চোখের জলে শেষ বিদায়
কমরেড মহম্মদ আমিনকে

চোখের জলে শেষ বিদায়<br>কমরেড মহম্মদ আমিনকে
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৩ই ফেব্রুয়ারি— শেষবারের মতো বরানগর জুট মিলের পুরানো গেট থেকে ঘিঞ্জি শ্রমিক মহল্লায় নিজের পুরানো বাড়ির পথে কমরেড মহম্মদ আমিনের মরদেহ কাঁধে করে নিয়ে গেলেন পার্টিকর্মীরা। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে এই বরানগর জুট মিলের চটকল মেশিনের তেল, কালি, ঘাম মেখেই শ্রেণি আন্দোলনে হাতেখড়ি হয় কমরেড আমিনের। আমৃত্যু শ্রেণি আন্দোলনের অক্লান্ত সেনানী, দেশের শ্রমিক আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব কমরেড মহম্মদ আমিনের শেষ যাত্রায় মঙ্গলবার শামিল ছিলেন অসংখ্য পার্টিকর্মী-সমর্থকের পাশাপাশি বরানগর জুট মিলের শ্রমিকরাও। 
‘কেয়া চীন –ও আরব  ক্যা আমরিকা/ কেয়া পরওয়ত্‌ জঙ্গল কেয়া দরিয়া/ পূরব পচ্ছিম উত্তর দক্‌খিন/ হ্যায় সারা জাঁহা মজদুরোঁকা’। উর্দুতে কবিতা লিখেছিলেন কমরেড আমিন। চীন হোক আরব বা আমেরিকা, পর্বত হোক জঙ্গল বা সমুদ্র, পূর্ব পশ্চিম বা উত্তর দক্ষিণ, এই দুনিয়া মজদুরদেরই। আজন্ম এই বিশ্বাসেই স্থিত থেকে দেশের শ্রমিক আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তাঁর শেষযাত্রায় ৯০টি অর্ধনমিত রক্তপতাকার মিছিল, পার্টিকর্মীদের ঠোঁটে ‘ইন্টারন্যাশনাল’। গরিব মজুরপাড়ার শ্রম, ঘাম, রক্তে ভেজা রাস্তা ধরেই মিছিল পৌঁছায় তাঁর বাড়িতে। এদিন রাত দশটায় বরানগরের আলমবাজার বাঁশবাগান কবরস্থানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। 
দেশের শ্রমিক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা, সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য কমরেড মহম্মদ আমিনের জীবনাবসান ঘটে সোমবার দুপুর ২টা ৪০মিনিটে মধ্য কলকাতায় নিজের বাসভবনে।  তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। কমরেড আমিনের মৃত্যুসংবাদ পেয়েই ভারাক্রান্ত মনে সোমবার সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যান বিমান বসু, সূর্য মিশ্র, শ্যামল চক্রবর্তী,মৃদুল দে, রবীন দেবসহ সি পি আই (এম) নেতৃবৃন্দ। সোমবার সন্ধ্যা থেকে পিস হাভেনে শায়িত ছিল তাঁর মরদেহ। মঙ্গলবার সকালে  আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সি পি আই (এম) রাজ্য দপ্তর, রাজ্য বিধানসভা ভবন, সি আই টি ইউ রাজ্য দপ্তরে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর মরদেহ আনা হয় বরানগর জুট মিলের পুরানো গেটে।
মঙ্গলবার সকালে পিস হাভেন থেকে সকাল এগারোটায় তাঁর মরদেহবাহী শকট পৌঁছায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সি পি আই (এম) রাজ্য দপ্তর মুজফ্‌ফর আহমেদ ভবনে। কমরেড আমিনের মরদেহ রক্তপতাকা দিয়ে ঢেকে দেন পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য বিমান বসু, পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র, পলিট ব্যুরো সদস্য হান্নান মোল্লা। তাঁর মরদেহে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিমান বসু, সূর্য মিশ্র, হান্নান মোল্লা।
 ‘কমরেড মহম্মদ আমিন লাল সেলাম, কমরেড মহম্মদ আমিন অমর রহে’ স্লোগান উঠেছে মুহুর্মুহু। একে একে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সি পি আই (এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী, দীপক দাশগুপ্ত, মৃদুল দে, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, রামচন্দ্র ডোম, মিনতি ঘোষ, রেখা গোস্বামী। কমরেড মহম্মদ আমিনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সি পি আই-র রাজ্য সম্পাদক প্রবোধ পান্ডা, আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা হাফিজ আলম সৈরানি, সি পি আই এম এল (লিবারেশন)-র নেতা কার্তিক পাল, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা জয়হিন্দ সিংহ। কমরেড আমিনকে শ্রদ্ধা জানান তাঁর দুই পুত্র আনিস আখতার ও রঈস আহমেদ, শ্রদ্ধা জানান নাতনি, নাতিরাও। 
কমরেড মহম্মদ আমিনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রবীন দেব, সুজন চক্রবর্তী, পার্টির হাওড়া জেলা সম্পাদক বিপ্লব মজুমদার, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা সম্পাদক মৃণাল চক্রবর্তী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সম্পাদক শমীক লাহিড়ী, কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার, নদীয়া জেলা সম্পাদক সুমিত দে। কমরেড আমিনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সি পি আই (এম) রাজ্য কমিটির সদস্য অসীম দাশগুপ্ত, সুখেন্দু পানিগ্রাহী, নেপালদেব ভট্টাচার্য, নিরঞ্জন চ্যাটার্জি, মইনুল হাসান, মানব মুখার্জি্, মধুজা সেন রায়। শ্রদ্ধা জানান সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদিকা কনীনিকা ঘোষ বোস, ডি ওয়াই এফ আই-র রাজ্য সম্পাদক জামির মোল্লা, রাজ্য সভাপতি সায়নদীপ মিত্র, এস এফ আই-র সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস, রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, মহিলা নেত্রী রমলা চক্রবর্তী। কমরেড মহম্মদ আমিনকে ফুলে মালায় শ্রদ্ধা জানান গণশক্তি পত্রিকার সম্পাদক অভীক দত্ত, দেশহিতৈষী পত্রিকার সম্পাদক অশোক ব্যানার্জি, নন্দন পত্রিকার সম্পাদক অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, হিন্দি স্বাধীনতা পত্রিকার সম্পাদক রাম আহ্লাদ চৌধুরি, প্রবীণ পার্টিনেতা রঘুনাথ কুশারী প্রমুখ। 
সি পি আই (এম) রাজ্য দপ্তর থেকে কমরেড আমিনের মরদেহ আনা হয় বিধানসভা ভবনে। তাঁর মরদেহে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান ব্যানার্জি, বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক, সি পি আই (এম) বিধায়ক আনিসুর রহমান, জাহানারা খান, তাপসী মণ্ডল, শ্যামলী প্রধান প্রমুখ। 
বিধানসভা ভবনে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর কমরেড মহম্মদ আমিনের মরদেহ আনা হয় সি আই টি ইউ রাজ্য দপ্তর শ্রমিক ভবনে। তাঁর মরদেহ সি আই টি ইউ-র রক্তপতাকায় ঢেকে দেন সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনাদি সাহু ও সভাপতি  সুভাষ মুখার্জি। কমরেড আমিনের মরদেহে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রবীণ সি আই টি ইউ নেতা শ্যামল চক্রবর্তী, দীপক দাশগুপ্ত, রাজদেও গোয়ালা, শান্তশ্রী চ্যাটার্জি, রত্না দত্ত, প্রশান্ত নন্দী চৌধুরি প্রমুখ। মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বি সি এম ইউ-র রামপ্রসাদ কুন্ডু, অমিতাভ চক্রবর্তী, বাবলি দে, সি এস টি ই ইউ-র পক্ষে রামশংকর আহির, রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির পক্ষে বিজয় শংকর সিনহা, জলপথ পরিবহণ ইউনিয়নের পক্ষে জহর ঘোষালসহ অন্যান্য ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব। 
শ্রমিক ভবন থেকে বেলা আড়াইটা নাগাদ তাঁর মরদেহ পৌঁছায় তাঁর জীবনের প্রথম কর্মস্থল বরানগর জুট মিলের পুরানো গেটে।  সি পি আই (এম) উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার পক্ষ থেকে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এখানে শ্রদ্ধা জানান সূর্য মিশ্র, রবীন দেব, মৃণাল চক্রবর্তী, পার্টিনেতা সোমনাথ ভট্টাচার্য, পলাশ দাস, সায়নদীপ মিত্র, তন্ময় ভট্টাচার্য প্রমুখ। মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এ আই টি ইউ সি-র পক্ষে রবীন্দ্র প্রসাদ, ইউ টি ইউ সি-র পক্ষে মুজিবর রহমান, এইচ এম এস-র পক্ষে জাফর আলি। শ্রদ্ধা জানান নৈহাটি, হালিশহর, হুকুমচাঁদ সহ জেলার বিভিন্ন জুটমিলের শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। 
বরানগর জুটমিলের পুরানো গেটে তাঁর মরদেহ পৌঁছানোর আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন শ্রমিক মহল্লার মানুষ। কমরেড আমিন কৈশোর থেকে যৌবন ট্রেড ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার দিনগুলিতে এই জুট মিল পাড়ার শ্রমিকদের সান্নিধ্যেই কাটিয়েছেন। বরানগর জুট মিল থেকে তাঁর পুরানো বাড়ি পর্যন্ত শেষযাত্রায় পা মেলান এলাকার বহু সাধারণ মানুষ। ৯০টি অর্ধনমিত রক্তপতাকা নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ গানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান মিল পাড়ার গরিব মানুষ। শেষযাত্রায় পা মেলান সূর্য মিশ্র, রবীন দেবসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। কমরেড মহম্মদ আমিনের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান সূর্য মিশ্র, রবীন দেবসহ জেলা পার্টির নেতৃবৃন্দ। 
এদিন রাত দশটায় আলমবাজারের বাঁশবাগান কবরস্থানে কমরেড মহম্মদ আমিনকে দাফন করা হয়। ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়, চোখের জলে নিজের কমিউনিস্ট জীবন  শুরুর এলাকাতেই শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয় কমরেড মহম্মদ আমিনের। শেষ কৃত্যের সময় উপস্থিত ছিলেন দলমত নির্বিশেষে আলমবাজারের গরিব শ্রমজীবী মানুষ।  

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement