তড়িৎ গতিতেই
বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

সরকারের যোগ্য সংগতে বেসরকারি কোম্পানি

তড়িৎ গতিতেই<br>বেড়েছে বিদ্যুতের দাম
+

পীযূষ ব্যানার্জি: কলকাতা, ১২ই ফেব্রুয়ারি— সরকার বাড়িয়েছে ১১২শতাংশ দাম! যোগ্য সংগত দিয়েছে বেসরকারি কোম্পানিও। তাদের হাতে দাম বেড়েছে ৯৪শতাংশ। 
গত নয় বছরের মধ্যে তড়িৎ গতিতেই বেড়েছে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম। 
মাথার ওপর গরমকালে ঘুরছে একটা পাখা। শীতকালে সেই পাখাও বন্ধ। সন্ধ্যা নামলে জ্বলছে টিউবলাইট। একটা বা দুটো ঘর থাকলে আগে যে টাকা বিদ্যুৎ বিলে খরচ হতো এখন সেই খরচ বেড়েছে বহুগুণ। বিদ্যুতের বিলের টাকা জোগাড় করতে নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্ত থেকে গরিব মানুষের। 
কেন বাড়ছে বিদ্যুৎ বিল?
২০০৮-০৯সালে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি এলাকায় বিদ্যুতের জন্য ইউনিট পিছু দাম ছিল ৩টাকা ৩৫পয়সা। এখন সেই দাম বেড়ে হয়েছে ৭টাকা ১২পয়সা। মাঝে ১৮বার দাম বেড়েছে বিদ্যুতের। ২০১১সালে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাত বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৪বার। ফলে ইউনিট পিছু বাড়তি দাম মেটানোর জন্য বাড়তি খরচ হচ্ছে ৩টাকা ৭৭পয়সা। শতাংশের বিচারে দাম ১১২শতাংশ দান বেড়েছে সরকারি বিদ্যুতের। 
সি ই এস সি এলাকায় কতটা বেড়েছে বিদ্যুতের দাম?
সি ই এস সি এলাকায় এখন ইউনিট পিছু বিদ্যুতের দাম ৭টাকা ৩১পয়সা। ২০০৭সালে সি ই এস সি গ্রাহকদের কাছ থেকে ইউনিট প্রতি দাম নিতো ৩টাকা ৭৬পয়সা। শতাংশের বিচারে ৯৪শতাংশ বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে সি ই এস সি এলাকার গ্রাহকদের।
গ্রাহকদের বোঝা এখানেই শেষ নয়। রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি এলাকায় বর্তমানে ১কোটি ৭৯লক্ষ বিদ্যুৎ গ্রাহক আছেন। তাদের কাছে তিন মাসে একবার বিদ্যুৎ বিল আসে। বিদ্যুতের ইউনিট পিছু খরচ বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলেও কোপ মারছে সরকার।
কীভাবে?
ধরা যাক, কোনও গ্রাহক প্রথম মাসে ১২০ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করল। তার পরের দু মাসে খরচ হলো যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ইউনিট। বিদ্যুৎ বিল পাঠানোর সময় বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি তিন মাসের খরচ হওয়া মোট ইউনিট যোগ করে তার ভিত্তিতে বিল পাঠাবে গ্রাহকদের কাছে। ফলে এক্ষেত্রে ৩৭০ইউনিট যোগ করে বিল পাঠাবে। যার পরিণতিতে ইউনিট খরচ বেশি হওয়ার দরুন বিদ্যুতের দাম বহু গুণ মেটাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। কেন প্রতি মাসের বিদ্যুৎ খরচের বিল প্রতি মাসে আসবে না, এই প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকরাই। কিংবা, তিন মাসে যত ইউনিট বিদ্যুৎ পুড়ল তাকে তিন দিয়ে ভাগ করে মাসের বিল আসবে না, এই সংগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। 
একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিলে গ্রাহকদের ওপর বাড়ছে চাপ। আবার এম ভি সি এ-র মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলে বাড়তি টাকা আদায় করে নিচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি দুই বিদ্যুৎ কোম্পানি। এম ভি সি এ (মাল্টি ভেরিয়েবল কস্ট অ্যাডজাস্টমেন্ট) কী?
 বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা যদি মনে করে নানা কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়েছে তারজন্যই এই ‘এম ভি সি এ’(মাল্টি ভেরিয়েবেল কস্ট অ্যাডজাস্টমেন্ট) ব্যবস্থা চালু আছে। অর্থাৎ উৎপাদন সংস্থা যদি দেখে রেলের মাশুল বৃদ্ধির জন্য কয়লা আনার খরচ বেড়েছে বা কয়লার দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে তখন হিসাব করে ‘এম ভি সি এ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকদের ওপর সেই বাড়তি খরচ চাপানোর ব্যবস্থা আছে। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এম ভি সি এ নিতে হলে কী কারণে বর্ধিত দাম নেওয়া হচ্ছে তার সংবাদপত্রে উল্লেখ করার বিধি ছিল। ছিল আরও বেশ কিছু রক্ষাকবচ। বর্তমান আমলে সেসব তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এম ভি সি এ কে হাতিয়ার করে এখন লাগামছাড়া হারে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের মাশুল। 
২০১০সালে সি ই এস সি এলাকায় বিদ্যুতের ইউনিট দাম ছিল ৪টাকা ৭৩পয়সা। এখন সি ই এস সি এলাকায় সেই দাম পৌঁছেছে ৭টাকা ২পয়সা। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের এই মাশুলের সঙ্গে সি ই এস সি ১৮পয়সা ইউনিট পিছু গ্রাহকদের কাছ থেকে এম ভি সি এ আদায় করছে। গত ডিসেম্বর এই এম ভি সি এ আদায় শুরু হয়েছে।
একই অবস্থা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডব্লিউ বি এস ই ডি সি এল) এলাকার গ্রাহকদেরও। ৬টাকা ৮৯পয়সা ইউনিট পিছু বিদ্যুতের দাম হলেও বণ্টন কোম্পানি এম ভি সি এ আদায় করছে ২৩পয়সা। ফলে ৭টাকা ১২পয়সা করে ইউনিট পিছু দাম মেটাতে হচ্ছে কোটি ওপর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের। 
রাজ্য বিদ্যুৎ কোম্পানি এলাকার গ্রাহকদের কাছ থেকে তৃণমূল সরকারের আমলে গত ছয় বছরে সাত বার এম ভি সি এ মারফত বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ মাশুল। 
২০১২-১৩সালে ১১পয়সা ইউনিট পিছু বিদ্যুৎ মাশুল নেওয়া হয়েছিল। ২০১৩-১৪সালে এক বছরের মধ্যে পাঁচ দফায় ইউনিট পিছু ৫১পয়সা এম ভি সি এ আদায় করেছিল সরকার। 
এখন সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ার জন্য যুক্তি দিচ্ছে কয়লা ও তেলের দাম বাড়ার জন্য বেড়েছে বিদ্যুতের মাশুল। বিদ্যুৎমন্ত্রীর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য,‘২০১১সালে এক টন কয়লার দাম ছিল ১৯৩০টাকা। ২০১৭সালে সেই কয়লার টন প্রতি দাম ৩০৯২টাকা। একইভাবে দাম বেড়েছে তেলের। এক কিলোলিটার তেলের দাম ৩৮হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ৪১হাজার টাকা। বেড়েছে কোল এনার্জি সেস। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ছে।’
কিন্তু গত ২০১৬-১৭সালে কয়লার দাম যখন কমেছিল তখন কিন্তু বিদ্যুতের দাম কমেনি। বরং বাড়ানো হয়েছিল। কয়লার দাম ৪০শতাংশ কমে ছিল গত আর্থিক বছরে। কয়লার ওপর জি এস টি কমেছে ৭শতাংশ। এরসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুই কোম্পানির কারিগরি ও বাণিজ্যিক ক্ষতি কমেছে ২শতাংশ। দাম কমার কোনও লক্ষণ নেই।
বিদ্যুতের দাম লাফিয়ে বাড়ছে রাজ্যে। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement