জয় ছিনিয়ে
নিলেন কৃষকরা

জয় ছিনিয়ে<br>নিলেন কৃষকরা
+

বিশেষ সংবাদদাতা: মুম্বাই, ১২ই মার্চ- নগরবাসীর হৃদয়ে ঝড় তুলে দাবি আদায় করে ছাড়লেন কৃষকরা। ঋণ মকুব, আদিবাসীদের জমির পাট্টা দেওয়ার দাবি মেনে লিখিত বয়ান দিতে হলো মহারাষ্ট্রের মুখ্যসচিবকে। দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানাতে বাধ্য হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। টানা সাত দিন নাসিক থেকে মুম্বাইয়ে দুশো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বড় জয় তুলে আনল সারা ভারত কৃষকসভার ‘লঙ মার্চ’। 
গোড়ায় উদাসীন থাকলেও মুম্বাইয়ে কৃষিজীবীর ঢল দেখে পিছোতে হয় বি জে পি জোট সরকারকে। জোটসঙ্গী শিবেসনাকেও সরাসরি পাশে দাঁড়াতে হয়। বিরোধী প্রায় সব রাজনৈতিক দল সমর্থন জানায় কৃষকদের। কিন্তু, তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় শহর মুম্বাইয়ে শ্রমজীবীর সংহতি। রবিবার এবং সোমবার, জায়গায় জায়গায় অদম্য কৃষকদের খাবার, জল দিয়েছেন নগরবাসী। একতার নয়া আখ্যানে কখনো ফুল ছুঁড়ে স্বাগত জানিয়েছে মেহনতির মুম্বাই। 
সোমবারই আজাদ ময়দানে অপেক্ষায় থাকা কৃষকদের কাছে দাবি মেনে নেওয়ার বার্তা পৌঁছে দেন রাজ্যের রাজস্বমন্ত্রী চন্দ্রকান্ত পাতিল। রয়েছেন তখন সারা ভারত কৃষকসভার নেতা অমরা রাম, সাংসদ কে কে রাগেশ, সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। মাথায় লাল টুপি আর কৃষকসভার লাল পতাকায় আজাদ ময়দান তখন লাল সমুদ্র। পাতিল বলেন, কৃষকদের সব দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। কৃষকসভার সর্বভারতীয় সভাপতি অশোক ধাওলে বলেছেন, কৃষক আন্দোলনের বড় জয় এই ঘটনা।    
কৃষি ঋণ মকুব এবং ফসলের ন্যায্য দামের দাবিতে শুরু হয়েছিল মিছিল। গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, বনাঞ্চলে জমির অধিকার আইন অনুযায়ী জমির পাট্টা দিতে হবে কৃষকদের। গত সাত দিনে মিছিল যত এগিয়েছে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যোগদান। পঞ্চাশ হাজারের বেশি কৃষক রবিবারই পৌঁছান মুম্বাইয়ে। সোমবারই বিধানসভা অভিমুখে যাত্রা করেন কৃষকরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘিরে রাখবেন বলে। বাধ্য হয়ে সারা ভারত কৃষকসভার নেতাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধ জানায় সরকার। মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন কৃষকনেতারা। 
সারা ভারত কৃষকসভার সর্বভারতীয় সভাপতি অশোক ধাওলে জানিয়েছেন, ঋণ মকুবের ক্ষেত্রে যে যে শর্ত সরকার আরোপ করেছিল, সোমবার আলোচনায় তা তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। মকুবের আওতায় প্রায় সব কৃষককে আনতে বাধ্য হয়েছে সরকার। ধাওলে জানান, আদিবাসীদের জমির পাট্টা দেওয়ার জন্য ৬মাস সময় চেয়েছে সরকার। লক্ষ লক্ষ কৃষক আইন অনুযায়ী জমির জন্য আবেদন জানাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। বনাঞ্চল অধিকার আইনে তাঁদের পাট্টা পাওয়ার কথা। ষাটোর্ধ্ব কৃষক এবং খেতমজুরদের পেনশন বাড়াতেও রাজি হয়েছে সরকার। ফসলের লাভজনক দামের জন্য কৃষকসভার সঙ্গে বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের রেখে রাজ্যস্তরে কমিটি গড়া হবে। কার্পাসে পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। 
সরকার কতটা চাপে সোমবার ধরা পড়ে বিধানসভায়। ‘লঙ মার্চ’ নিয়েই আলোচনা শুরু হলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পদযাত্রীদের দাবির প্রশ্নে সরকার সংবেদনশীল এবং সহানুভূতিশীল। পরে, বিধানসভা প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের কৃষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ফলাফল জানান তিনি। ফড়নবিশ বলেন, আদিবাসীদের জমি দিতে কমিটি গড়া হচ্ছে। ২০০৫-র আগে থেকে চাষ করছেন এমন যে কোনও প্রমাণ দিতে হবে। 
মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দল বি জে পি-র সহানুভূতিতেই অবশ্য প্রশ্ন তুলেছে ‘লঙ মার্চ’। গত বছরই আন্দোলনরত কৃষকদের নিঃশর্ত ঋণমকুবের দাবি মেনেছিল সরকার। কিছুদিন পরেই একগুচ্ছ শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন ফড়নবিশ। তাছাড়া, মধ্য প্রদেশ বা উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্যে বি জে পি-র ভূমিকায় ক্ষোভ চড়েছে কৃষকদের।
৬ই মার্চ নাসিক থেকে শুরু হয়েছিল মিছিল। রবিবারই তা পৌঁছে যায় মুম্বাইয়ে। সোমবার থেকে বিধানসভা ভবন ঘিরে রাখার লক্ষ্য জানান কৃষকরা। সোমবারই আবার রাজ্যে শুরু হয়েছে মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা। কৃষকদের চাপে ফেলতে বিষয়টি নিয়ে প্রচারও শুরু করেন বি জে পি-র মন্ত্রীরা। সকালের কর্মসূচি বাতিল হয়। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি সত্ত্বেও রবিবার রাতেই দীর্ঘ মিছিল পৌঁছে যায় আজাদ ময়দানে। কৃষকরাই বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের সমস্যায় ফেলা উদ্দেশ্য নয়। 
সোমবার আজাদ ময়দানে সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, কৃষকরা দেশের নতুন সেনা। জওয়ানরা যেমন দেশের সীমান্ত রক্ষা করেন, কৃষকরা দেশবাসীকে খাদ্য জোগান। মহারাষ্ট্রের সরকার কৃষকদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও দশ মাস ধরে কোনও কাজ করেনি। ইয়েচুরি বলেন, ২.৪লক্ষ কোটি টাকা ঋণ মকুব করে দেওয়া যায় গুটিকয়েক কর্পোরেটের জন্য। আর দেশের কোটি কোটি কৃষকের ঋণের বেলা সরকার বলে বেড়ায় টাকা নেই। 
গোড়া থেকেই অদম্য জেদ নিয়ে পথ হেঁটেছেন পদযাত্রীরা। যে পথ দিয়ে গিয়েছে মিছিল পাশে দাঁড়িয়েছেন গ্রামবাসীরা। রবিবারই মুম্বাইয়ে পৌঁছে যায় ‘কৃষক লঙ মার্চ’। মহারাষ্ট্র প্রাদেশিক কৃষকসভার ডাকে এই পদযাত্রায় গোড়া থেকেই বড় সংখ্যায় ছিলেন আদিবাসীরা। দীর্ঘ পথে লড়াইয়ের গানে সমান তালে গলা মিলিয়েছেন বিপুল সংখ্যায় মহিলারা। 
২০১৬ এবং ২০১৭, পরপর দুবছর রাজ্যজুড়ে বড় মাপের আন্দোলনে নামেন কৃষকরা। সেই পর্বে অবশ্য বিভিন্ন কৃষক সংগঠন দাবি আদায়ে যৌথ লড়াইয়ে নেমেছিল। এবার মার্চে কৃষকসভা একার জোরেই টানা লড়াইয়ের কর্মসূচি নেয়। 
নগর মুম্বাইয়ে প্রায় বেনজির সংহতির ছবি দেখা গিয়েছে। রবিবার থেকে মিছিল যে রাস্তা দিয়ে গিয়েছে দাঁড়িয়ে থেকেছে জনতাও। তার মধ্যে ছিলেন মধ্যবিত্ত আবাসনের বাসিন্দারা। বস্তিবাসী, সামান্য জীবিকায় সংসার চালানো মুম্বাইবাসী। মেহনতি মুম্বাইয়ের সাড়া দেওয়ার প্রাবল্যে নড়ে বসতে বাধ্য হয় সরকার। মুম্বাইয়ে অফিসপাড়ায় খাবার নিয়ে যান যাঁরা, বিখ্যাত সেই ডাব্বাওয়ালাদের সংগঠন খাবার, জল নিয়ে চলে আসে কৃষকদের পাশে। 
অনবদ্য সংহতির এমন অনেক ছবিই ঘুরে বেড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেমন, এক প্রবীণা কৃষকের ফোস্কা পড়ে যাওয়া পায়ের ছবি। মহিলাকে রেখে ছবি দিয়ে পাশে লিখে দেওয়া হয় ‘ভারতমাতা কী জয়’। মেরুকরণের উগ্র দেশপ্রেমের বিকল্প বয়ান অনায়াসে নির্মাণ করে দিয়ে গেল গ্রাম উজাড় করে আসা মিছিল।    

Featured Posts

Advertisement