ন্যূনতম মজুরি, রেশনের
দাবিতে বিক্ষোভেরই প্রস্তুতি
চা বাগানে 

ন্যূনতম মজুরি, রেশনের<br> দাবিতে বিক্ষোভেরই প্রস্তুতি<br> চা বাগানে 
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৩ই জানুয়ারি— মুনাফার অঙ্কে ত্রিপুরার থেকে পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান ঢের এগিয়ে। চা বাগান এবং শ্রমিক সংখ্যার বিচারেও এরাজ্য অনেকটা ওপরের সারিতে। তবু ত্রিপুরার বাগানে যখন চা শ্রমিকরা ১৭৬টাকা মজুরি পেতে পারেন, তখন এরাজ্যের বাগান মালিকের তরফে শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ দৈনিক ১৩২টাকা ৫০পয়সা। আসলে এরাজ্যের তৃণমূলী সরকারকে পাশে পেয়েছে উত্তরবঙ্গের চা বাগান মালিকেরা।
তিনদিন পর আগামী ১৭ই জানুয়ারি উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠকের দিকে আর বিশেষ তাকিয়ে নেই চা শ্রমিকরা। ভোর থেকে রাত চড়া শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেই অভাবী চা শ্রমিক মহল্লায় এখন জোরদার প্রস্তুতি চলছে আগামী ১৮তারিখ থেকেই চা বাগানের গেটে বিক্ষোভের কর্মসূচি আছড়ে ফেলার। এই মুহূর্তে আলিপুরদুয়ারের চা বাগানে শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারে থাকা চা শ্রমিক সংগঠক রবীন রাই প্রশ্ন তুললেন যেখানে ত্রিপুরার ৫৫টি চা বাগান মালিক শ্রমিকদের ১৭৬টাকা মজুরি দিতে পারে সেখানে কেন এরাজ্যের বাগান মালিকরা দিতে পারে না? ত্রিপুরার বুকে চা শ্রমিকরা শুধু ১৭৬টাকা মজুরি পাচ্ছেন তাই নয়, তার সঙ্গে চা শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ধার্য মালিকের কাছ থেকে রেশন এবং খাদ্য সুরক্ষার ন্যায্য রেশনও পাচ্ছেন। আসলে ত্রিপুরার সরকার শ্রমিকদের পক্ষ নেয় আর এরাজ্যের সরকার বাগান মালিকদের হয়ে ওকালতি করে। তফাত এখানেই। 
আগামী ১৭ই জানুয়ারি উত্তরকন্যার বৈঠকে চা শ্রমিকদের জয়েন্ট ফোরাম অংশ নেবে এবং স্পষ্ট জানাবে সরকারের দেওয়া ভিক্ষে নয়, চাই ন্যূনতম মজুরি। শুধু তাই নয়, বাগান মালিকদের দেয় রেশনের ন্যায্য দাবি থেকেও একচুল সরে আসছেন না চা শ্রমিকেরা। আগামী ১৭তারিখ ঐ বৈঠকে নিশ্চিতভাবেই হাজির থাকবে রাজ্যের শাসকদলের অনুগত শ্রমিক ইউনিয়ন। কিন্তু জয়েন্ট ফোরামের সঙ্গে তাদের তফাত এখানেই তারা সরকার এবং বাগান মালিকদের হয়ে ওকালতি করবে। এই বৈঠকের ঠিক ৭দিন পরেই উত্তরকন্যা ঘেরাওয়ের অভিযানে নামছেন উত্তরবঙ্গের অভাবী চা শ্রমিকেরা। আগামী ২৪শে জানুয়ারি অবরুদ্ধ হবে বাগান মালিকদের হয়ে সাফাই গাওয়া রাজ্য প্রশাসন।
এদিকে নীরবে ডুয়ার্সের বন্ধ বাগানের শ্রমিক মহল্লায় একের পর এক মৃত্যু থাবা বসাচ্ছে। এখন আর অভাবী চা শ্রমিকদের তরফে সরকার, প্রশাসনকে জানানোরও কোনও তাগিদ নেই। কেননা চা শ্রমিকদের জীবনে একটার পর একটা নির্মম মৃত্যু নেমে আসার পরেও নির্বিকার এই তৃণমূলী সরকারের কাছ থেকে ছিঁটেফোঁটা সাহায্য মেলেনি। এই মুহূর্তে বন্ধ আলিপুরদুয়ারের গ্যারগ্যান্ডা চা বাগান। এখানেও কর্মহীন জীবনে ১৪০০শ্রমিক। বন্ধের তালিকায় রয়েছে হান্টাপাড়া চা বাগান। সেখানেও কর্মহীন স্থায়ী ১৮০০শ্রমিক এবং আরও ১২০০ অস্থায়ী শ্রমিক কর্মহীন। বন্ধ এই জেলার ডিমডিমা চা বাগান। ডানকানের মালিকানায় থাকা এই চা বাগান টি বোর্ডের ছাড়পত্র পায়নি। ২০১৪-১৫সাল নাগাদ এই বাগান বন্ধ হওয়ার পর থেকে নীরবে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু গ্রাস করছে। 
এখনো সপ্তাহ ঘোরেনি ডুয়ার্সের মাল ব্লকের সাইলি চা বাগানের গেটে তালা ঝোলার। স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক মিলিয়ে আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন, খাবারহীন অভাবী সংসার। চা শ্রমিকদের সংগঠক চানু দে জানালেন, বাৎসরিক শ্রাদ্ধশান্তির মতোই ঘুরে ঘুরে আসে একই মালিকের সাইলি এবং নয়া সাইলি —এই দুটি চা বাগানে তালা ঝোলানোর খেলা। ঠিক কোন সময়টা বাগান বন্ধ হয়? যখন বাগান মালিক নিজস্ব শর্ত শ্রমিকদের ওপর চাপানোর কৌশলে নামে। ঠিক তার আগেই আচমকা বাগানের গেটে তালা ঝুলিয়ে চা শ্রমিকদের অনাহার, অর্ধাহারের মধ্যে ফেলে দিয়ে চাপ সৃষ্টি চলে। এমনকি শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটির টাকাও বকেয়া রাখা হয়। বন্ধ হয়ে যায় বরাদ্দ রেশনটুকুও। তারপর বন্ধ বাগান খোলার ওপর শর্ত ঝুলিয়ে দেয় বাগান মালিক। শ্রমিকদের ঐ চুক্তিপত্রে সই করিয়েই চা বাগানে উৎপাদন চালু হয়। না, এমন শ্রমিক বিরোধী অমানবিক অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মৌনব্রত নেয়।
সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া নাগরাকাটার হিলা চা বাগান একসময় বামফ্রন্ট সরকারের অধীনস্ত ছিল। ওয়েস্ট বেঙ্গল টি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন পরিচালনা করতো হিলা চা বাগান। কিন্তু রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় বসার পর ডব্লিউ বি টি ডি সি-কে তুলে দিয়ে সব বাগান বেসরকারি হাতে তুলে দেয়। নাগরাকাটার হিলা চা বাগানও চলে যায় বেসরকারি হাতে। উত্তরবঙ্গে ডুয়ার্সের কোলে বন্ধের তালিকায় আলিপুরদুয়ারের বান্দাপানি চা বাগান। ২০১৪সালে এই চা বাগান রাজ্য সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। তারপর থেকে রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারই এই চা বাগানের মালিক। খোদ সরকার যে চা বাগানের মালিক সেই বাগানেরই ১০৫০জন চা শ্রমিক আজ কর্মহীন। কেউ কাঁচা চা পাতা তুলে বিক্রির পথে নেমেছেন। কেউবা এই শীতেও নদীতে পাথর কাটার কাজে নেমে কোনওমতে সংসারের খাবারের খোঁজে। রাজ্য সরকারের মালিকানায় থাকা এই চা বাগানেও শ্রমিকরা দেশের খাদ্য সুরক্ষার ন্যায্য পাওনা মাসে ৩৫কেজি চাল, গম পাচ্ছেন না। চাল ও গম মিলিয়ে সারা মাসে মোট ২২কেজি মিলছে। অর্থাৎ এই বাগানেও চা শ্রমিকদের ন্যায্য খাদ্য সুরক্ষা ছাঁটাই করছে খোদ রাজ্য সরকার!

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement