ফরাসি রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গঙ্গায়
মোদী, নাভিশ্বাস বারাণসীর

ফরাসি রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গঙ্গায়<br>মোদী, নাভিশ্বাস বারাণসীর
+

সন্দীপ ঘটক: বারাণসী - ১২ই মার্চ — রবিবার কোনও কোনও টিভি চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ বলছিলেন কৃষক মিছিলে মুম্বাই অবরুদ্ধ হয়ে গেলে মহানগরবাসীর অসুবিধা হবে। ছাত্ররা কিভাবে পরীক্ষা দিতে যাবে? বাণিজ্য নগরী অচল হয়ে গেলে কিভাবে চলবে? ইত্যাদি। সাতদিন ধরে চড়া রোদে পায়ের ছাল তুলে, রক্ত ঝরিয়ে কেন দেশের অন্নদাতারা আসছেন মহানগরের দ্বারপ্রান্তে সেই প্রশ্নের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এই সব কথা। 
এইসব দেখে শুনে মনে হলো, মুম্বাই না হলেও তো দেশের একটা পরিচিত শহরের বাসিন্দা আমরা। আমাদেরও তো ‘অসুবিধা’ হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র হওয়ায় বারাণসী তো এখন হাইপ্রোফাইল। মুম্বাই না হলেও, আমাদের এই ছোট শহরের দোকান-বাজার করে খাওয়া লোকজনেরও তো পেট আছে, সংসার চালাতে হয় দিনভরের পরিশ্রমে। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়ারাও তো পড়াশুনা করে। তাদেরও তো পরীক্ষা চলছে। আমাদের কথা বলে না কেন কেউ? না মিডিয়া, না সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্ঘী বন্ধুরা। 
এখন বিদেশের কোনও রাষ্ট্রপ্রধান এলেই তাঁকে নিয়ে বারাণসী আসা রেওয়াজ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই যে কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে যেভাবে আমেদাবাদ নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আমেদাবাদের মতো বারাণসীর এক শ্রেণির মানুষও বেশ গদগদ হয়ে ওঠেন আমাদের গলি-মহল্লায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী এসেছেন, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এসেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে এনে বারাণসীকে কিয়েটো বানানোর ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। মেয়াদের চার বছর অতিক্রান্ত। কিয়োটো নয়, একপশলা বৃষ্টি হলেই বারাণসী এখন ভেনিস। তারপরেও চটকদারি চলছে, আর নাস্তানাবুদ হচ্ছেন সাধারণ নগরবাসী। 
ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর ঘিরে তিনদিন আগে থেকেই কার্যত অচল করে দেওয়া হয়েছে বারাণসী। রাস্তা থেকে ফুটপাথের গরিব দোকানিদের তুলে দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় তাপ্পি মারার কাজ চলছে। স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার সব স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে মাঝিদের নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ একটাই, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে বেরবেন বারাণসীর সাংসদ, দেশের প্রধানমন্ত্রী। পায়ের ছাল ওঠা কৃষক মিছিলে নাকি নাগরিক জীবনের অসুবিধা হবে। আমাদের বারাণসবাসীর জীবন স্তব্ধ করে দিয়ে যে নৌবিহার হলো, তাতে কার লাভ? জবাবে দেবে মিডিয়া? 
সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে কয়েকদিন ধরেই নগরবাসীকে বোঝানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নগর ভ্রমণের সময়ে খুব প্রয়োজন না হলে ঘরে থাকুন। ঘণ্টা, মিনিট ধরে বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে কখন, কোনপথে যাবেন ভারত ‘ভাগ্যবিধাতা’। ওই সময়ে এড়িয়ে চলুন সংশ্লিষ্ট রাস্তা। তিন দিন ধরে আশাপুর থেকে পান্ডেপুর, গিলাত বাজার থেকে পিসাওরা, রোহনিয়া থেকে শহরে ঢোকার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বহু পথ ঘুরে মানুষকে যাতায়াত করতে হয়েছে। একই অবস্থা করা হয়েছে শহরের মধ্যেও। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে শহরবাসীও নাকাল হয়েছে। এদিন সকাল থেকেই গোধুলিয়া থেকে মৈয়দাগিন, সোনারপুরা, তেলিয়াবাগ, লহরতারা সব জায়গা দেখে মনে হয়েছে ধর্মঘট চলছে। ভিড়ে ঠাসা রাস্তাগুলি শুনশান করে দেওয়া হয়েছে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতিকে কাশীর প্রাচীন সংস্কৃতি দেখানোর নামে। 
শহরের সমস্ত নর্দমা, ময়লা ফেলার জায়গা সব সুন্দর হোর্ডিং দিয়ে ঢাকা হয়েছে। এমনকি শহরের নিকাশি নালা যা গঙ্গায় গিয়ে পড়ছে, সেই মুখেও ঢাকা দেওয়া হয়েছে স্বাগত জানানো হোর্ডিংয়ে! যাতে গঙ্গাবক্ষে থাকা ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির তা চোখে না পড়ে। দশাশ্বমেধ ঘাট, পাশের ঘোড়া ঘাট বা পুরানো দশাশ্বমেধ ঘাট যেখানে দলে দলে ভিক্ষুকরা বসে থাকেন, তাদেরও তুলে দেওয়া হয়েছে। সেসব জায়গায় পরিষ্কার করে ছবি এনে টুলে করে সাজানো হয়েছে! শিশুসুলভ এইসব কর্মকাণ্ড দেখে সচেতন নাগরিকদের হাসি পেলেও, বি জে পি সমর্থকরা এদিন ভক্তিভরেই হাজির হয়েছেন নদীপাড়ে। ঘাটে ঘাটে মঞ্চ বেঁধে নাচা-গানা হয়েছে। পতাকা নাড়িয়ে, হাত নেড়ে মোদীর প্রতি অটুট সমর্থনের প্রমাণ দিয়েছেন বিদেশি বন্ধুর সামনে। 
গোটা বারাণসীতে তিন দিন ধরে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি কোনও ঠেলাওয়ালাকে। রাস্তায় বসে যারা বিকিকিনি করেন, গুমটি দোকান চালান তাঁদের বসতে দেওয়া হয়নি। আগে থেকেই তাঁদের হঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। চা ওয়ালা সাজতে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রীর সফরে উচ্ছেদ হয়েছেন চা দোকানিরাও। সামনে ঘাট থেকে রাজঘাট পর্যন্ত সমস্ত নৌকো হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপদে পড়েছেন মাঝিমল্লারা। তিনদিন ধরে তাঁদের এক পয়সা আয় হয়নি। চৌকি ঘাটের দীনেশ সাহানি, অরুণ সাহানিরা নৌকা টানেন দিনভর। বললেন, এর আগেও অনেক দেশি-বিদেশি অতিথিরা এসেছেন, এভাবে কখনও আমাদের পেট মারা হয়নি। পান্ডে ঘাটের জগ্গু ছেদি পাকালুরা আবার চিন্তিত ঘাটে ঘাটে জেটি বানিয়ে আধুনিক নৌকা এনে বড় বড় ব্যবসায়ীদের দিয়ে ব্যবসা করানোর ঘোষণায়। তাঁদের দুশ্চিন্তা সৌন্দর্যায়নের নামে তাঁদের রুটি-রুজি বন্ধ হতে চলেছে। 
এদিন অসসি ঘাট থেকেই সুসজ্জিত বজরায় ম্যাক্রঁকে নিয়ে সফর শুরু করেন মোদী। সঙ্গী ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ। অসসি ঘাটের বাসিন্দা নীহার ভট্টাচার্য, আশুতোষ ত্রিপাঠিরা একরাশ ক্ষোভ উগরে দিলেন সবকিছু স্তব্ধ করা নিয়ে। তাঁদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার মরশুম। এই সফরের নামে সব পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেই পরীক্ষা কোথাও হবে ১৫তারিখ, কোথাও ১৬। প্রধানমন্ত্রীর সফরের নামে স্বেচ্ছাচারে অভিভাবকরা ক্ষুব্দ, বিরক্ত। 
সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলাম নগরবাসীর অসুবিধা যাতে না হয়, তাই ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে মুম্বাইয়ে সারারাত হেঁটেছেন কৃষকরা। আর ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে গঙ্গাবক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণের জন্য অচল করে দেওয়া হলো বারাণসী। ছাত্রছাত্রী থেকে দিন আনি-দিন খাই মানুষগুলোর তিন-চারদিনের আয় বন্ধ হয়ে গেল। মিডিয়া থেকে ‘ভক্ত’কূল সবাই নিশ্চুপ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement