আসামকে দেখেও
গণনা করছেন মানুষ 

আসামকে দেখেও<br>গণনা করছেন মানুষ 
+

চন্দন দাস: ধর্মনগর, ১৩ই ফেব্রুয়ারি —  জাতীয় নাগরিক পঞ্জিতে নাম ওঠেনি। আসামের এমন কয়েকশো যুবককে ধর্মনগরসহ উত্তর ত্রিপুরার কয়েকটি আসনে ‘প্রচারক’ হিসাবে আসতে বাধ্য করেছে আর এস এস-বি জে পি। 
বদলে কী পাবেন তাঁরা? ধর্মনগর স্টেশনের কাছে বি জে পি-র তিনটি সাজানো গোছানো বুথ অফিস। তার একটির অদূরে দাঁড়িয়ে আসামের করিমগঞ্জ জেলার বাসিন্দা দুই যুবকের কাতর প্রতিক্রিয়া,‘‘আমাদের নাম ওঠেনি এন আর সি-তে। বলেছে, নাম উঠে যাবে। কিন্তু ত্রিপুরার ভোটে খাটতে হবে। আমরা এসেছি। টাকা দিচ্ছে। হাতখরচ। প্রচারে যাচ্ছি নানা জায়গায়।’’ কোথায় কোথায়? দুই যুবকের বক্তব্য,‘‘ধর্মনগর শহরে, তার আশেপাশে, বাগবাসায়, কদমতলা-কুর্তির কিছু জায়গায়। কাঞ্চনপুরেও যাচ্ছি কিছু জায়গায়।’’ কারা আসতে বললো? দুই যুবক তাদের নাম জানাতে চাইলেন না। জানাতে চাইলেন না নিজেদের নামও। তবে তাঁদের দাবি, শুধু করিমগঞ্জ থেকেই দুশো ছেলেকে এভাবে এনেছে বি জে পি। কাছাড় থেকেও অনেকে এসেছেন। সি পি আই(এম) কাছাড় জেলা কমিটির সম্পাদক দুলাল মিত্র মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ‘‘আমি শুনেছি এমন ঘটছে। এন আর সি-তে নাম না ওঠা এমন আশঙ্কায় থাকা, অসহায় মানুষদের ত্রিপুরায় পাঠাচ্ছে বি জে পি, আর এস এস প্রচারক হিসাবে।’’
উত্তর ত্রিপুরায় ছটি পূর্ণাঙ্গ এবং একটি বিধানসভার কিছু অংশ রয়েছে। ২০১২-র ১৩ই জানুয়ারি থেকে যাত্রা শুরু করা এই জেলার ৫৩ কিমি সীমান্ত আসাম লাগোয়া।  
কিন্তু ‘আসাম’ বি জে পি-র বিরুদ্ধেও যাচ্ছে।
কিভাবে? আসামে সরকারি পরিষেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়। রাস্তাঘাট অত্যন্ত খারাপ। রেগায় মজুরি মেলে না, কাজ মেলে না — বি জে পি শাসিত সেই রাজ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই অনেকে ত্রিপুরার বাজার, দোকানগুলিতে আসেন। কাঞ্চনপুর, পানিসাগরের বিভিন্ন এলাকার মানুষকেও আসামে যাতায়াত করতে হয়। এরই মধ্যে আসামে এন আর সি তালিকা নিয়ে বি জে পি-আর এস এস-র বক্তব্য, কাণ্ডকারখানাও উত্তর ত্রিপুরায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। 
শুধু তাই নয়। 
উদাহরণ? আজাদ আলি, কালাউদ্দিনের মত অনেকে।
কে আজাদ আলি? বয়স প্রায় বাহাত্তর। গত প্রায় পঞ্চাশ বছর তিনি কংগ্রেসের কর্মী। তাঁর ছেলে নদীয়াপুর এলাকায় পঞ্চায়েতের প্রধান। বাবা-ছেলের এবার সিদ্ধান্ত বদল। এবার দুজনেই সি পি আই (এম)-র সঙ্গে। হাঁটছেন মিছিলে। নদীয়াপুর এলাকায় যত কংগ্রেস কর্মী, সমর্থক আছেন, তাঁদের সবাইকে দুজনে সঙ্গে এনেছেন। কেন? বাহাত্তর বছরের আজাদ আলির কথায়,‘‘কংগ্রেস আছে মনে। কিন্তু ত্রিপুরার এবারের নির্বাচনে বি জে পি-কে না ঠেকাইয়া উপায় নাই। একে তো মানুষে মানুষে ভাগ করতে চায়। তার উপর আসামে এদের কাজ তো দেখছি। খুব ভয় সেখানে মানুষের। তাই যখন দেখলাম বি জে পি-কে ঠেকাতে কংগ্রেস পারবো না। পারলে সি পি এম পারবে। তাই যা কখনও করি না, কখনও করবো তাও ভাবি নাই, এবার তাই করলাম।’’
বাগবাসা কেন্দ্রে সি পি আই (এম)-কে জয়ী করতে আজাদ আলির মত অনেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ধর্মনগর কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বিপুল কৃষ্ণ দাস। তিনিও মেনে নিলেন। বললেন,‘‘হ্যাঁ, এমন হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে কিছু জায়গায়। আমরা তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’’ কিন্তু তাঁরা ভোট পেলে বি জে পি-র সুবিধা যে? এই প্রশ্নের জবাবে বিপুল কৃষ্ণ দাস চুপ। 
জবাব দিয়েছেন কামালউদ্দিন।
পুরো নাম শেখ কামালউদ্দিন। তাঁর বাড়ি পশ্চিম চন্দ্রপুর এলাকায়। সেই এলাকা ধর্মনগর কেন্দ্রের মধ্যে। ত্রিপুরায় কংগ্রেস নেতাদের একাংশ যখন তৃণমূল কংগ্রেসে চলে গেলেন, তখন কামালউদ্দিনও তাই করলেন। গত নির্বাচনে ধর্মনগর কেন্দ্র থেকে জেতা বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেস ‘দলবদলু’ হলো। মমতা ব্যানার্জির পার্টি থেকে চলে গেলেন বি জে পি-তে। কামালউদ্দিন পড়লেন ফাঁপড়ে। যত নির্বাচনের দিন এগতে লাগলো, তিনি বুঝলেন বি জে পি-র পক্ষে টাকা উড়ছে। কিন্তু টক্কর নেওয়ার জন্য বামফ্রন্ট ছাড়া কেউ নেই। অগত্যা গত জানুয়ারির শেষ দিকে তিনি স্থানীয় সি পি আই (এম) কর্মীদের কাছে প্রস্তাব রাখলেন — ‘‘আমার বাড়ির উঠান ছেড়ে দিচ্ছি। একটা সভা করো তোমরা। আশেপাশের কিছু মানুষকে আমি জড়ো করছি।’’ 
কামালউদ্দিনের দাওয়ায় সি পি আই (এম)-র সেই উঠানসভা হয়েছে গত ৩০শে জানুয়ারি। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে যাঁরা বি জে পি-তে যাওয়া ঠিক মনে করেননি, তেমন বেশ কিছু দীর্ঘদিনের সি পি আই (এম)-বিরোধী মানুষ বামফ্রন্টকে সমর্থনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। পার্টির জেলা কমিটির সম্পাদক অমিতাভ দত্তর কথায়,‘‘আমাদের সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি মানুষ দেখছেন। আসামের সঙ্গে মিলিয়েও দেখছেন। আমরা উন্নয়নের কাজের প্রচার চালাচ্ছি। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক বি জে পি-র সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী আই পি এফ টি-র সখ্যও সবাই দেখছেন। কারা শান্তির পক্ষে, আর কারা অশান্তি চায় —  মানুষ অভিজ্ঞতায় মিলিয়ে নিচ্ছেন।’’ 
ধর্মনগর, বাগবাসা —  দুটিই উত্তর ত্রিপুরার দুটি বিধানসভা কেন্দ্র। কদমতলা-কুর্তি, যুবরাজনগর, পানিসাগর, কাঞ্চনপুর —  এই হলো বাকি চারটি কেন্দ্র। পেছারথলের আংশিক উত্তর ত্রিপুরার মধ্যে। জেলার প্রায় ১৬-১৭ শতাংশ মানুষ সংখ্যালঘু মুসলিম। খ্রিস্টান আছেন প্রায় ৭ শতাংশ। বৌদ্ধ আছেন সামান্য, ৫শতাংশের মতো। 
হিন্দুদের মধ্যে অন্তত তিনটি কেন্দ্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নাথ সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ আছেন। এর মধ্যে যুবরাজনগর বিধানসভা এলাকায় তাঁদের বসবাস বেশি। এই নাথ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুরে যোগী আদিত্যনাথের আশ্রমের যোগ আছে। বি জে পি তাই উত্তর ত্রিপুরায় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথকে উড়িয়ে এনেছিল সোমবার। তিনি সভাও করেছেন সেই যুবরাজনগরে। রোড শো করেছেন ধর্মনগর শহর লাগোয়া এলাকায়। পরে এই জেলারই কাঞ্চনপুরেও সভা করেন। তাঁকে হাজির করার পিছনে বি জে পি-র নাথ সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টাটিই আসল কারণ। ধর্মনগর শহরে সন্ধ্যায় শুটকি বিক্রি করতে বসা সনাতন নাথের কথায়,‘‘সবই তো বুঝলাম। ‘চলো পালটাই’ স্লোগান দিয়েছে বি জে পি। বামফ্রন্টেরও পঁচিশ বছর হয়েছে। কিন্তু পাশেই তো আসাম। সেখানকার যা খবর পাই, তা তো খুব ভালো নয়। আর শান্তিতে তিন মেয়ে, এক ছেলে, স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে চাই। সেটা খুব দরকার। বি জে পি এলে সেটা কতটা থাকবে, তা অনেকেই বুঝতে পারছে না।’’

Featured Posts

Advertisement