শহরবাসীর সমর্থনও
আদায় করেছেন কৃষকরা

শহরবাসীর সমর্থনও<br>আদায় করেছেন কৃষকরা
+

মুম্বাই : অসাধারণ এক লড়াই দিলেন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জয়ও ছিনিয়ে নিয়েছেন তাঁরা। সব দাবি পূরণ হয় না, এমন অনেক দাবি রয়েছে যা হাসিল করতে অনেক দূর পর্যন্ত লড়তেই হবে। কিন্তু যে ধাক্কা কৃষকসভার এই লঙ মার্চ দিয়েছে তা তুলনাহীন। 
নাসিক থেকে যখন যাত্রা শুরু হয় তখন ১২-১৩হাজার কৃষক ছিলেন। মুম্বাইয়ে পৌঁছালেন প্রায় ৩৫ হাজার। রাস্তা দিয়ে তাঁরা হেঁটে এসেছেন ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়। হাইওয়েতে তাপ আরও বেশি। মিছিলে গিয়ে দেখেছি বহু লোকের পায়ে ফোসকা। কারোর পা ফেটে গেছে, রক্ত পড়ছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা। কারোর পায়ে কোনও চটি-জুতোই নেই। কিন্তু দৃঢ়তা নিয়ে, প্রত্যয় নিয়ে তাঁরা পথ হেঁটেছেন। 
কৃষক-খেতমজুরদের কাছে প্রত্যেক দিন গুরুত্বপূর্ণ। এক সপ্তাহ মিছিলে থাকার সরাসরি অর্থ হলো আয় কমে গেল, এমনকি তাঁদের খাবারে টান পড়ে গেল। তার পরেও এই দীর্ঘ পথ তাঁরা পাড়ি দিলেন স্লোগান তুলে, চারপাশের মানুষকে কৃষক সমাজের যন্ত্রণার হদিশ দিয়ে। একদিকে বোঝা যায় তাঁদের আবেগের গভীরতা। অন্যদিকে বোঝা যায় কতটা দুর্দশার মধ্যে তাঁরা রয়েছেন, কীভাবে তাঁদের এই লড়াইয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি এই মিছিল দেখে অনুভব করছিলাম আর তাঁদের বোকা বানানো যাবে না। অর্থহীন বাগাড়ম্বর তাঁরা শুনবেন না। সরকার তাঁদের প্রত্যাখ্যান করতে পারে, কিন্তু লড়াই চালিয়ে যেতে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। 
এই পদযাত্রা শুরুর সময়ে সরকার পাত্তা দেয়নি। মিডিয়া যথারীতি ফিরে তাকায়নি। কিন্তু দেখা গেল ক্রমেই পদযাত্রায় লোক বাড়ছে। মুম্বাইয়ের দিকে ঢেউয়ের মতো লোক আসছে। মিডিয়া যেতে আরম্ভ করে। দেখা যায় বাণিজ্যিক সংবাদমাধ্যমও প্রতিবেদক পাঠাচ্ছে। কৃষি প্রতিবেদক তো নেই, কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তো ক্রাইম রিপোর্টার পাঠিয়ে দিয়েছে। যদি গন্ডগোল হয়। তরুণ সাংবাদিকরা কৃষকদের জিজ্ঞাসা করছে, কেন হাঁটছেন? কী সমস্যা? অনেকে খোলাখুলি স্বীকার করছে আমরা কিছু জানি না, আমাদের একটু বুঝিয়ে বলুন। কৃষকরা বলেছেন। অনেক তরুণ সাংবাদিককে কৃষকের দুর্দশার জীবনের গল্প শুনে চোখ ভেজাতেও দেখা গেছে। এ এক বড় পাওনা। 
এর পরেও সরকার সম্ভবত কৃষকদের মনোবলকে খাটো করে দেখছিল। মুম্বাইয়ের কাছে পৌঁছাতেই যেসব দৃশ্য দেখা গেছে, তা সব হিসাব বদলে দিয়েছে। মুম্বাই শহরে এমন ছবি কোনওদিন দেখা যায়নি। শ্রমিক এলাকা, রমাবাঈ নগরের মধ্যে সাড়া পাওয়া যাবে, তা বোঝা যায়। গরিব মানুষ এসে কৃষকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাচ্ছেন, তা-ও বোঝা যায়। কিন্তু মুম্বাইয়ের মধ্যবিত্ত অংশের তরুণ প্রজন্ম দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। রেসিডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন থেকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। কেউ ফুল ছুঁড়েছেন। সব ধর্মের মানুষ এসে কিছু না কিছু দিয়ে গেছেন। কিসান সভা বাজিমাত করেছে পরীক্ষার্থীদের জন্য মধ্যরাতে হাঁটার সিদ্ধান্তে। শেষ ১৪ কিলোমিটারও কৃষকরা মাঝরাতে হেঁটেই গেছেন। আমি নিজেই এক মাঝবয়সি মহিলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এত রাতে হাঁটলেন কেন? সোজা উত্তর, আমাদের ছেলেমেয়ে আছে, ওরাও তো পরীক্ষা দেয়। শহরের মানুষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানোয় ভারসাম্যও বদল হয়ে যায়। কৃষকদের দাবিতে শহুরে অংশের সমর্থন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বহু মানুষ সোচ্চারে বলেছেন, কৃষকের দাবিতে আমাদের সমর্থন রয়েছে। 
মিছিলে যত মানুষই থাক, গোটা রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এই পদযাত্রা শিহরণ তুলে দিয়েছে এ কথা বুঝেই শুরু হয়েছিল একে অপবাদ দেবার চেষ্টা। মুখ্যমন্ত্রী তো বলে দিলেন, কৃষক নয়, অধিকাংশই আদিবাসী। মনোভাব হলো, কৃষকরা আদিবাসী নন, আদিবাসীরা কৃষক নন। এই পদযাত্রার অন্যতম দাবিই ছিল আদিবাসীদের জমির অধিকার। তারপরে শাসকদলের এক সাংসদ বলে বসলেন ‘শহরের মাওবাদীরা’ এই পদযাত্রার আয়োজক। গণতন্ত্রের রাস্তায়, সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে কৃষকরা এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। একে খাটো করতে গিয়ে সরকার নিজেই নড়ে গেছে। 
শেষ পর্যন্ত সরকার ভয় পেয়েছিল। এই কারণেই একগুচ্ছ দাবি মেনে নিতে তারা রাজি হয়ে যায়। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement