কমরেড এস পি লেপচার জীবনাবসান 

কমরেড এস পি লেপচার জীবনাবসান 
+

নিজস্ব সংবাদদাতা: শিলিগুড়ি, ১২ই ফেব্রুয়ারি—প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা ও সি পি আই (এম) দার্জিলিঙ জেলা কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক কমরেড সাঙদোপাল লেপচার জীবনাবসান ঘটেছে। সোমবার সকালে শিলিগুড়ির প্রধাননগরের একটি নার্সিংহোমে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২। বার্ধক্যজনিত রোগে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভুগছিলেন। কমরেড লেপচা শিলিগুড়ির শহীদনগরে ছেলের কাছে থাকতেন। 
কমরেড সাঙদোপাল লেপচা, এস পি লেপচা হিসাবেই সর্বত্র পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পার্টিকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। শহীদনগরের বাসিন্দাদের সাথেও ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। সেখানকার অনেক বাসিন্দা এদিন সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে নার্সিংহোমে চলে আসেন। দার্জিলিঙে সিঙটামেও এদিন এস পি লেপচার মৃত্যুসংবাদ পৌঁছালে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। মূলত এই চা বাগান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। কমরেড এস পি লেপচার জীবনাবসানে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু ও সি পি ‌আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। 
এদিন সকালে প্রবীণ সি পি আই (এম) নেতার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে নার্সিংহোমে পৌঁছে যান সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোক ভট্টাচার্য, সি পি আই (এম) দার্জিলিঙ জেলা সম্পাদক জীবেশ সরকার, পার্টিনেতা নুরুল ইসলাম, দিলীপ সিং, সভাধিপতি তাপস সরকার, মহিলা নেত্রী স্নিগ্ধা হাজরা প্রমুখ। 
নার্সিংহোম থেকে তাঁর মরদেহ এদিন দুপুরে সি পি আই (এম) দার্জিলিঙ জেলা দপ্তর অনিল বিশ্বাস ভবনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে রক্তপতাকা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান অশোক ভট্টাচার্য ও জীবেশ সরকার। মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নুরুল ইসলাম, পরিমল ভৌমিক, দিলীপ সিং, সভাধিপতি তাপস সরকার, প্রবীণ নেতা সীতাংশু ব্যানার্জি, স্নিগ্ধা হাজরা প্রমুখ। এছাড়াও বিভিন্ন গণসংগঠন ও গণশক্তি পত্রিকার পক্ষ থেকেও মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত কমরেডের ছেলে কিরণ লেপচা মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রয়াত কমরেডের মরদেহ এদিন দুপুরে দার্জিলিঙে সিঙটামের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আগামী বুধবার তাঁর মরদেহ সমাধিস্থ করা হবে। এদিন অশোক ভট্টাচার্য বলেন, পাহাড়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। জীবেশ সরকার বলেন, কমরেড এস পি লেপচার মৃত্যুতে পার্টির ক্ষতি হলো। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য বিমান বসু কিছুদিন আগে শিলিগুড়িতে এসে অসুস্থ এস পি লেপচার সাথে দেখা করে গেছেন। 
১৯২৭ সালের ১৫ই মে দার্জিলিঙের প্লাঙডাঙ চা শ্রমিক বস্তিতে কমরেড এস পি লেপচার জন্ম হয়। তাঁর বাবা পুসাঙ লেপচা ও মা ডোলমি ওই বস্তিতেই থাকতেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর তিনি দার্জিলিঙের সিঙটাম চা বাগানের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রায় ৭বছর তিনি শিক্ষকতা করেছেন। সবার সাথে সহজেই মিশে যেতেন তিনি। ফলে ওই বাগানে শ্রমিকদের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সময় সিঙটাম চা বাগানের শ্রমিকরা তাঁদের কিছু দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু করেন। চা বাগানের শ্রমিকদের এই আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। মালিকপক্ষ বাধ্য হয় আলোচনায় বসতে। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি তাঁকে খোয়াতে হয়। এই সময়েই তিনি দার্জিলিঙের অবিসংবাদী কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত কমরেড রতনলাল ব্রাহ্মণ, কমরেড সুশীল চ্যাটার্জির সংস্পর্শে এসেছিলেন। ১৯৪৯ সালে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন তিনি এবং পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। কমরেড রতনলাল ব্রাহ্মণের সাথে তিনি পাহাড়ে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করেছেন।
পাহাড়ে চা বাগান শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তুলতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন তিনি। পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে বহু রাত তিনি চা শ্রমিকদের ঘরেই কাটিয়েছেন। চা শ্রমিকদের কাছে অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর সময়কালেই গড়ে ওঠে চা শ্রমিকদের সংগঠন চিয়া কামান মজদুর ইউনিয়ন। এই সংগঠনের সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। শুধুমাত্র চা শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলাই নয়, দার্জিলিঙ পার্বত্য এলাকায় পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি এক উজ্জ্বল ভূমিকা গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সি পি আই (এম) দার্জিলিঙ জেলার সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত হন। দীর্ঘ কুড়ি বছর তিনি জেলার পার্টি সম্পাদক ছিলেন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ২০১৩ সালে পার্টি সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি নেন। সম্পাদক হিসাবে পাহাড় সমতল সর্বত্রই তাঁর ছিল অবাধ গতি। দীর্ঘদিন তিনি পার্টির রাজ্য কমিটিরও সদস্য ছিলেন। 
পাহাড় সমতলের মেলবন্ধনের অন্যতম প্রতীক ছিলেন কমরেড এস পি লেপচা। ১৯৮০সালে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন। পরে ১৯৯৯সালে সি পি আই (এম) প্রার্থী হিসাবে দার্জিলিঙ লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন তিনি। পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন সমস্যার কথা তিনি সংসদের উভয় কক্ষেই সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। দার্জিলিঙ গোর্খা পার্বত্য পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আশির দশকে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় পাহাড়ে তাঁর বাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত পাহাড় ছাড়ার হুমকি। কিন্তু সমস্ত ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে কমরেড এস পি লেপচা তাঁর পাহাড়ের ভিটা কখনও ছাড়েননি। 
প্রয়াত কমরেডের সহজসরল জীবনযাত্রা সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করতো। পার্টিকর্মীদের সাথেও ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। মৃদুভাষী সহজ সরল হলেও রাজনৈতিক মতাদর্শগতভাবে তিনি দৃঢ় মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রীকে রেখে গেছেন। 

Featured Posts

Advertisement