মাসের পর মাস খোঁজ নেই
ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া
চা শ্রমিকের

মাসের পর মাস খোঁজ নেই<br>ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া<br>চা শ্রমিকের
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: ধূপগুড়ি, ১৩ই জানুয়ারি- বাগান বন্ধ। কয়েক বছর ধরে কাজ নেই চা শ্রমিকদের। পেটের টানে স্ত্রী সন্তানকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ফেলে রেখে গেছেন চা বাগানে। কিছু আয়ের আশায় পাড়ি দিয়েছেন ভিন রাজ্যে। ডুয়ার্সের বিভিন্ন বন্ধ চা বাগান থেকে খুব স্বল্প মজুরিতে শ্রমিক সরবরাহের এই মওকা নিতে বাগানে বাগানে বিভিন্ন এজেন্ট বা দালাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনাহারী শ্রমিক পরিবারের কাছে প্রচুর আয়ের সুযোগ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ও নানা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শ্রমিক সরবরাহের জন্য মোটা কমিশনে আয় করছে বাগানেই থাকা এক অংশের দালাল বা এজেন্ট। সরকারি খাতায় এভাবে চলে যাওয়া শ্রমিকের কোন হদিশ বা তথ্য নেই। ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেকের খোঁজ মিলছে না। কারও এক বছর কারও দুবছর এমনকি কারও দশ বছরের বেশি সময় ধরে কোন খোঁজ খবর নেই। হতদরিদ্র এই সব শ্রমিকের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। সে কারণে চলে যাওয়া সদস্যের খোঁজ খবর করতে প্রশাসনের দরজায় ঘোরার সময় তাদের নেই। বন্ধ চা বাগান রেড ব্যাঙ্ক সুরেন্দ্র নগর ছাড়াও ডানকানের বন্ধ বাগান এবং কিছু চালু বাগান থেকে কাজ হারানো শ্রমিক পরিবারের কারও ছেলে, কারও মেয়ে, আবার কারও স্ত্রী বা স্বামী পরিবারের স্বচ্ছলতা আনার জন্য রোজগারের আশায় ছুটে গেছেন ভিন রাজ্যে। 
সম্প্রতি দুটি সেচ্ছাসেবী সংস্থা ধূপগুড়ি ব্লকের বন্ধ রেডব্যাঙ্ক চা বাগানে সমীক্ষা চালাতে গিয়ে দেখেছে এক শ্রমিক তাঁর বারো বছর বয়সি ছেলেকে একজনের হাত ধরে ভিন রাজ্যে পাঠিয়েছিল কিছু আয়ের জন্য। কিন্তু গত দশ বছর ধরে তার সন্ধান মেলেনি। দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পদু ওঁরাও নামের কিশোরকে। অন্য দিকে এই বাগানের চার্চ লাইনের পরন্তুশ ওঁরাও নামে আরেক শ্রমিক এক বছরের বেশি হয়ে গেল কেরালায় গিয়েছেন কাজ করতে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান আজও তাঁর কোন খোঁজ পাননি। এই দুটি ঘটনা সমীক্ষায় ধরা পড়ার পর দার্জিলিঙ জেলা লিগাল এইড ফোরাম লিখিত ভাবে দুদিন আগে জলপাইগুড়ি জেলা শাসক এবং পুলিশ সুপারকে লিখিত ভাবে জানিয়েছে। যদিও ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নিখোঁজ পরিবারগুলির পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ আসেনি ।এলে খতিয়ে দেখা হবে। পরন্তুস ওরায়ের স্ত্রী সবিতা ওঁরাও বললেন, বাগান বন্ধ হওয়ার পর অনাহারে থাকার অবস্থা হয়। এরপর স্বামী একজনের সঙ্গে গেল অন্য রাজ্যে কাজ করতে। এক বছরের বেশি হলো তার কোন খোঁজ নেই। এখন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন যাপন করছি। নদীতে পাথর ভেঙে কোনদিন ১২০ টাকা কোন দিন ১৪০ টাকা আয় হয়। তাতেই চালাতে হচ্ছে। গত দশ বছর ধরে নিখোঁজ কিশোর পদু ওঁরাও-র কাকা এতোয়া ওঁরাও বলেন, ভাইপোকে একজনের মাধ্যমে কাজে দেওয়া হলো। কিন্তু আজও তার খোঁজ নেই। যিনি নিয়ে গেছিলেন তিনিও আর যোগাযোগ রাখছেন না। রেড ব্যাঙ্ক বাগানের বড় বাবু পদে চাকরি করতেন দেবব্রত পাল। তিনি এখনো বাগান আঁকড়ে রয়েছেন যদি বাগান খোলে সেই আশায়। তিনি বলেন, চাকরি থাকলে অবসর নেওয়ার সময় প্রায় হয়ে আসছিল। এই বয়সে অন্য কোন কাজ করা সম্ভব নয়। তাই বাগানেই পড়ে আছি। দেবব্রত পাল বলেন, এই বাগান থেকে তিনশ জনের বেশি শ্রমিক ভিন রাজ্যে গেছেন। তাঁদের অনেকের খোঁজ মিলছে না। তাঁদের পরিবার কেউ নদীতে পাথর ভাঙেন, কেউ চায়ের দোকানে, হোটেলে গ্যারাজে কাজ করেন। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে দ্বিতীয় দফায় বাগান বন্ধ হওয়ার পর এই মৃত্যু উপত্যকায় অনাহার, অপুষ্টি, চিকিৎসার অভাবে ২০০-র বেশি মানুষ মারা গেছেন। বাগান খোলার আশার আলো কেউ দেখাতে পারছেন না। 
এবিষয়ে তৃণমূলের বানারহাট ব্লক সাংগঠনিক সভাপতি রাজু গুরুঙ সাংবাদিকদের জানান, এরকম শ্রমিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জানা নেই, খোঁজ নিয়ে দেখবো। ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক ডুয়ার্সের রেড ব্যাঙ্ক, সুরেন্দ্র নগর, ধরনিপুর, দেব পাড়া, লক্ষ্মী পাড়া, ডায়না, বিন্নাগুড়ি, হলদিবাড়ি ছাড়াও আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া, ডিমডিমা সহ ডানকানের সব বাগান এবং কাঁঠালগুড়ি, বান্দাপানি, জয় বীরপাড়া, ঢেকলাপাড়া সহ বিভিন্ন বাগানের শ্রমিক পরিবারের মানুষ ভিন রাজ্যে রয়েছেন। মহিলা এবং যুবক অংশের অনেকের বহুদিন থেকে কোন খোঁজ নেই। অনেক সন্তান অনাথ হয়ে পড়শিদের কাছে দিন কাটাচ্ছে। দুটি পাতা একটি কুড়ির দুনিয়াতে এক নতুন বিপদের জন্ম হচ্ছে। যার বিরাট প্রভাব পড়ছে এই সব অঞ্চলের সামাজিক জীবনে। সরকার প্রশাসন, মালিক পক্ষ সকলেই চা শ্রমিকদের সামাজিক জীবন নিয়ে উদাসীন থাকায় এই পরিণতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট জনেরা। ডুয়ার্সের বন্ধ চা বাগান শ্রমিকের অনাহারে যেমন মৃত্যুপুরী হয়েছে, তেমনই নিখোঁজের উপত্যকা হয়েছে। 

Featured Posts

Advertisement