শুধু প্রধান বিচারপতিই নন
প্রশ্নে সরকারের ভূমিকাও

শুধু প্রধান বিচারপতিই নন<br>প্রশ্নে সরকারের ভূমিকাও
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: নয়াদিল্লি, ১৩ই জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্টে কোন বেঞ্চে কোন মামলা যাবে, তা স্থির করার ক্ষেত্রে অনভিপ্রেত ঘটনাবলী দেখা যাচ্ছে বলে শুক্রবারই অভিযোগ করেছিলেন চার বরিষ্ঠ বিচারপতি। প্রধান বিচারপতিকে লেখা তাঁদের চিঠি এবং সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁদের এই মন্তব্যের পিছনে শুধু প্রধান বিচারপতির ভূমিকাই নয়, সরকারের ভূমিকাও একটি কারণ বলে আইনজীবী মহলের ধারণা। সরকার বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে শীর্ষ আদালতকে চাপ দিচ্ছে বলেও কোনও কোনও মহলে অভিযোগ। চার বিচারপতি আড়ালে থাকা এই গুরুতর ঘটনাকেই সামনে আনতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। স্পষ্ট ভাষায় না বললেও ‘গণতন্ত্র বিপন্ন’ এবং ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থা’ টিঁকিয়ে রাখতে হবে বলে মন্তব্য করে তাঁরা এই প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলে আইন মহলের ধারণা। 
বেঞ্চ বণ্টন এবং কোনও নির্দিষ্ট বিচারপতির বেঞ্চে গেলে এক ধরনের রায় পাওয়া যাবে, এই দুই ঘটনাই সাম্প্রতিক কালে সামনে এসেছে। গত বছরের নভেম্বরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত মামলায় বিচারপতি অরুণ মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ যে রায় দিয়েছিল তার মধ্যে ‘ফোরাম শপিং’ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল বরিষ্ঠ আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। কামিনী জয়সোয়ালের দাখিল করা সেই মামলায় অভিযোগ উঠেছিল ওডিশা হাইকোর্টের এক প্রাক্তন বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চকে প্রভাবিত করার (বস্তুত উৎকোচ দেবার) চেষ্টা করেছেন। সি বি আই ওই প্রাক্তন বিচারপতিকে গ্রেপ্তারও করেছিল। শীর্ষ আদালতকে প্রভাবিত করার অভিযোগ অসত্য এবং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা বলে অভিহিত করে শেষ পর্যন্ত আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। ওই রায়ের সময়েই শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ বলে, একই মামলা দুই বিচারপতির আদালতে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এক বেঞ্চে মামলা দাখিল হয়েছে তা গোপন করেই আরেক বেঞ্চে মামলা তোলার এই চেষ্টা ‘ফোরাম শপিং’ বা নিজের পছন্দমতো বেঞ্চ বেছে নেবার চেষ্টা। ওই রায়েই বলা হয়, প্রধান বিচারপতিই বেঞ্চ বেছে দেবেন, এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন তোলা যায় না। রায় যাই হোক, ওই মামলার শুনানি থেকে পছন্দ মোতাবেক বেঞ্চ গঠন এবং একেক বেঞ্চে একেক রকম রায় পাওয়ার ‘আশা’-দুই বিষয়ই সামনে চলে এসেছিল। 
শুক্রবার বিচারপতিদের বেনজির সাংবাদিক সম্মেলন সম্পর্কে আইনজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া সতর্ক। এই মহলের বক্তব্য, বিচারপতিদের সামাজিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রায়কে কিছু মাত্রায় প্রভাবিত করতে পারে। এই ‘মানব উপাদান’ বিচার প্রক্রিয়ার অঙ্গ। কিন্তু একেক বেঞ্চে একেক রকম রায় পাওয়ার পূর্বানুমান মারাত্মক। চার বিচারপতির অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে প্রধান বিচারপতিও তাঁর বরিষ্ঠ সহকর্মীদের অভিমত নিচ্ছেন না। বরং বরিষ্ঠ সহকর্মীদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এড়িয়ে অন্য বেঞ্চে পাঠাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ মামলা। অর্থাৎ এমন পূর্বানুমান তাঁর তরফেও রয়েছে। প্রধান বিচারপতির যেমন বেঞ্চ বণ্টনের অধিকার রয়েছে তেমনই তার কয়েকটি প্রথা ও বিধিনিয়ম চালুও রয়েছে। তা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে চার বিচারপতি অভিযোগ করেছেন। 
প্রধান বিচারপতির নিজস্ব কাজের ধারাই এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, এমন নয় বলেই আইনজীবীদের ধারণা। উঠছে বৃহত্তর প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক অধিকারে সরকারের তরফে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক উপাদানের প্রশ্নও উঠে এসেছে এই সূত্রেই। বি জে পি সভাপতির ভূমিকা যে মামলায় শুনানিতে আসতে পারে, সেই মামলা বরিষ্ঠ বিচারপতিদের বেঞ্চ থেকে সরানো হয়েছে বলে অভিযোগ। সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো সংঘর্ষ মামলার বিশেষ সি বি আই আদালতের বিচারপতির রহস্যমৃত্যুর সেই মামলা যে বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে, সেই বেঞ্চে সরকারপক্ষ বারংবার সুবিধা পাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নও উঠেছে। আইনজীবী মহলের বক্তব্য, শীর্ষ আদালতে এভাবে যদি প্রভাব খাটাতে সক্ষম হয় সরকার, তাহলে দেশের গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে। 
সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন শনিবার বৈঠকে বসে প্রস্তাব দিয়েছে, শীর্ষ আদালতে দাখিল হওয়া সব জনস্বার্থের মামলাই পাঁচ প্রবীণতম বিচারপতিদের বেঞ্চে পাঠানো হোক। এই পাঁচজনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য চারজনই শুক্রবার মুখ খুলেছিলেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement