মানুষই আবার গড়ে
দেবেন পার্টি অফিস

সন্ত্রাস কবলিত এলাকায় মানিক সরকার

মানুষই আবার গড়ে<br>দেবেন পার্টি অফিস
+

নিজস্ব সংবাদদাতা : আগরতলা, ১৩ই মার্চ —বি জে পি-র দুষ্কৃতীরা লাঠি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত হানলেও বিন্দুমাত্র কষ্ট লাগত না। দুঃখ সেখানেই যে সি পি আই (এম) অফিসটা ভেঙে চুরমার করে দিল ওরা। এ যন্ত্রণা আমাকে আজও কাঁদাচ্ছে। মঙ্গলবার সোনামুড়ার ভেলুয়ারচরে মানিক সরকারের হাত ধরে প্রবীণ পার্টিনেতা নন্দলাল দেববর্মা তাঁর চোখের কোণে লেগে থাকা জলকে আটকে রাখ‍‌তে পারলেন না। কার্যত বিচলিত হয়ে পড়া এই অঞ্চলনেতা তথা পার্টি অফিসের জন্য দান করা জমির মালিক বলেন, এই ঘটনা আমাকে বড় আঘাত করেছে।
কান্নার রোল বয়ে যায় মানিক্যনগর এলাকার মহিলাদের মধ্যেও। ভাঙচুর হয়ে যাওয়া সি পি আই (এম) অফিসে দাঁড়িয়েই তারা বলছিলেন, সব শেষ হয়ে গেল। কানানবালা দাস, পূর্ণিমা সরকারদের উদ্দেশ্যে সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সদস্য মানিক সরকার বললেন, মানুষই তো পার্টি অফিস বানিয়েছেন।আবার তাঁরাই নতুন করে অফিস গড়বেন। ধৈর্য ধরতে হবে। যারা এই ধরণের সন্ত্রাস, হামলার ঘটনা সংগঠিত করেছেন তারা লালঝান্ডা নিয়ে আতঙ্কিত বলেই এগুলি করছেন। দলীয় কর্মী ও নেতাদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ আরও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলুন মানুষের সাথে। সন্ত্রাস কবলিত সোনামুড়া মহকুমার ১৭টি এলাকা পরিদর্শনকারী দলে ছিলেন মানিক সরকার, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দুই সদস্য বাদল চৌধুরি ও গৌতম দাশ, রাজ্য কমিটির সদস্য প্রাক্তন মন্ত্রী সহিদ চৌধুরি, সাংসদ শংকর প্রসাদ দত্ত, সুরেশ দাস, বিধায়ক শ্যামল চক্রবর্তী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। স্ব-স্ব এলাকায় মানিক সরকারের নেতৃত্বে সি পি আই (এম) প্রতিনিধি দলকে দেখতে পেয়ে নানা অংশের মানুষই পার্টি অফিসগুলির সামনে জড়ো হতে দেখা যায়।
শেষ চিহ্নটুকু বলতে চেয়ারের টুকরো, পুড়ে যাওয়া কাগজের ছাই কিংবা আসবাব পত্রের খণ্ড বিশেষ মাত্র। মানুষের টাকায় গড়ে ওঠা সি পি আই (এম) অফিসের টিনের ঘরেই হোক কিংবা দালানবা‍ড়ি—সবেতেই এখন লেগে রয়েছে পুড়ে যাওয়ার কালো ধোঁয়ার আস্তরণ। সরকারে আসার পর বি জে পি-র প্রথম টার্গেটই হয়ে যায় গরিব, শ্রমজীবীর একমাত্র ঠিকানা লালঝান্ডার পার্টি অফিস। প্রথম আক্রমণটা নামিয়ে আনা হলো এখানেই। বেছে বেছে সি ‍‌পি আই (এম) অফিস আক্রমণের পর পরবর্তী লক্ষ্য বাড়িঘরে ভাঙচুর, হুমকি, ভয় দেখানো।
সোনামুড়া মহকুমার ভেলুয়ারচর থেকে তেলকাজলা-গোটা রাজ্যের সাথে এখানেও চলো পালটাই-র স্লোগানে আটকে গেছে জীবনপ্রবাহ। গত সপ্তহখানেক আগেও যে সোনামুড়ায় জাতি-উপজাতি, হিন্দু-মুসলমান মানুষের সম্প্রীতির কোলাহল মুখরতা ছিল তা আজ আর নেই। চারপাশ জুড়ে ধ্বংসস্তূপ আর পাথরচাপা হয়ে রয়েছে মানুষের আর্তনাদ। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে রাজ্যজুড়ে বি জে পি-র সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে সোনামুড়ার নানা প্রান্তজুড়েও। মানুষ রাস্তায় বেরোলেও সেই কোমল হাসির দেখা নেই তাদের মুখে। সর্বত্রই এখনও কেটে ওঠেনি শান্তিকামী মানুষের চরম অস্বস্তি আর আশঙ্কার ছাপ।
মঙ্গলবার পার্টির প্রতিনিধিদলটি আগরতলা থেকে রওনা হয়ে প্রথমেই গিয়ে পৌঁছায় বক্সনগর বিধানসভা কেন্দ্রের ভেলুয়ারচর বাজারে। সূর্য তখন মধ্য গগনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বি জে পি-র সন্ত্রাসীদের হাতে ৪ঠা মার্চ দিনের আলোতে বিধ্বস্ত পার্টি অফিসটিতে যান পার্টি নেতৃবৃন্দ। মানিক সরকারসহ নেতৃত্বকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় প্রবীণ পার্টিনেতা নন্দলাল দেববর্মা। এরপর প্রতিনিধি দলটি যান মানিক্যনগরে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এখানকার পার্টি অফিসের সমস্ত আসবাবপত্রগুলি। নেতৃবৃন্দ এখানে গিয়ে তা ঘুরে দেখেন। পঞ্চায়েত চেয়ারপার্সন কাননবালা দাস, প্রাক্তন চেয়ারপার্সন পূর্ণিমা সরকারসহ মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে এখানে জড়ো হয়ে তাঁদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। মানুষের সাথে কথা বলার পর নেতৃবৃন্দ একে একে যান বক্সনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বক্সনগর, উত্তর কলমচৌড়া, দক্ষিণ কলমচৌড়া, কমলনগর, মতিনগর ও রবীন্দ্রনগর এলাকাতে। দক্ষিণ কলমচৌড়ায় ৩রা মার্চ রাতেই সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেয়া হয় সি পি আই (এম) অফিসটিকে। রবীন্দ্র নগরে মার্কেট স্টলটিকে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয় বি জে পি-র বহিরাগত দুর্বৃত্তরা।
এখান থেকে প্রতিনিধি দলটি ধনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের সন্ত্রাস কবলিত এলাকাগুলি পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে যায়। দুপুর ১টায় যাত্রাপুর সি পি আই (এম) অফিসটি দেখেন পাটির নেতৃবৃন্দ। এখান থেকে উত্তর মহেশপুর, কাঁঠালিয়া, মনাইপাথর, থলিবাড়ি, দক্ষিণ তৈবান্দাল, তৈবান্দাল, মোহনভোগ ও তেলকাজলা সি পি আই (এম) অলিসগুলি তারা পরিদর্শন করেন। প্রতিটি স্থানেই পাটির নেতা, কর্মী ছাড়াও কথা বলেন সাধারণ মানুষের সাথে। মোহনভোগ পার্টি অফিসে পুড়ে যাওয়া আসবাব পত্রের সাথে জনশিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি হেমন্ত দেববর্মা ও সুধন্বা দেববর্মার প্রতিকৃতিকেও ভেঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করে রাখে দুষ্কৃতকারীরা। ৫ই মার্চ তৈবান্দালে সি পি আই (এম) অফিসের দালানবাড়ি ভেঙ্গে ঢুকে হামলা চালায় বি জে পি-র সন্ত্রাসীরা। একই দিনে মনাইপাথরে বি জে পি-র হার্মাদবাহিনী নিজেদের মধ্যে ঝগড়া তৈরি করে তার রেশ চাপিয়ে দেয় সি পি আই (এম) অফিসের উপর। ভাঙচুর চালানো হয় এই অফিসটিকে। এলাকাবাসীদের পক্ষ থেকে এই ঘটনাগুলির বর্ণনা প্রতিনিধি দলের সদস্যদের কাছে তুলে ধরা হয়। তাদের পক্ষথেকে আরও বলা হয়েছে, বহিরাগত দুষ্কৃতীদের জড়ো করে এই ধরনের হামলা, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করে বি জে পি-র হায়নার দলেরা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement