সম্প্রীতির সুরেই
বর্ষবরণ বাংলায় 

সম্প্রীতির সুরেই<br>বর্ষবরণ বাংলায় 
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১৫ই এপ্রিল— মনে আছে রাজুবল মোল্লা, কামাল হোসেন, শম্ভু সর্দার বা আমিনা বিবির কথা? মাত্র কয়েক দিন আগেই পঞ্চায়েত ভোটে মনোনয়ন দিতে গিয়ে শাসকদলের মারধরের শিকার হয়েছেন তাঁরা। কিংবা মনে আছে কি তারও আগের কথা? যখন হাসনাবাদের কাছে এক গ্রামের খেতমজুর রমজান মোল্লাকে অস্ত্র হাতে ভয় দেখিয়েছিল একদল গেরুয়াধারী মানুষ? তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ ছিল গোরু পাচারের। রুজি রোজগারও কেড়ে নিতে চায় তারা। রমজান মণ্ডল গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অভিমানে, লজ্জায় অপমানে। কিংবা মনে আছে শিবাই মুর্মুর কথা? তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে নানা ফতোয়ার মুখে পড়তে হয়েছিল শুধুমাত্র রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য। কিন্তু কেন? প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তাঁদের মাথায়। উত্তর মেলে না। বছর ঘুরে যায়। তবে হতাশা নেই তেমন ওই প্রান্তিক মানুষজনের মধ্যে। তাঁরা চান সম্প্রীতি, তাঁরা জানেন সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব আছে, থাকবেও। 
এর মধ্যেই আরো একটি বাংলা বর্ষবরণ। নববর্ষে বয়ে গেল সম্প্রীতির আরো জোরালো বার্তা। ধর্মনিরপেক্ষ সুস্থ সংস্কৃতির বার্তা নিয়ে মানুষ রবিবার পথ হাঁটলেন পারস্পরিক সৌহার্দের পরিচয় দিয়ে। সঙ্ঘের উন্মত্ত অস্ত্র সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলার চিরায়ত সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক হলেন নজর আলিরা। মঙ্গল শোভাযাত্রায় একসঙ্গে উচ্চারিত হলো বাউল আর ফকিরের গানের কলি।
নজর আলি জীবন সংগ্রামে চিরদিনের লড়াকু এক সৈনিক। রিকশা চালিয়ে জীবিকা অর্জনের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর শিল্পী মনের সত্তা ছড়িয়ে দেয় সুরের সম্প্রীতি। বাঁশির সেই সুরের বাঁধনেই রবিবার তিনি এক সূত্রে বাঁধলেন বহু মানুষকে। প্রমাণ করলেন ধর্ম, জাতপাত নিয়ে মাতামাতির চিরকালই ঊর্ধ্বে এই বাংলা। মুর্শিদাবাদের লালবাগের এই বাসিন্দার পরিচয় আর একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে নেই। এবার তা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকেই। গাঙ্গুলি বাগান থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার তিনিই ছিলেন উদ্বোধক। 
গোটা যাত্রাপথে পথনাটক, নাচ, গান বাজনা, ছৌ নাচ, রণপা, নানা রঙের মুখোশ নিয়ে এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করলেন মানুষ, সঙ্গে বিশিষ্টজনেরা। বিভিন্ন এলাকার লোকশিল্পের ধারার সমস্ত বৈশিষ্ট্য উঠে এলো পরতে পরতে। গোটা রাস্তায় আঁকা হলো আলপনা। বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন পরিষদের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রার ব্যানারে জ্বলজ্বলে লেখা ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- এই তো বাংলার সাধারণ মানুষের চিরকালের কথা। এক সময়ে ওপার বাংলার মানুষ হিংসা বিভেদের বিরুদ্ধে শুরু করেছিলেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। তারই রেশ ছড়িয়ে পড়লো এই বাংলাতেও। এদিন শোভাযাত্রায় ছিলেন পবিত্র সরকার, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, রাজা সেন, সুবলদাস বহুরূপী, বৌদ্ধ শিক্ষক সন্ত প্রমুখ। 
এদিন অন্য একটি মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় সুলেখা থেকে। প্রাণের স্পর্শ ছড়িয়ে শোভাযাত্রা যায় ঢাকুরিয়া পর্যন্ত। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অমিয় বাগচী উদ্বোধন করেন এই মঙ্গল শোভাযাত্রার। বিভেদ বা হিংসা নয়, এখানেও সেই মানুষেরই জয়গান রচিত হলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে। শুভ নববর্ষ ১৪২৫- কামনায় সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই- স্লোগানের মাধ্যমে শোভাযাত্রা বার্তা দিল অস্ত্র মিছিল নয়, মানুষের মিছিলই শেষ কথা। শেষ কথা মানুষের প্রাণের স্পন্দন। বাংলার লোকশিল্প জড়িয়ে আছে একদিকে বাউল অন্যদিকে ফকিরের দর্শনে, চিন্তায়। একদিকে আদিবাসী গান, নাচ অন্যদিকে আধুনিক জগতের শিল্পকলার মেলবন্ধন নিয়েই জগৎ— ধর্মান্ধতার এখানে কোনো স্থান নেই। এদিন বারবারই এ কথা উচ্চারিত হলো মঙ্গল শোভাযাত্রায়। 
এদিন রাজ্যজুড়েই বিভিন্ন জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় শামিল হয়েছেন মানুষ। বিধাননগর লাবণি থেকে আর একটি মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়ে ফাল্গুনী, পূর্বাচল হয়ে সেন্ট্রাল পার্কে এসে শেষ হয়। এখানেও পরিবেশিত হয় গান, নাচ, নাটক, আদিবাসী সংস্কৃতি- ধামসা মাদলের সাঁওতালি নৃত্যগীত প্রভৃতি। মহিলাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। একদিকে দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে শঙ্খ, অন্যদিকে একতারা, দোতারা বাজিয়ে পিরের গান জাগিয়েছে এক অদ্ভুত অনুপ্রেরণা। ছিলেন রমলা চক্রবর্তী, অরুণাভ ঘোষ, দেবেশ দাস প্রমুখ। এছাড়া কাজি নজরুল ইসলামের বাড়ি থেকে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি পর্যন্ত এক সম্প্রীতির বার্তা থেকে আরও একটি মঙ্গলযাত্রা বের হয়। এছাড়া ইন্সটিটিউট অব ফিজিক্যাল কালচারের উদ্যোগে আনন্দ পালিত রোডে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে এদিন। শোভাযাত্রায় ছড়িয়েছে মিলনের বার্তা। মানুষে মানুষে হানাহানি নয়, শাসকদের ফতোয়া বা চোখ রাঙানি নয়। আরও বেশি মানুষকে শামিল করে বৃহত্তর ক্ষেত্রই গড়ে তোলা এখন একমাত্র কাজ। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement