আধারে খারিজ সময়সীমা

আধারে খারিজ সময়সীমা
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: নয়াদিল্লি, ১৩ই মার্চ — আধার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জোরাল ধাক্কা খেল মোদী সরকার। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, বিমার পলিসি, মোবাইল নম্বরের মতো কোনও পরিষেবার সঙ্গেই আপাতত আধার নম্বর যুক্ত করতে হবে না। মঙ্গলবার আধার কার্ডের বৈধতা সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই ‍‌নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এটা এখন আদৌ বাধ্যতামূলক নয়। না করলেও চলবে। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছে। এদিন তারই শুনানিতে সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছে, এই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার নির্দেশিত পরিষেবাগুলির সঙ্গে আধার নম্বর যুক্ত করার বাধ্যতা থাকবে না। ফলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, বিমার পলিসি, মোবাইল ফোনের নম্বর বা অন্যান্য কল্যাণমূলক ক্ষেত্রে কত দিনের মধ্যে আধার কার্ডকে জুড়ে ফেলতে হবে, তারও আর কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকল না। ব্যাঙ্ক, বিমা, মোবাইল এবং সরকারি ভরতুকির প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে আগামী ৩১শে মার্চের মধ্যে আধার নম্বর যুক্ত করতে হবে বলে গ্রাহকদের উদ্দেশে নির্দেশ জারি করেছিল কেন্দ্রের বি জে পি সরকার। বলা যায়, সেই নির্দেশ এদিন এক কথায় খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই সাংবিধানিক বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ছাড়াও রয়েছেন বিচারপতি এ কে সিক্রি, বিচারপতি এ এম খানবিলকর, বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি অশোক ভূষণ।  
প্রসঙ্গত, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বায়োমেট্রিক তথ্যযুক্ত আধার কার্ড তৈরির সিদ্ধান্ত নি‍য়েছিল আগের ইউ পি এ সরকার। কাজও তখন শুরু হয়েছিল। ২০১১ সা‍লের লোকসভা ভোটের আগে নির্বাচনী প্রচারে আধার কার্ডকে তুলোধোনা করেছিলেন বি জে পি-র সেদিনের প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়েই রাতারাতি ভোল পালটে ফেলেন তিনি। ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে তিনি আধার কার্ডকে সমস্ত আর্থিক পরিষেবা এবং সরকারি ভরতুকির প্রকল্পে বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নেন। এমন কী আধার কার্ড সংযুক্ত করা না হলে আর্থিক পরিষেবা এবং সরকারি ভরতুকির প্রকল্পের সুবিধা মিলবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। আধার কার্ড না থাকায় সরকারের নির্দেশ পালন করতে পারেননি বলে ইতিমধ্যে দেশের নানা জায়গায় রেশন এবং মিড ডে মিল বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যেমন, আধার নম্বর যুক্ত করতে না পারায় মধ্য প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড প্রভৃতি রাজ্যে গরিব মানুষের রেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার জেরে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি সরকারি নির্দেশের বিরোধিতা করে একগুচ্ছ মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টে। কোন আইনে সরকার আধার কার্ডকে বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করছে, সেই প্রশ্ন তুলে বেশ কিছু হাইকোর্টেও মামলার আবেদন জমা পড়ে। এ‍‌ই সমস্ত মামলাকেই একত্রিত করে শুনানি চলছে সাংবিধানিক বেঞ্চে। 
আধার কার্ডে রয়েছে নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য। এ‍‌ই কার্ডকে বিভিন্ন পরিষেবা ও প্রকল্পে বাধ্যতামূলক করে সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করছে বলে মামলাগুলিতে অভিযোগ করা হয়েছে। তাছাড়াও ব্যাঙ্ক, বিমা, মোবাইল পরিষেবায় যুক্ত রয়েছে বহু বেসরকারি সংস্থা। তাদের আধার নম্বর জানিয়ে দিলে তারা যে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে তার অপব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তাই বা কোথায় বলেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাস্তবে তেমন ঘটনা ঘটেছেও। একটি বেসরকারি মোবাইল কোম্পানি গ্রাহকদের না জানিয়েই তাঁদের আধার নম্বরকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেককে কোম্পানি পরিচালিত পেমেন্ট ব্যাঙ্কে যুক্ত করে দিয়েছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। পরে বিষয়টি নিয়ে হইচ‍‌ই শুরু হতে ওই কোম্পানি পিছু হটে। সরকারি যে সংস্থা আধার কার্ড প্রকল্প রূপায়ণের দায়িত্বে, সেই ইউ আই ডি এ আই (ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া)-র তরফেও সম্প্রতি স্বীকার করা হয়েছে, আধার কার্ডের তথ্যের অপব্যবহার হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আধার নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ‍‌ই অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের এদিনের নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধারের নামে কল্যাণমূলক পরিষেবা থেকে গরিব মানুষকে বঞ্চিত করার যে কৌশল নিয়েছিল মোদী সরকার, আপাতত তাও মুখ থুবড়ে পড়ল বলা যায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement