আধার-উধার সংযোগে
জনগণ জেরবার 

কেন্দ্র-রাজ্যে লুটের রাজ
 বললেন মহম্মদ সেলিম 

আধার-উধার সংযোগে<br> জনগণ জেরবার 
+

পীযূষ ব্যানার্জি : মালদহ - ১৩ই জানুয়ারি- একজন আছে আধার নিয়ে। অন্যজন ব্যস্ত শুধু উধার (ধার) করতে। আধার-উধার লিঙ্কে জনগণ জেরবার।
আচ্ছে দিন আনার মোদী সরকার আর পরিবর্তনের মমতা সরকারের কাজকর্ম যে একই তা তুলে ধরে সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম বললেন, ‘দিল্লিতে আধার। রাজ্যে উধার। দুজনেই এক হয়ে এধার কা মাল উধার করছে।’ পার্টির মালদহ জেলা ২২তম সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে এদিন বক্তব্য রাখেন সাংসদ মহম্মদ সেলিম।
আধার নিয়ে জনগণের হয়রানির শেষ নেই। মোবাইল থেকে ব্যাঙ্ক। গরিবের ভাতা থেকে ঋণ- চাই আধার সংযোগ। আর গত ছয় বছরে এরাজ্যে এমন একটা সরকার এসেছে যারা স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬৪বছরে যত ঋণ হয়েছে তাকে টপকে যেতে বসেছে এখনই। 
সেই আধার-উধার সংযোগে জেরবার জনগণের কাছে দুই সরকার কীভাবে ‘ইধার কা মাল উধার’ করছে তার উদাহরণ তুলে সাংসদ বলেন,‘ কালো টাকা উদ্ধার করে সবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫লাখ টাকা ভরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কালো টাকা তো ফিরলই না। উলটে নোটবন্দির নামে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা হলো। দেশবাসীর অ্যাকাউন্টে সব ভোঁ ভাঁ।’ আর গত ছয় বছরে বাজার থেকে ধার করায় এরাজ্যকে দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানে নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকারের ‘ইধার কা মাল উধার’ প্রসঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘শাসকদলের নেতা মন্ত্রীরা মিলে চিট ফান্ডে জড়িত থেকে গরিব মানুষের টাকা লুট করল। তখন সামনে পঞ্চায়েত ভোট। মমতা ব্যানার্জি বললেন, গরিবের টাকা ফেরত দেব। শ্যামল সেন কমিশন তৈরি করলেন। এয়ারপোর্টে অর্থমন্ত্রীকে পাঠিয়ে তড়িঘড়ি করে বিল এনেছিলেন। কিন্তু মানুষ কি টাকা ফেরত পেলেন? এখানেও সব ভোঁ ভাঁ।’ 
শুধু কি চিট ফান্ডে টাকা রেখে সর্বস্বান্ত হওয়া?
সমাবেশের মাঠে একধারে বসেছিলেন হরিশ্চন্দ্রপুরের সাং ঝিকডাঙ্গা গ্রামের রবিতুল ইসলাম। ১৩বিঘা জমির মধ্যে ১১বিঘাতে ধান আর বাকিতে তুঁত চাষ করেছিলেন কৃষক। তারপর? ‘ আর তিন-চারদিন হলেই ধানে শীষ আসতো। ধানটা গাবো হয়ে উঠছিল। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল পানিতে। চিহ্নমাত্র নাই আর।’ বন্যায় ফসল হারানো কৃষক রবিতুল ইসলামের আর্তি ঝরে পড়ছিল সমাবেশের মাঠে। হরিশ্চন্দ্রপুর, রতুয়া, কালিয়াচক, ওল্ড মালদহে এবারের বিধ্বংসী বন্যায় সব হারিয়েছে কৃষক। কিন্তু মেলেনি ছিটেফোঁটা ক্ষতিপূরণ। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ‘উধার’ নেওয়া সরকার কৃষকের পাশে নেই। তাই গ্রাম ছাড়ছেন মানুষ। এখন আরও বেশি সংখ্যায়। ‘ছেলেমেয়েরা সব খাবার জন্য কাঁদছে। বাবা, মা কান্নার রোল শুনতে পারবে? তাই জয়পুর, দিল্লি যাচ্ছে সবাই। ভালো ভালো সম্মানী ঘরের লোক সব এবার খাটতে গেছে।’ বলছিলেন রতুয়ার আকমানউদ্দিন। গ্রাম থেকে আসা অভাবী মানুষকে শুনিয়েই এদিন মহম্মদ সেলিম বলছিলেন, ‘ভোটের সময় হেলিকপ্টার চড়ে দিদিমণি প্রচার করেন। আর এবারের মানুষ অপেক্ষায় থাকল, এই বুঝি হেলিকপ্টার থেকে খাবার আসবে। জল দেবে। এখনও একজন কৃষক তার ফসলের ক্ষতিপূরণ পেল না। যে মানুষ মারা গেল তার ক্ষতিপূরণ হলো না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষকে কী করে আগলাতে হয় আমরা ৩৪বছরে দেখিয়েছি।’ সমাবেশে আসা মানুষ মেলাচ্ছিলেন নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে। 
এদিন মহানন্দা কলোনির তাঁতিপাড়ার মাঠে সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে এরকম হরেক অভিজ্ঞতার বিনিময় চলছিল বক্তা আর শ্রোতাদের মধ্যে। সি পি আই (এম) নেতা মইনুল হাসানই যেমন বলছিলেন, ‘দিল্লিতে একটা সরকার আছে। তার প্রধানমন্ত্রী স্লোগান দেন, সবকা সাথ। সবকা বিকাশ। তা কী বিকাশ আমরা দেখছি? তিন বছরে ফসলের দাম না পেয়ে কৃষক আত্মহত্যা করছে। ছেলেমেয়েদের কোনও কাজ নেই। এরাজ্য থেকে ওরাজ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।  দেশজুড়ে বাড়ছে নারী নির্যাতন। নির্ভয়াকাণ্ডের পর থেকে দিল্লিতে ৫টি এই ধরনের ঘটনা ঘটে গেছে। তবু এই সরকার ভোটে জিতেছে কেন? এর পিছনে কোনও বিকাশ কাজ করছে না। ধর্মীয় মেরুকরণে জিতছে।’ মোদীর শাসনে গোটা দেশের মতো এরাজ্যে মমতা শাসনেও যে একই হাল তার উল্লেখ করে সি পি আই (এম) নেতা সোমনাথ ভট্টাচার্য বলেন,‘ বছরের শুরু সবে। এখন পথে ঘাটে দেখা হলে হ্যাপি নিউ ইয়ার বলা হচ্ছে। আমিও আপনাদের শুভ নববর্ষ বলছি। কিন্তু বলতে গিয়ে বিবেকের একটা দংশন হচ্ছে। যে রাজ্য শিশু পাচারে এক নম্বর, নারী নির্যাতনে দুই, জাল নোটে তিন নম্বরে সেই পশ্চিমবঙ্গকে সর্বনাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মোদী ও মমতা এই দুই সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে।’
৫৯১টি শাখার বিশেষ অধিবেশন, ২৪টি এরিয়া কমিটির সম্মেলন শেষ করে এদিন থেকে ওল্ড মালদহের মীন ভবনে শুরু হয়েছে সি পি আই (এম) মালদহ জেলা ২২তম সম্মেলন। সম্মেলনের প্রতিনিধি অধিবেশনের উদ্বোধন করে সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অমিয় পাত্র বলেন, ‘মালদহের পার্টিকর্মীদের গভীরভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে বুঝতে হবে। এই জেলারই আফরাজুল খানকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এইরকমভাবে গোটা দেশে আটজনের প্রাণ গেছে। গোরক্ষার নামে একদল গোগুন্ডা তৈরি হয়েছে। দিল্লি বলুন, রাজ্যে বলুন একই সরকার চলছে। খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম। তাই এই পরিস্থিতিতে পার্টির গণভিত্তি আমাদের বাড়াতেই হবে। গাঁয়ের খেতমজুরদের মধ্যে ফের জাগিয়ে তুলতে হবে পার্টিকে।’
প্রকাশ্য সমাবেশের মঞ্চ থেকে গরিবের মধ্যে পার্টি গড়ে তোলার সেই ডাকই এদিন দিয়েছেন অম্বর মিত্র ও খগেন মুর্মু। অম্বর মিত্র বলেন, ‘৬টি আসন জিতে ৩৮টি আসনের জেলা পরিষদ পরিচালনা করছে তৃণমূল। এইভাবেই ওরা ভয়, প্রলোভন দিয়ে দখল করেছে জেলা পরিষদ, গ্রাম পঞ্চায়েত। সামনের পঞ্চায়েত ভোটে আমাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। তার আগে আমাদের নিজেদের শক্তি বাড়াতে হব।’ একইভাবে আগামী পঞ্চায়েত ভোটে লালঝান্ডার জয়কে সুনিশ্চিত করার কথা বলেন বিধায়ক খগেন মুর্মু।
এদিন সম্মেলনের শুরুতে রক্তপতাকা উত্তোলন করেন প্রবীণ পার্টিনেতা যুগল কিশোর চক্রবর্তী। শহীদবেদীতে মাল্যদান করেন পার্টিনেতা মহম্মদ সেলিম, অমিয় পাত্র, মইনুল হাসান, রমা বিশ্বাস, সোমনাথ ভট্টাচার্য, পার্টির মালদহ জেলা কমিটির সম্পাদক অম্বর মিত্র। বিশ্বনাথ ঘোষ, ছবি দেব, নৈমুদ্দিন শেখ, ভোলা উপাধ্যায় ও কাইসুল হককে নিয়ে গঠিত সভাপতিমণ্ডলী পরিচালনা করছেন সম্মেলন। রবিবার পর্যন্ত সম্মেলন চলবে। 

Featured Posts

Advertisement