সংকট কাটাতে আজ
বসতে পারেন প্রধান বিচারপতি

সংকট কাটাতে আজ<br> বসতে পারেন প্রধান বিচারপতি
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: নয়াদিল্লি, ১৩ই জানুয়ারি— চার বিচারপতির সঙ্গে রবিবার আলোচনায় বসতে পারেন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র। সুপ্রিম কোর্টে বিচারের দায়িত্ব বণ্টনে গণতান্ত্রিক রীতি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন চার বিচারপতি। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে যে গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে, সেকথা বলেছেন জে চেলমেশ্বর, রঞ্জন গোগই, মদন বি লোকুর এবং কুরিয়ান যোশেফ। 
কলকাতায় গোগই এবং কোচিতে যোশেফ একই সুরে শনিবার বলেছেন যে বিষয়টি কোনও ব্যক্তির বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। পরিস্থিতিকে সাংবিধানিক সংকট হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে শীর্ষ আদালতের স্বচ্ছতাই এখানে বিবেচ্য। শনিবার কেন্দ্রের প্রধান আইনি আধিকারিক অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে ভেনুগোপালও সমস্যা দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বিচারপতিদের কথাবার্তায় আলোচনায় বসার ইঙ্গিত মিলেছে।
শীর্ষ আদালত ঘিরে ওঠা গুরুতর সমস্যা সমাধানে শনিবারই সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল গড়ল বার কাউন্সিল। প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব বণ্টন প্রক্রিয়া ঘিরে এই চার বিচারপতির তোলা প্রশ্ন বিবেচনায় পূর্ণ বেঞ্চ গঠনের পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সভায় এই মর্মে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে শনিবার।
শনিবারই প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্র। তবে তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি প্রধান বিচারপতি। কেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব এভাবে দেখা করার চেষ্টা করলেন, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, সোমবারই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিরোধ মিটে যাবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করেই বিরোধ মিটিয়ে নেওয়া হবে বলে আশা করছি।
এদিন বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মননকুমার মিশ্র সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল গড়ার সিদ্ধান্ত জানান। তিনি বলেছেন, সর্বসম্মতিতে এই সাত আইনজীবীর নাম ঠিক করা হয়েছে। বিচারপতিদের সঙ্গে দেখা করবেন তাঁরা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমস্যা মিটিয়ে ফেলা উচিত। পাশাপাশি, বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আইনজীবী বিকাশ সিং বলেছেন যে, সব জনস্বার্থ আবেদনের মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি অথবা বরিষ্ঠ বিচারপতিদের দায়িত্ব থাকা উচিত। তিনি বলেন, বার অ্যাসোসিয়েশনের জরুরি বৈঠকে পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে।    
শুক্রবারই দেশের ইতিহাসে প্রথম সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি শীর্ষ আদালতের কার্যপদ্ধতিতে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। বরিষ্ঠ এই চার বিচারপতি সাংবাদিক সম্মেলন করে ক্ষোভ জানিয়েছেন। অভিজ্ঞতার বিচারে প্রধান বিচারপতির পরই রয়েছেন এই চার বিচারপতি। তাঁদের বক্তব্য, প্রধান বিচারপতি যে পদ্ধতিতে মামলার শুনানির দায়িত্ব দিচ্ছেন তা শীর্ষ আদালতের কর্মপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ মামলার দায়িত্ব বরিষ্ঠ বিচারপতিদের না দিয়ে তুলনায় কম অভিজ্ঞ বিচারপতিদের দেওয়া হচ্ছে। বিচারক ব্রিজগোপাল লোয়ার মৃত্যুর তদন্ত মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি যেভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চেলমেশ্বর সহ চার বিচারপতি। সোহরাবউদ্দিন শেখ ভুয়ো সংঘর্ষ মামলার বিচারক ছিলেন লোয়া। তাঁর মৃত্যু অস্বাভাবিক, অভিযোগ পরিবারের। এই মামলার অন্যতম পক্ষ বি জে পি সভাপতি অমিত শাহ। 
এদিন চার বিচারপতির অন্যতম কুরিয়ান যোশেফ বলেছেন, বিচারব্যবস্থা এবং বিচারের স্বার্থেই প্রকাশ্যে বক্তব্য জানাতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, এই ভূমিকা নিয়ে শৃঙ্খলা ভাঙা হয়নি। তিনি বলেন, দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। একটি মালয়ালম চ্যানেলের প্রশ্নে তাঁর মত, প্রকাশ্যে সরব হওয়ায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের স্বচ্ছতা বাড়বে। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টই মতানৈক্য মিটিয়ে নিতে পারবে। বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের দরকার নেই। 
ক্ষুব্ধ বিচারপতিদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টকে রক্ষা করা না গেলে দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করা যাবে না। সেই কারণেই বিষয়টি কেবল প্রধান বিচারপতির বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নেই বলেই অভিমত অভিজ্ঞ একাংশের। দেশের শীর্ষ আইনজীবীদের অনেকে মামলার শুনানির দায়িত্বের সঙ্গে বিচারবিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। সুপ্রিম কোর্টে বহু মামলাতেই কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষভুক্ত থাকে। মামলার শুনানির দায়িত্ব ভাগ করার ক্ষেত্রে সরকারের পছন্দ বিবেচিত হওয়ার অভিযোগ, সেই কারণে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীন ভূমিকায় হস্তক্ষেপের শামিল। যেখানে সংবিধান অনুযায়ী দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মূল তিনটি স্তম্ভ হলো আইনসভা, বিচারব্যবস্থা এবং সরকারের স্বাধীন ভূমিকা প্রয়োজন। 
সাংবাদিক সম্মেলনের দুমাস আগে পদ্ধতিজনিত প্রশ্ন তুলে প্রধান বিচারপতিকে চিঠিও দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু, প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র সেই চিঠির কোনও উত্তর দেননি। সম্প্রতি, একটি মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফে বিচারবিভাগে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত আবেদনে বিচারপতি চেলমেশ্বর বিচারবিভাগীয় বেঞ্চে বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ খারিজ করে বলা হয় প্রধান বিচারপতিই কেবল বেঞ্চ গঠনের নির্দেশ দিতে পারেন। তাৎপর্যের হলো, চার বিচারপতির চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের রীতির উল্লেখ করে বলা হয়েছে প্রধান বিচারপতি ঊর্ধ্বতন নন। প্রথম হলেও তিনিও বাকিদের সমান। বেঞ্চ গঠনের ক্ষেত্রে শীর্ষ আদালতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার রীতিও স্মরণ করিয়েছেন চার বিচারপতি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement