করতে পারে যা বিচারব্যবস্থার পক্ষে কখনোই কাম্য নয়। মামলা পরিচালনার দায়িত্ব কে পাবেন, কোন বিচারপতির এজলাস সেই দায়িত্ব পাবে তা কখনই একতরফা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হওয়া কাম্য নয়। কলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে ঐতিহ্যশীল এইসব হাইকোর্টে এই নিয়ে একাধিক মামলায় তার পর্যালোচনা হয়েছে। কোন ধারায় বিচারপতিদের ‘রোস্টার’ তৈরি হয় তার রীতিও স্বীকৃত। তাহলে বারবার মামলা হস্তান্তর বা মামলা শুনতে বিচারপতিদের অনীহার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে কেন? 
এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এইসব অনভিপ্রেত ঘটনাবলি কোনও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ক্ষমতাবানরা, শাসকরা তাদের কর্তৃত্ব কায়েম করার অপচেষ্টা চালালে যুক্তিসংগত কারণেই বিচারব্যবস্থায় সংঘাতের পরিণতি ঘটতে পারে। সি বি আই আদালতের বিচারপতি বি এম লোয়া’র রহস্য মৃত্যুকে ঘিরে ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ ঘিরে এরকম প্রশ্নই উঠছে। বিচারপতি লোয়া যে মামলার বিচারের দায়িত্বে ছিলেন সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সেক্ষেত্রে একটা সংঘাতের ক্ষেত্র ছিল। এখন সুপ্রিম কোর্টে সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই মামলা এসেছে। সেই মামলা কোন বিচারপতির এজলাসে বিচার্য তা স্থির করার ক্ষেত্রে এবং একই সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার সর্বোচ্চ আদালতে বিচার নিয়ে কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে তা নিশ্চিতভাবেই অত্যন্ত উদ্বেগের। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে এব্যাপারে পদ্ধতি মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এসে যাচ্ছে বলেই এই চার বিচারপতিরা একযোগে প্রতিবাদ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। এটা তাঁদের কোনও ব্যক্তিগত অভিযোগ বলে মনে হয় না আমার। 
কাম্য না হলেও এটাই এখন বাস্তব পরিস্থিতি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিচার ব্যবস্থাকে ত্রুটি মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের বিচার প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাবানদের ঘোরাঘুরির এমন অভিযোগ স্বাধীন ভারতে আগে কখনো আসেনি। এই ঘটনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের মর্যাদা সবার ওপর। সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে সেই সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের সেই মর্যাদাকেও রক্ষা করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে  এই প্রতিষ্ঠানের গড়ে ওঠা মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজনে দেশের জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। 

Featured Posts

Advertisement