চিমতে হালামের অম্লান
স্মৃতিই সতর্ক রাখে পাহাড়ি গ্রামকে 

চিমতে হালামের অম্লান<br>স্মৃতিই সতর্ক রাখে পাহাড়ি গ্রামকে 
+

চন্দন দাস: দামছড়া, ১২ই ফেব্রুয়ারি— বড়জোর একশো মিটার ব্রিজটার দৈর্ঘ। লোহার বানানো। মাঝে মাঝে মরচে পড়ে ফাঁকা হয়েছে মেঝে। সেতুর নিচে পাথর টপকে টপকে ধীরে বহে লঙ্গাই। সে নদীর ওপারে অন্যরাজ্য। এপারে, লোহার ব্রিজে ত্রিপুরার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সংকেত— ‘ওয়েলকাম টু মিজোরাম।’
উত্তর ত্রিপুরার পার্বত্য, ছোট জনপদ দামছড়া। ককবরক ভাষায় জায়গাটির নাম দামছেড়রা। নানাভাবে হয়ে গেছে দামছড়া। মাত্র দেড়-দুই কিমি দূরে আর একটি রাজ্যের সীমান্ত। ওপারে আসাম। দামছড়ায় প্রতি মঙ্গলবার হাট বসে। আসলে বড় বাজার। মিজোরাম থেকে ‘বার্মিজ কম্বল’, বিদেশি সিগারেট, সিগার আসে বাজারে। আসাম থেকে আসে প্রধানত সবজি — শীতে কপি, কড়াইশুঁটি, শাকসহ আরও কিছু। আর আসে ভুষিমাল। দামছড়া তো বটেই, ত্রিপুরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ধর্মনগরের আশপাশ থেকে জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি পথ উজিয়ে আসে ধান, ডাল, তেল প্রভৃতি। আর আসে শুটকি— নানা ধরনের। রাস্তার পাশে মুড়ি, চানাচুর, বাদাম, টকজল মেশানো নাগরিক পেটের পক্ষে নিশ্চিত অম্বলের মিশ্রণের ফেরিওয়ালা রমেন্দ্র রিয়াঙের কথায়, ‘‘আমরা তো শুটকি খাই। কিন্তু মিজোরামের লোকও দেদার শুটকি মাছ খায়।’’
প্রত্যন্ত, ত্রিপুরার সর্বোচ্চ, সীমান্ত লাগোয়া দামছড়া জনপদ আসলে আন্তঃরাজ্য একটি বড় ব্যবসা কেন্দ্র— আবার তিন রাজ্যের সীমান্তবর্তী বহু মানুষের সুখদুঃখের ধারকও বটে। 
এখানেই ১৯৯১-এ খুন হয়েছিলেন চিমতে হালাম। এক যুবতী। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। খাদ্যের দাবিতে রাজ্য সরকারের গোডাউন ঘেরাও করেছিলেন দামছড়া, পিপলাছড়া, থুমসরাইয়ের মতো জঙ্গলঘেরা গ্রামের মানুষ। জুটেছিল গুলি। পেটে গুলি লেগেছিল সেই আসন্ন প্রসবার। মৃত্যু হয়েছিল একই সঙ্গে সন্তানের আশায় থাকা মা আর সূর্যের আলোয় মাথা তোলার অপেক্ষায় থাকা সন্তানের।
সংগ্রামের মৃত্যু হয়নি। জোট সরকারের হাত থেকে শাসনভার ছিনিয়ে আনতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল দামছড়া থেকে ধর্মনগর, পানিসাগর— প্রতিটি এলাকা।
আজ খাদ্যের দাবি? না, নেই দামছড়ায়। বিদ্যুৎ প্রায় প্রতিটি গ্রামে। পাকা রাস্তা? একশো ভাগ। তবু আজও সভার আগে সেই রমণীর নামোচ্চারণ এক রীতিতে পরিণত হয়েছে দামছড়ায়। শুধুই বামপন্থীদের, সন্দেহ নেই। কারণ মুখের বলিরেখাগুলিকে প্রতিক্রিয়ার দাপটে আরও তীব্র করে তুলে খুনতি রিয়াঙ বললেন,‘‘যত্তদিন দামছড়া থাকবে, তত্তদিন চিমতে হালাম থাইকবে। আর এই যে আমাদের রেশনের চাল কইমকে দিল মুদি সরকার, তাও তো আবার আগের সময়ের ভয় এনে দিল। চিমতে হালামকে কে মেরেছিল? কংগ্রেস তো? তারাই এখন বি জে পি হয়েছে। এগো কথা বিশ্বাস করন লাগে?’’
রেশনে মাথাপিছু চাল কম করে দেওয়া দামছড়ার মতো পানিসাগর বিধানসভা এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এখানেও ‘ভিলেজ’ গুলিতে পদ্ম ফুল মার্কা এন্তার পোস্টার, ফেস্টুনের সঙ্গে হাজির হয়েছে ‘চলো পালটাই’ স্লোগান।
পালটাবো? কিন্তু বি জে পি কি ভালো করবে? প্রশ্ন শম্ভু দে-র। বয়স ২২। শম্ভুর ডাক নাম সুমন। মাসির দেওয়া তাঁর এই নামটিই বেশি পছন্দ। শম্ভু তথা সুমনের ঠাকুরদার বাড়ি ছিল ঢাকায়। বাবা মিজোরাম সরকারের অধীনে পূর্তদপ্তরে কাজ করতেন। পোস্টিং ছিলেন দীর্ঘদিন দামছড়া লাগোয়া মিজোরামের জেলাগুলিতে। বাবা অবসর নিয়ে দামছড়ার মোড়ে দোকান দিয়েছেন। বিকালে লুচি তরকারি পাওয়া যায়। সারাদিন পান, সিগারেট, বোতলের জলের মতো হরেক জিনিসের বিকিকিনি হয় সেখানে। তাঁদের দোকান থেকে জঙ্গলের মাথা আর পাহাড়ের পাদদেশ দেখা যায় চমৎকার। সুমন গাড়ি চালায়। তাঁর এক দাদা সেকেন্দ্রাবাদে কাজ করে। সুমনের কথায়,‘‘বি জে পি জোর প্রচার করছে — চলো পালটাই। কিন্তু আমাদের এখানে ওপার বাংলার অনেক মানুষ। আসামে কিছুদিন আগে জোর গোলমাল হলো। সব খবর আসে এখানে। তালিকা হচ্ছে ওখানে— কে ইন্ডিয়ান, কে নয়। খুব ভয় পেয়েছে লোকে। এখানে এসে বাজারে সব বলাবলি করে। আমরাও যখন যাই, শুনতে পাই। এখন গোলমাল একটু কম। কিন্তু ভয়টা আছে। ত্রিপুরায় বি জে পি জিতলে এমন করতেই পারে। পেটের ধান্দায় ঘুরবো? নাকি এসব নিয়ে টেনশনে মরবো?’’ যুবক সুমনের সোজা কথা — ‘‘দেখুন দাদা, কোনও পার্টি ভাত দেবে না। কিন্তু শান্তিটা দিতে পারে। কাড়তেও পারে। আমার কি দরকার ঝামেলা ডেকে আনা?’’
দামছড়া পাহাড়ের মাথায় সূর্যকে রেখে সাপের মত রাস্তাটা বেয়ে কিছুটা পথ হেঁটে নামছিলাম। পথে অজিতকুমার দাসের সঙ্গে দেখা। তাঁর সঙ্গে সাংসদ জীতেন্দ্র চৌধুরি। আরও কয়েকজন। তাঁরা বামফ্রন্টের কর্মী সবাই নয়। কয়েকজন মিছিলে, মিটিঙে কোনোকালে না যাওয়া ‘ফরেস্ট ভিলেজার’। নানা কথার মাঝে এক গ্রামবাসী এগিয়ে এলেন— উপেন রিয়াঙ। দামছড়া এলাকায় রিয়াঙ সম্প্রদায় বেশি। তাঁর বক্তব্য, বি জে পি একদল কর্মী তাঁদের গ্রামে গিয়ে ৩কেজি চাল, ২কেজি ডাল, ডালের প্যাকেটে গোঁজা একটি ছোট সরষের তেলের কৌটা দিয়েছে। আর বলেছে —  ‘ভোটটা দিও। বামফ্রন্ট অনেক হয়েছে।’ গ্রামবাসীদের অনেকেরই বিষয়টি ভালো লাগেনি। তাঁরা ছুটে এসেছে দামছড়া গাড়ি স্ট্যান্ডে। সেখানে সি আই টি ইউ-র অফিস। জানাতে হবে। অকস্মাৎ প্রার্থী আর এম পি-র সঙ্গে দেখা। ঘিরে থাকা গ্রামবাসীদের কথা শুনে কিছু কথা বললেন জীতেন্দ্র চৌধুরি। চাল, ডাল, তেল ফেরত দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন গ্রামবাসীরা।
পরে সভা হলো। যেখানে তিনটি রাজ্যের ব্যবসায়ীরা হাজির হন প্রতি মঙ্গলবার, সেই বাজারে পাতা হাজার দেড়েক চেয়ার বোঝাই। দাঁড়িয়ে আরও অনেকে। সেই সভাতে পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন জীতেন্দ্র চৌধুরি, অজিতকুমার দাস, আসামের সি পি আই (এম) নেতা যজ্ঞেশ্বর দাসরা। 
তখনই গুটি গুটি মঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ালেন জনা তিরিশ মহিলা, পুরুষ। কি ব্যাপার? আশপাশের মানুষেরও আগ্রহ। ঘন ঘন তাকাচ্ছেন তাঁদের দিকে। অজিতকুমার দাসের কাছে সেই মহিলা, পুরুষরা নিজেদের ইচ্ছা জানালেন। 
কী ইচ্ছা? সি পি আই (এম)-র কাজকর্মে তাঁরা থাকতে চান। ভোটও দিতে চান কাস্তে হাতুড়িতে। এরা কারা? সব আই পি এফ টি-র কর্মী। আশপাশের মানুষের প্রশ্ন বোঝাই নজরের মানে এবার বোঝা গেল।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement