‘আমাদের প্রার্থীর’
পাশে গোটা গ্রাম,
সাহস সাইকেল
ফেরানো ছাত্রী

‘আমাদের প্রার্থীর’<br>পাশে গোটা গ্রাম,<br>সাহস সাইকেল<br> ফেরানো ছাত্রী
+

জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা , ১৫ এপ্রিল— নববর্ষের সকালেও পাড়া বৈঠক। বামফ্রন্টপ্রার্থী যাচ্ছেন বাড়ি বাড়ি। ৭৫ পেরিয়ে যাওয়া জগদীশ মণিদাসের উত্তরে আগামী নববর্ষের পরিকল্পনা-‘যা ওরা কেড়ে নিয়েছে, তা উসুল করি। তবে আগামী বছর সবাই মিলে নববর্ষ পালন করব।’ আর সেই যুবতী? যে রাজ্যে নারীদের নিরাপত্তা নেই বলে সরকারের সাইকেল নিতে অস্বীকার করেছিল? সেই নবনীতা কার্যীর মুখেও এই নববর্ষে প্রতিজ্ঞা — ‘এবার ভোটে জবাব দিতেই হবে।’
কোচবিহার-২ ব্লকের মরিচবাড়ি-খোলটা, আমবাড়ি, বানেশ্বর, গোপালপুর আর বড়রাংরস গ্রাম পঞ্চায়েতে তাই ক্ষোভের ফুলকি দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। 
প্রথম পর্যায়ে গ্রামবাসীরা এগিয়ে গেছেন। প্রার্থীপদ জমা দেওয়া ছিল প্রথম রাউন্ডের কাজ। সেই লড়াইয়ে হেরেছে তৃণমূলের বাইকবাহিনী। এখন সন্ত্রাসকে অগ্রাহ্য করে লালঝান্ডার প্রার্থীরা প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। 
রফিকুল ইসলাম প্রচারে আছেন। তাঁর স্ত্রী মোমিনা খাতুন বিবি প্রার্থী। অভিযোগ, কুমারপাড়া বুথের তৃণমূল প্রার্থীর স্বামী সজল মিয়া হুমকি দিচ্ছেন দেখে নেওয়ার। এলাকার মানুষ বামফ্রন্টের সমর্থনে ভোটে দাঁড়ানো মোমিনা খাতুন বিবির স্বামীকে বলছেন, ‘ভয় নেই, জিতবে তোমার স্ত্রী। মোমিনা আমাদের প্রার্থী।’ 
গত পঞ্চায়েত ভোটে মরিচবাড়ি-খোলটা গ্রাম পঞ্চায়েতে ২৪ আসনে মাত্র ৩টি আসনে জিতেছিল তৃনমূল। লোকসভা ভোটের পর গায়ের জোরে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল।
এবারে কেড়ে নেওয়া হক ফেরাতে মরিয়া এই এলাকার প্রতিবাদী মুখ নবনীতা কার্যীও। নবনীতাকে মনে আছে তো? তপসীখাতা হাইস্কুলের সেই মেয়েটা? যে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মুখের ওপর সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, ‘রাজ্যে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। তাই চাই না সবুজ সাথির সাইকেল। উনি রাজ্যে মেয়েদের নিরাপত্তা আগে ফিরিয়ে দিক।’ সেদিন সারা রাজ্য প্রতিবাদী নবনীতার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেই নবনীতা এখন স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র — ইতিহাসে অনার্স। তিনিও চাইছেন, ‘যারা মানুষের হক কেড়ে নিয়েছিল, এবারের ভোটে তাদের জবাব দিতে হবে।’ 
খোলটা বাজারের পাশেই বাড়ি পম্পা দাসের। ২০১৫ সালের ৪ ঠা অক্টোবরের যার জীবনের গতিপথটাই বদলে গেছে। আলিপুরদুয়ার বিবেকানন্দ কলেজের ছাত্রী পম্পা সেদিন সন্ধ্যায় বাবার থেকে ওষুধ কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হন। অ্যাসিড ছুঁড়ে দেয় অভিযুক্ত রাহুল মজুমদার। তারপর থেকে আর কলেজ যাওয়া হয়নি মেয়েটার। খোলটা বাজার এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, এরাজ্যে বিষ মদ খেয়ে মারা গেলে সরকার দুলক্ষ টাকা দেয় অথচ অ্যাসিড আক্রান্ত মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর কথা ভুলে যায় সরকার। জোর করে দখল করা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান কনক দাসের দুর্নীতির হরেক কিসসা্ উঠে আসছে পাড়া বৈঠকে। 
এলাকার হাইস্কুলের জমি ফোর লেন রাস্তা তৈরির জন্য নেবে পূর্ত দপ্তর। ক্ষতিপূরণের প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে ওই জমির কাগজ নিজের দাদার নামে করিয়ে নিয়েছিলেন কনক দাস, অভিযোগ এমনই। স্কুলের জন্য যারা জমি দিয়েছিল তারা আদালতে মামলা ঠুকে আপাতত টাকা লুট আটকেছেন গ্রামবাসীরা।
এই ফোর লেনের রাস্তার জন্য পঞ্চায়েত সমিতির ‘সাকাতি পুকুর’ অধিগ্রহণ হয়েছে। তার ক্ষতিপূরণের লক্ষ লক্ষ টাকার পুরোটাই মেরে দিয়েছে উপপ্রধান আর তার দলবল।
বামফ্রন্টের জেলা পরিষদ প্রার্থী অবনী রায় বলছেন, গোটা এলাকা লুটেরাদের ঠেকাতে এখন এককাট্টা। ভোট চাইবার পাশাপাশি ভোটের দিন একজোট হয়ে বুথে যাবার কথাও প্রচার করছেন সাধারণ মানুষ নিজেরাই। 
গত আগস্টের বন্যায় কালজানি নদীর বাঁধ ভেঙেছে দুজায়গায়। তারপর কেটে গেছে ৬ মাসেরও বেশি সময়। তবুও বাঁধ সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ হয়নি। উন্নয়ন নয়, প্রধান-পঞ্চায়েত সদস্যরা জোর করে পঞ্চায়েত দখল করে গত ৪ বছর শুধুই উন্নয়নের বরাদ্দ অর্থ লুট করেছে। খোলটা চেকপোস্ট থেকে পাকা রাস্তা ধরে দুই কিলোমিটার গেলেই মণিদাস কলোনি। কলোনিতে ঢুকতেই যেদিকে চোখ যায় শুধুই দেওয়ালে দেওয়ালে কাস্তে হাতুড়ি প্রতীকে ভোট দেবার আহ্বান। গাছে গাছে ঝুলছে লালঝান্ডা আর প্রচার ফ্লেক্স। সি পি আই (এম) প্রার্থী অমল দাস এলাকার শিক্ষিত যুবক। নববর্ষের দিনে চারদিকে যখন উৎসবের মেজাজ তখন সকাল ১০ টায় চলছে পাড়া বৈঠক। রান্না ছেড়ে হাজির বাড়ির মেয়ে-বৌরাও। ভোটে অমল দাসকে জেতাতে আত্মপ্রত্যয়ী মানুষগুলোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন একটা দিনেও সবাই ভোট প্রচারে? আমবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত অনেক চেষ্টা করেও দখল নিতে পারেনি তৃণমূল। প্রধান সুদীপ কার্যীসহ অনেককেই মিথ্যা মামলায় জেল খাটিয়েছে শাসকদল। তবুও আত্মসমর্পণ করেনি বামপন্থী গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা। একই ছবি গোপালপুরেও। এখানেও তৃণমূলকে হারাতে মানুষ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement